বেলজিয়ামের জালহে শহরে অবস্থিত আশ্রয়কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ছবিঃ Migrations Libres
বেলজিয়ামের জালহে শহরে অবস্থিত আশ্রয়কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ছবিঃ Migrations Libres

বেলজিয়ামে আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনা বিষয়ক সরকারি সংস্থা (ফেডাজিল) ২৪ এপ্রিল ঘোষণা করেছে, তারা লিয়েজ শহরের কাছে জালহে এলাকায় অবস্থিত আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, প্রতিনিয়ত ভয় দেখানো, এমনকি আশ্রয়প্রার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় অবহেলার করা হচ্ছে।

বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরের কাছে অবস্থিত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট এই কেন্দ্রটি দুঃসহ সময় পার করছে। অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এনজিও কালেক্টিভ মাইগ্রেশন লিবহ বেশকিছু অভিযোগ আনার পরে আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনা বিষয়ক সরকারি সংস্থা, (ফেডাজিল) জানিয়েছে সার্বিক বিষয় নিয়ে তারা একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে। ২৪শে এপ্রিল প্রকাশিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানায়, “আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনা যেন সঠিকভাবে করা হয় এবং প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বজায় থাকে সে লক্ষ্যে সরকারি এই সংস্থা আশ্রয়কেন্দ্রটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখবে”। 


১৮ই এপ্রিল মাইগ্রেশন লিবহ এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে সাক্ষ্য দিয়েছে। মাইগ্রেশন লিবহ জানায়, অক্টোবর মাসে রেডক্রস চলে যাওয়ার পরে আশ্রয়কেন্দ্রটির দায়িত্ব নেয় সাভাস্তা নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। মূলত এরপর থেকেই ভবনটিতে অবস্থান করা প্রায় ২৫০ আশ্রয়প্রার্থীর জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। 

বেলজিয়ামে সরকার চাইলে বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব দিতে পারবে মর্মে নিয়ম করা হয়েছে ২০১৫ সালে। যার ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত সারা দেশে ৮১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি কেন্দ্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছে। 

ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য 

ব্যাপক সমালোচিত আশ্রয়কেন্দ্রটি মূলত জালহে অঞ্চলে ‘স্পা ডি অর’ নামক একটি ক্যাম্পিং এর পাদদেশে অবস্থিত। মাইগ্রেশন লিবহ এর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানায়, “অক্টোবরে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাভাস্তা আসার পর থেকে রেডক্রসের মানবিক উদ্দেশ্যকে পাশ কাটিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া শুরু করে। সাভাস্তা হোটেল ব্যবসার সাথে জড়িত একটি প্রতিষ্ঠান সুতরাং এ অঞ্চলে তাদের অবশ্যই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য রয়েছে৷’’


প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যেসকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আশ্রয়প্রার্থীদের প্রশাসনিক সহ যাবতীয় সহায়তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমিয়ে ১২জনে নিয়ে আসা যেটি রেডক্রসের সময়ে ৩০ জন ছিল। 

এছাড়া আরো বিভিন্ন খাতে তারা ব্যয় কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। যেমন, রেডক্রসের সময়ে আশ্রয়প্রার্থীয়া দৈনিক ৫ইউরো ১০ সেন্ট সমমূল্যের খাবার পেতো, কিন্তু সাভাস্তা সেটিকে অনেক কমিয়ে এনেছে। 

মাইগ্রেশন লিবহ আরো জানায়, আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যেমন, সপ্তাহে মাত্র দুইজন চিকিৎসক আসেন যেটি রেড়ক্রসের সময়ে প্রতিদিন বাধ্যতামূলক ছিলো। পর্যাপ্ত চিকিৎসক সংকটের কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। 

 অপরদিকে পর্যাপ্ত সামাজিক কর্মকর্তার অভাবে অনেক আশ্রয়প্রার্থীদের হাসপাতালে সাক্ষাৎকার বাতিল হয়ে গেছে কারণ অনেক গুলো ফর্ম পূরণ করে আশ্রয়কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ফেডাজিলকে পাঠানোর কথা ছিলো। কিন্তু কর্মকর্তা সংকটের কারণে সেগুলো সময়মত করা হয়নি। 

আশ্রয় প্রার্থীদের হুমকি

মাইগ্রেশন লিবহ যেসব অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছে তার মধ্যে আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য জরাজীর্ণ কক্ষে স্থানান্তরিত করা। রেড়ক্রসের সময়ে মালপ্ত্র বা সরঞ্জাম রাখার জন্য ব্যবহৃত হওয়া এরকম প্রায় দশটি কক্ষকে পুনরায় চালু করে আফগান নাগরিকদের থাকতে দেওয়া হয়েছে । নতুন এই কক্ষগুলোর কাঠামো খুব নাজুক, হিটারের তাপ অনেক কম এবং পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। 

যেসব আশ্রয়প্রার্থী আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ জানায় তাদেরকে কেন্দ্রটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে মাইগ্রেশন লিবহ এর কাছে। এর চেয়ে আরো খারাপ আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে হুমকি দেয়া হয়। 

কিন্তু যে অভিযোগের প্রেক্ষিতে মূলত ফেডাজিল তদন্তের উদ্যোগ নেয় সেটি হচ্ছে ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগগুলো প্রায় একই। উক্ত জনপ্রতিনিধি বেলজিয়ামের একটি গণমাধ্যমকে জানায়, “আশ্রয়কেন্দ্রটিতে সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে”। 

“এখন তদন্ত শুরু হয়ছে কারণ গণমাধ্যম সহ সবাই কথা বলছে। তারপরও মাইগ্রেশন লিবহ সহ বিভিন্ন এনজিওর কর্মীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের অভিযোগ জানিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না এরকম একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার কোন যুক্তি আছে কি না। ফেডাজিল এবং বেসরকারি কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কেনো একসাথে কাজ করবে? এটি কাঙ্ক্ষিত নয়”, যোগ করেন উক্ত জনপ্রতিনিধি। 

মাইগ্রেশন লিবহ এর প্রতিবেদনে সাভাস্তা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর পরিচয় উঠে এসেছে যার নাম ডমিনিক নেদে। তিনি ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত ফেডারেল নির্বাচনে কট্রর ডানপন্থি দলের হয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দলটি বেলজিয়ামে অত্যন্ত সমালোচিত। তার দলের প্রধান জঁ মারি দেদেকের ২০০৯ সালে একটি নিবন্ধ লিখেন, যেটি অত্যন্ত ‘সাম্প্রদায়িক, বর্ণবাদী এবং ইসলাম বিদ্বেষী’ বলে সমালোচিত হয়। এছাড়া তিনি বেলজিয়ামে বসবাসরত অভিবাসীদের মৌলিক অধিকারের সুবিধা কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। 


এমএ/এপিবি


 

অন্যান্য প্রতিবেদন