প্যারিসের রাস্তায় আফ্রিকার দেশ চাড থেকে আগত দুইজন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ছবি:মেহেদী শেবিল - ইনফোমাইগ্রেন্টস
প্যারিসের রাস্তায় আফ্রিকার দেশ চাড থেকে আগত দুইজন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ছবি:মেহেদী শেবিল - ইনফোমাইগ্রেন্টস

২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার কারণে ফ্রান্সে জারি করা হয় কঠোর লকডাউন৷ সেসময় অভিভাবকহীন নাবালকদের মানসিক সমস্যা অনেক বেড়েছে বলে ডক্টরস উইথআউট বর্ডার্স এবং লো কমেডের যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে । অনিদ্রা, উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার মতো মানসিক সমস্যাগুলো তাদের মধ্যে অনেক বেড়েছে। অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলো দ্রুত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বরাদ্দ আবাসনগুলো খুলে দিতে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি আবদ্ধ জায়গায় আটকে থাকার কারণে এইসব তরুণদের মধ্যে মানসিক সমস্যা বহুগুণ বেড়েছে।

যেসব শিশু-কিশোর কোন আবাসন কেন্দ্রে আছে এবং যারা রাস্তায় থাকে তাদের মধ্যে তুলনা করে দেখা গেছে মূলত নতুন শিশু-কিশোরদের মধ্যে সমস্যা বেশি৷

‘‘নাবালকেরা ভয়াবহ উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে’’

রাস্তায় থাকা অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়ষ্করা বিশেষত মৌলিক চাহিদা পূরণে আরও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন, খাবারের খোঁজ করা৷ এক কিলোমিটার দূরত্বের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। এই নিয়মটির কারণে বিভিন্ন এনজিওর খাবার বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল তাদের জন্য । কয়েকজন  অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং নিয়ম ভাঙার ভয়ে কয়েকদিন উপোস করে ছিলো।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা: শৌচাগারগুলো শিবির থেকে দূরে এবং সময় সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণত অভিবাসীরা গণশৌচাগার এবং স্নান কক্ষগুলোতে যেতে পারছিলো না । এছাড়া এম এস এফ এবং কমেড জানিয়েছে, গণশৌচাগারগুলো অত্যন্ত নোংরা থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিলো।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অভিভাবকহীন শিশু-কিশোরদের জন্য টিকে থাকার লড়াই আরো তীব্র হয়েছে লকডাউন চলার সময়৷ এই সময়ে তাদের মানসিক চাপ বেড়েছে৷ জনশূন্য রাস্তায় কোন উপায়ে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করা, পুলিশি জবাবদিহিতার ভয় সহ নানা কারণে তারা তীব্র মানসিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলো৷  এমনকি আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিল৷

আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত অপ্রাপ্ত বয়স্করা ‘‘অনিদ্রা এবং চরম উদ্বেগের শিকার’’

এমএসএফ এর আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা তরুনদেরও একই অবস্থা৷ প্রচণ্ড মানসিক চাপ, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগে সমস্যার মতো ব্যাপারগুলো ঘটছিলো লকডাউন চলার সময়। এমএসএফ এবং কমেড জানায়, এই সময় তাদের মানসিক দুর্বলতাগুলো আরো বেশি সামনে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমএসএফ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ৪৩% তরুণ ঘুমের সমস্যায় ভুগছিলো বা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে ঘুম আসছিলো তাদের। তাদের মধ্যে, ২০% অনিদ্রায় ভুগছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া তাদের মধ্যে আতঙ্ক এবং অর্ধেকের বেশি শিশু-কিশোর দুঃস্বপ্ন দেখছিলো বলে জানিয়েছে।

এই সমস্যাগুলো তাদের প্রশাসনিক কাজেও বাধার সৃষ্টি করেছে। যেমন, মানসিক সমস্যার কারণে অনেকের আদালতের শুনানি বাতিল করতে হয়েছে। প্রায় ৭৯% তরুণ এম এস এফ এবং কমেডের সহায়তায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছে।

লকডাউনে একাকী থাকার কারণে তাদের মধ্যে তাদের ফ্রান্সে আসার আগে বিভিন্ন সীমান্তে ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনাগুলো তাড়া করেছে দুঃস্বপ্নের মত। ৩০ শতাংশ তরুণের মধ্যে হতাশা এবং মানসিক চাপ বেড়েছে। প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়া আবু বকর জানায়, ‘‘লকডাউনে আমি ভীষণ দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতাম। চোখে শুধু অন্ধকার দেখতাম’’।

এমএসএফ এবং কমেড কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছেন, যদি ফ্রান্সের পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে লকডাউনের  নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাহলে অভিভাবকহীন শিশু-কিশোরদের উপর তার প্রভাব দশগুণ বেশি পড়েছে।

এনজিও এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ফ্রান্স সরকারকে আপিলের অপেক্ষায় থাকা শিশু-কিশোরদের জন্য দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র খোলার আবেদন জানিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রেগুলো যাতে জীবন যাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয় সেই আহবান জানানো হয়েছে।

এমএইউ/এপিবি

 

অন্যান্য প্রতিবেদন