ইতুপিয়া৫৬ নামক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ইক্যোল অল্টারনেটিভ বা বিকল্প স্কুলে অধ্যয়নরত অনিবন্ধিত নাবালকেরা। ছবিঃ মোহাঃ আরিফ উল্লাহ, ইনফো-মাইগ্রেন্টস।
ইতুপিয়া৫৬ নামক সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ইক্যোল অল্টারনেটিভ বা বিকল্প স্কুলে অধ্যয়নরত অনিবন্ধিত নাবালকেরা। ছবিঃ মোহাঃ আরিফ উল্লাহ, ইনফো-মাইগ্রেন্টস।

অভিভাবকহীন অনিবন্ধিত নাবালকদের সাধারণত ফ্রান্সে নাবালক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বেশ বেগ পেতে হয় এবং এসংক্রান্ত প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল। নাবালক হিসেবে স্বীকৃতির আগ পর্যন্ত তাদের কোন দায়িত্ব সরকার নেয় না। তবে, সেই সময়ে অনিবন্ধিত অভিভাবকহীন নাবালকদের সহায়তার জন্য ইতুপিয়া৫৬ নামক একটি সংস্থা এক বিকল্প স্কুল এবং জরুরী আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে। উক্ত স্কুল এবং আশ্রয়কেন্দ্র সরেজমিন প্রদর্শন করে ইনফোমাইগ্রেন্টসের এবারের আয়োজন।

ফ্রান্সে অভিভাবকহীন নাবালকদের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর নির্ধারণ করে থাকে। তবে, আবেদনকারীদের কাছে পর্যাপ্ত নথি না থাকা, বয়স নির্ধারনে জটিলতাসহ অনেক কারণে সরকারি দপ্তর শুরুতেই অনেক আবেদন নাকচ করে দেয়। এই নাকচ আবেদনের বিপরীতে নাবালকরা চাইলে আদালতে আপিলের সুযোগ থাকে। তবে তা নির্দিষ্ট কোন আইনজীবী বা সংস্থা ছাড়া করা এক প্রকার সম্ভব। অনেক এনজিও এবং সাহায্য সংস্থা নাবালকদের প্রশাসনিক এবং আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে কিন্তু প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে তাদের কোন দায়িত্ব সরকার নেয় না। যেমন, তাদের থাকার জায়গা, খাবার, শিক্ষার সুযোগ ইত্যাদি। 

২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ইতুপিয়া৫৬ নামক একটি বেসরকারি উন্নয়নসংস্থা (এনজিও) অভিভাবসীদের নিয়ে কাজ করছে। তাদের একটি শাখা ফ্রান্সের পশ্চিমে অবস্থিত তুর শহরে ২০১৯ সাল থেকে বিকল্প স্কুল এবং ২০২০ সালের নভেম্বর মাস থেকে একটি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে৷ অভিভাবকহীন নাবালকদের যারা আদালতে আপিল করে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন, তারা সেখানে থাকতে পারেন৷ 

''স্বীকৃতিপ্রাপ্তির আইন প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে আমরা অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিপদে ফেলে দিতে পারি না। ৫ কক্ষবিশিষ্ট উক্ত আশ্রয়কেন্দ্রে আমরা বর্তমানে ১৪ জন অভিভাবকহীন নাবালককে থাকার জায়গা করে দিয়েছি। তাদের দিনে দুই বেলা খাবার এবং বিকল্প স্কুলের মাধ্যমে ফরাসি ভাষা, গণিত ও অন্যায় বিষয়ের উপর শিক্ষা প্রদান করা হয়। এছাড়া তাদের জন্য নানান ধরনের বিনোদন এবং ক্রীড়ার ব্যবস্থা করা থাকে সপ্তাহের বিভিন্ন সময়ে,'' ব্যাখ্যা করেন ইতুপিয়া৫৬ এর সহ পরিচালক এঞ্জেলো ফিওরে। 

দেখা যায়, আদালত থেকে নাবালক স্বীকৃতি পাওয়ার পরে নাবালকদের নূন্যতম ফরাসি ভাষার উপর অভিজ্ঞতা থাকে না এবং শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে তাদেরকে স্কুলে ভর্তি করানো দুষ্কর হয়ে পড়ে। অথবা স্কুলে জায়গা পেয়ে গেলেও প্রথম দিকে তাদের পাঠ বুঝতে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। 

''আমার আবেদন ডিপার্টমেন্ট থেকে নাকচ হয়ে যাওয়ার পরে এখন আমি আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। এই সময়ে আমি বিকল্প স্কুলে ফরাসি ভাষা, গণিতসহ নানা বিষয়ের উপর ক্লাস করছি। এটা আমার জন্য অনেক বড় একটি সুযোগ কারণ পরবর্তীতে আমার স্কুলে বা কলেজে ভর্তির পরে বড় সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে না,'' বলছিলেন শফিক ছদ্মনামে একজন নাবালক।

আশ্রয়কেন্দ্রের একটি শয়নকক্ষে নিজের বিছানা গোছাতে ব্যস্ত একজন অভিভাবকহীন নাবালক। ছবিঃ মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ইনফোমাইগ্রেন্টস।
আশ্রয়কেন্দ্রের একটি শয়নকক্ষে নিজের বিছানা গোছাতে ব্যস্ত একজন অভিভাবকহীন নাবালক। ছবিঃ মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ইনফোমাইগ্রেন্টস।

আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের দৈনন্দিন জীবন

ইতুপিয়া৫৬ পরিচালিত জরুরী আশ্রয়কেন্দ্রটি মূলত সামাজিক অনুদান এবং মানুষের চাঁদার উপর চলে। পরিচালনার কাজে সাহায্যের জন্য প্রতিদিন রুটিন মাফিক এখানে দুই জন স্বেচ্ছাসেবক সময় দিয়ে থাকেন। এখানে নাবালকদের জন্য প্রতিদিন দুপুরের এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। অনেক মানুষ এবং সংস্থা এখানে বিনামূল্যে রান্না করা খাবার সহ নানা সবজি সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবকরা সপ্তাহে অন্তত একদিন নাবালকদের নিয়ে রান্নার চেষ্টা করে থাকে যেন তারা তাদের নিজ দেশের পছন্দের খাবার খেতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্রটিতে একটি সুন্দর অভ্যর্থনা কক্ষ, একটি বড় রান্নাঘর এবং খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও রয়েছে৷ 

আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে আমরা কবির ছদ্মনামে একজন বাংলাদেশ থেকে আসা নাবালকের সাথে কথা বলেছি এবং সরেজমিনে তার থাকার ঘর পরিদর্শন করেছি। ''এই রুমে আমরা তিনজন থাকি৷ আমি, একজন পাকিস্তানি এবং আরেকজন মালি থেকে আগত নাবালক। প্রতিদিন দুপুরে আমরা বিকল্প স্কুল থেকে এসে খাবার গ্রহণ করে থাকি। তারপর সবাই যে যার যার রুমে গিয়ে নিজেদের কাজ করি। বিকেলে আমাদের জন্য বিভিন্ন খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া একটি বড় টেলিভিশন, পর্যাপ্ত সাইকেল রয়েছে ব্যবহারের জন্য। প্রতি মাসে একদিন আমাদেরকে সাবান, টুথপেস্টসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস সরবরাহ করা হয়,'' বলছিলেন বাংলাদেশ থেকে আসা কবির (ছদ্মনাম)। 

সার্বিকভাবে তুর শহরে এনজিও ইতুপিয়া৫৬-এর নেয়া এই উদ্যোগটি প্রশাসনিক জটিলতায় থাকা নাবালকদের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক খবর। নাবালকদের ফরাসি সমাজের সাথে খাপ খেয়ে এখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য এটি বড় ভূমিকা রাখবে।








 

অন্যান্য প্রতিবেদন