অনেক ড্যানিশ নাগরিকেরা নিয়মিতভাবে "ঘেটো আইন" এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই এই আইনের পক্ষে রয়েছে। ছবি ক্রেডিট : Picture alliance
অনেক ড্যানিশ নাগরিকেরা নিয়মিতভাবে "ঘেটো আইন" এর বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তবে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই এই আইনের পক্ষে রয়েছে। ছবি ক্রেডিট : Picture alliance

২০১৮ সালে পাশ হওয়া ''ঘেটো আইন'' ইতিমধ্যে ডেনমার্কে অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমিয়ে এনেছে। সম্প্রতি ড্যানিশ সরকার এই আইনটি আরো কঠোর করার উদ্যোগ নেয় ।

 ইউরোপের বাইরে থেকে আসা অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যে ড্যানিশ সরকার যে কঠোর ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো৷  

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সংস্কার পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এটি অবশ্য বর্তমান আইনে থাকা ''ঘেটো'' শব্দটি সরিয়ে ফেলবে, তবে আগামী দশ বছরের মধ্যে আবাসনে ''অ-পশ্চিমা'' বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সংখ্যা ৩০% কমিয়ে আনা হবে যেটি বর্তমান আইনে ৫০% বলা আছে । এসব এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হবে।

যদিও এই বিলে ভোটের জন্য এখনো কোনও তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি, তবে এটি সংসদে সহজে পাশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 


 কোপেনহেগেনে আয়োজিত ঘেটো আইন বিরোধী একটি প্রতিবাদ সমাবেশ। ছবিঃ Crédit : Picture alliance
কোপেনহেগেনে আয়োজিত ঘেটো আইন বিরোধী একটি প্রতিবাদ সমাবেশ। ছবিঃ Crédit : Picture alliance

জাতিগত মানদণ্ড

ড্যানিশ ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটসের আইন উপদেষ্টা নান্না মার্গ্রেথ কুসা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ''জাতিগত মানদণ্ডে আরও বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে''। 

তিনি আরও যোগ করেন, ''আমরা এই বিষয়টি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন এবং এটিকে নিবিড়ভাবে পর্বেক্ষণ করছি কারণ যখনই জাতিসত্তাকে মানদণ্ড হিসাবে উল্লেখ করা হয় তখনই উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়''। 

২০১৮ সালে গৃহীত ''ঘেটো আইন'' অনুসারে, ১০০০ বা এর বেশী লোকের বসবাস এমন এলাকায় ‘’অ-পাশ্চাত্য বা ইউরোপের বাইরে’’ থেকে আগত অভিবাসীর সংখ্যা ৫০% এর সীমাবদ্ধ হবে এবং যার বাসিন্দারা চাকরি, শিক্ষা, আয় এবং নিরপরাধ চারটি মানদণ্ডের মধ্যে নূন্যতম দুটি শর্ত পূরণ করবে।

গত বছর, মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই কমিশন, কোপেনহেগেনকে এই ব্যবস্থাটি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলো।

জাতিসংঘের মতে, ঘেটো আইনের 'অ-পাশ্চাত্য' শব্দটি আনুপাতিকভাবে ইউরোপের বাইরের এবং অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে যেটি বৈষম্যমূলক’’। 

নান্না মার্গ্রেথ কুসা আরও উল্লেখ করেন, ডেনমার্কে বর্তমান আইনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা বিচারাধীন আছে। তার মতে,'' 'ঘেটো' উপাধিটির কারণে যে বৈষম্য দেখা দেয় তা কেবল ডেনমার্কের আইন নয়, ইউরোপীয় আইনও লঙ্ঘন করে''।

''অ-পাশ্চাত্য'' কারা?

ডেনমার্কের স্বরাষ্ট্র ও আবাসন বিষয়ক মন্ত্রলায়ের মতে, ''অ-পাশ্চাত্য'' শব্দটি আদম শুমারির শ্রেণীবদ্ধকরণের জন্য ব্যবহার করা হয় যা ড্যানিশ ইনস্টিটিউট অফ দ্য স্ট্যাটিস্টিকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পশ্চিমা বা পাশ্চাত্য দেশ বলতে মধ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশসমূহের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, আন্ডোরা, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন, মোনাকো, নরওয়ে, সান মেরিনো, সুইজারল্যান্ড, ভ্যাটিকান সিটি, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড কে বুঝানো হয় । অর্থাৎ এই তালিকার বাইরে সব দেশ ''অ-পাশ্চাত্য দেশ'' হিসেবে গণ্য হবে। তবে মন্ত্রণালয় এটি নিশ্চিত করে যে ''পাশ্চাত্য ও অ-পাশ্চাত্য দেশগুলির মধ্যে পার্থক্য মূলত কোন রাজনৈতিক, ধর্ম, অর্থনীতি বা কোনও দেশের সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত নয়''।

সংস্কার প্রস্তাবের ব্যাপারে ডেনমার্ক সরকারের বক্তব্য হল, সংস্কারে ব্যবহৃত হওয়া ''সমান্তরাল সমাজ'' পরিভাষাটা দিয়ে আসলে বুঝানো হয়েছে সেসব অঞ্চলকে, যেখানকার বাসিন্দারা এখনো ডেনমার্কের সমাজে কোন সুসংহত অবস্থান এবং মূলধারার সাথে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র ও আবাসন মন্ত্রণালয়ের মতে, বেকারত্ব, শিক্ষা এবং অপরাধের হার বিবেচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, অ-পাশ্চাত্য অভিবাসীরা সমান্তরাল এবং সুষম সমাজ ব্যবস্থা গড়ে না উঠার পেছনে মূল কারণ। 


মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে এই আইন

তবে এই আইনের বিরোধিতাকারীদের মতে, এই প্রস্তাবনাটি কেবল ভিন্ন সংস্কৃতির অভিবাসী এবং মুসলিমদের আরো কোণঠাসা করবে । প্রাক্তন সাংসদ ও ড্যানিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম অভিবাসীদের একজন ওজলেম চেকিচ বলেন, বর্তমান ''ঘেটো'' আইন এবং সর্বশেষ প্রস্তাবনাগুলো একে অপরের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।


ওজলেম চেকিচঃ কুর্দি বংশোদ্ভূত সাবেক এই সংসদ সদস্য সরকারের কোণঠাসা  নীতির নিন্দা করেছেন। ছবি: ওজলেম চেকিচ
ওজলেম চেকিচঃ কুর্দি বংশোদ্ভূত সাবেক এই সংসদ সদস্য সরকারের কোণঠাসা নীতির নিন্দা করেছেন। ছবি: ওজলেম চেকিচ

''আমি সরকারের সাথে একমত যে কিছু কিছু সম্প্রদায়ের অভিবাসীদের মধ্যে খুব বড় সমস্যা রয়েছে। আমি তা মেনে নিয়েছি। তবে পার্থক্যটি হচ্ছে, এখানে সমস্যা এত বড় নয় যে আপনাকে বাড়িঘর থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে''। 

কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ''অ-পাশ্চাত্য দেশ'' থেকে আগত অভিবাসীদের মধ্যে কেবল ৫.৩% তথাকথিত ''ঘেটো'' অঞ্চলে বাস করে।

ওজলেম চেকিচের মতে, আইনে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে যেটি অমানবিক। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি ''কেবলমাত্র মুসলিম ও অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে বিক্ষুব্ধ করবে না এখানে শ্রমিকশ্রেণিকেও আক্রমণ করা হয়েছে। ''ঘেটো'' অঞ্চলে বসবাসকারী অনেক বাসিন্দা এখন আতংকের মধ্যে রয়েছেন''।

'' আমি এই অঞ্চলে বাস করা শিশুদের সাথে কথা বলেছি এবং তারা মনে করে যে তারা ড্যানিশ, কারণ তারা ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের ড্যানিশ পাসপোর্ট আছে, তারা সে দেশের ভাষায় কথা বলতে পারে এবং নিয়মিত স্কুলে যায়। তবুও অনেকে তাদেরকে বলে: ''তুমি ড্যানিশ নও কারণ তুমি একজন মুসলিম''।

মেটে ফ্রেডেরিকসেন ২০১৯ সালের জুন থেকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।  ২০১৫ সালের নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরে  অভিবাসন সম্পর্কে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দলটি। ছবিঃ Picture alliance
মেটে ফ্রেডেরিকসেন ২০১৯ সালের জুন থেকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরে অভিবাসন সম্পর্কে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দলটি। ছবিঃ Picture alliance

কট্রর অভিবাসন নীতি 

ডেনমার্কে ইউরোপের সবচেয়ে কঠিন অভিবাসন নীতি রয়েছে। অন্যান্য অনেক দেশের বিপরীতে, বিগত কয়েক বছর ধরে অভিবাসন এবং আশ্রয় আইন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বসম্মত ঐক্য হয়েছে, তা ডান হোক বা বাম হোক।

আরহুস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক রুন স্টুবাগ বলেন, ''২০১৫ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা পরাজিত হওয়ার পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন দলের দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন অভিবাসন সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা দরকার । ২০১৫ সাল থেকে তারা সুস্পষ্টভাবে এটাই করে চলেছে। এখন তারা এই ধারা বজায় রাখতে সবকিছু করছে।''

রুন স্টুবাগের মতে, ''সাম্প্রতিক নেয়া পদক্ষেপসমূহ বিতর্কিত হলেও তা দলটির জন্য পরবর্তীতে ভালো হবে - ড্যানিশ আদালত ''অ-পাশ্চাত্য'' কোটার বিষয়ে যেই সিদ্ধান্ত দিক রাজনীতিতে তা গুরুত্ব বহন করে না। তিনি আরো বলেন, আইনি লড়াইয়ে পরাজিত হলে রাজনীতিতে তাদেরকে এর চরম মূল্য পরিশোধ করতে হতে পারে কারণ এ ধরণের চটকদার আইন দিয়ে তারা ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে চান -এর জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে''।


এমএইউ






 

অন্যান্য প্রতিবেদন