পশ্চিম বালকান পথে অভিবাসীদের বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এ এমরিক
পশ্চিম বালকান পথে অভিবাসীদের বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এ এমরিক

পশ্চিম বলকান অঞ্চলে অপরাধ চক্রের নানাবিধ কীর্তিকলাপ নিয়ে নতুন প্রতিবেদন সামনে এসেছে, যেখানে রয়েছে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও মাদকের উল্লেখ। প্রতিবেদনটি বলছে, শুধু মানবপাচার থেকেই এই চক্রগুলি প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোর ব্যবসা করে এই অঞ্চলে।

১৯৭০-এর দশক থেকেই পশ্চিম বলকান অঞ্চল অবৈধ কারবারের অভয়ারণ্য, বলছে গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ এগেইন্সট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম-এর একটি প্রতিবেদন।

২০২০ সালে, অভিবাসন, মাদক ও অস্ত্রের কারবারে বিদ্ধ হয়ে ওঠে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই অঞ্চল, যা গ্রিস থেকে উত্তর ম্যাসিডোনিয়া, আলবানিয়া, বসনিয়া-হ্যার্তসেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, সার্বিয়া হয়ে তুরস্কের পাশে হাঙ্গেরি ও রোমানিয়া সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।

শুধু অবৈধ অভিবাসীদের পাচার করাটাই বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ইউরোর ব্যবসার সমান বলে জানাচ্ছে এই প্রতিবেদন। পাশাপাশি এই ধরনের অপরাধী চক্রকে থামাতে যত পন্থাই অবলম্বন করা হয়, তত বেশি সংগঠিত হতে থাকে অপরাধের ধারা।

মানুষ, মাদক ও অর্থের লেনদেন

দ্য গ্লোবাল ইনিশিয়েটভ (জিআই) নামের এই আন্তর্জাতিক এনজিও এই প্রতিবেদনের জন্য ২০২০ সালের তথ্যের দিকে নজর দেয়।

সেবছর করোনা অতিমারির কারণে, কর্তৃপক্ষের টহল এই অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু এই অঞ্চলে একই সময়ে উল্লেখজনকভাবে বেড়েছে পাচারের হার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘জরুরুভিত্তিতে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বেশ কিছু জায়গায় মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যা মানুষের চলাফেরায় বাধা দিয়েছে। ফলে, গোপনে মানবপাচারের কাজে বেড়েছে লাভের বহর।’’

পাচারকারীদের লাভ বাড়ছে ইউরোপজুড়ে

সম্প্রতি গার্ডিয়ান পত্রিকা একই সুরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সাদ নামের এক ব্যক্তি গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি ক্যালে অঞ্চলে সুদানিজ ও কুর্দি মাফিয়াদের সাথে কাজ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন 'পকেট ভরে' দেবার জন্য। তার বয়ান থেকেই অনুমান করা যায় যে যত এই ধরনের কার্যকলাপের ওপর কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে, তত বেশি সংগঠিতভাবে কাজ করতে নামছে এই চক্রগুলি।

জোরান নামের আরেক কুর্দি পাচারকারী গার্ডিয়ানকে বলেন যে, যখন তিনি ২০১৪ সালে শুরু করেন, তখন তার ওপরওয়ালারা তার কাছ থেকে ‘‘মাত্র কয়েকশ ইউরো নিতো, কিন্তু যখন কাজ ছেড়ে দেন, তখন একই লরি পারাপারের জন্য খরচ হতো চার থেকে পাঁচ হাজার ইউরো।’’ জোরান জানান যে, নিয়মিত এই কাজ করা তার পক্ষে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছিল, মাফিয়াদের বাড়ন্ত সহিংসতার কারণে এক সময় এই কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।

এই একই গল্প ঘুরেফিরে শোনা যায় পশ্চিম বলকান অঞ্চলে। এক পথ বন্ধ হলেই এখানে খুলে যায় অন্য পথ। গবেষকরা এই পথের শুরু ও শেষের দুটি মূল প্রান্তের দিকে নজর দেন। তাদের ধারণা, গ্রিসের ঠেসালোনিকি শহরটি অভিবাসী ও দালালদের সাক্ষাতের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থল।

অভিবাসী করিডোর

জিআই জানাচ্ছে, অভিবাসীরা সাধারণত রেল স্টেশন চত্বরে পরের যাত্রার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করে, যাতে করে পশ্চিম বলকান অঞ্চলে ঢোকার রাস্তা পায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিক গ্রিস-উত্তর ম্যাসিডোনিয়া সীমান্তের মুখে এসেই অভিবাসীদের ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখান থেকে পায়ে হেঁটে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। সীমান্তের ওপারে দালালদের একদল তাদের তুলে নেয় ও ভেলেস হয়ে গেভগেলিয়া থেকে স্কোপিয়ে পর্যন্ত চলা দশ নাম্বার করিডর ধরে হেঁটে যায়।

আলবেনিয়া হয়ে যাত্রা ২০২০ সালে অভিবাসীদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। সেখান থেকে হয় তারা উত্তরে কসোভোর দিকে পাড়ি দেয়, বা সাথে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে নৌকায় চেপে ইটালির দুরেস বা ভ্লোরা অঞ্চল দিয়ে সেখানে ঢুকতে চেষ্টা করে।

একবার কোসোভো পৌঁছাতে পারলে সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে তারা মিত্রোভিচা হয়ে সার্বিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। তাদের গন্তব্য, সুবোতিচার কাছে হাঙ্গেরি সীমান্ত।

২০১৮ সালে অভিবাসীদের পছন্দের পথের মধ্যে যুক্ত হয় মন্টেনিগ্রো, যদিও ২০২০ সালে এই দেশ হয়ে যাওয়ার ঢল কমেছে বলে জানাচ্ছেন গবেষকরা।

তুলনায়, দক্ষিণ বসনিয়ার সীমান্তে অনেক বেশি ফাঁক রয়েছে। মানবপাচারের অন্যতম পরিচিত স্থান হচ্ছে সার্বিয়া-বসনিয়া সীমান্তের কাছ দিয়ে ২৬১ কিলোমিটার বয়ে চলা দ্রিনা নদীটি।

সার্বিয়া

একবার সার্বিয়াতে ঢুকতে পারলে, অভিবাসনপ্রত্যাশী ও তাদের দালালদের সামনে চারটে ইইউ রাষ্ট্রে প্রবেশ করার পথ থাকে। ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, রোমেনিয়া ও বুলগেরিয়া। ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০১৯ সালে সার্বিয়াতে অভিবাসীদের আসার চল আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়েছে। সার্বিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিআইকে জানান যে, ২০২০ সালে ‘‘অবৈধভাবে সার্বিয়া সীমান্ত পেরিয়ে আসার সময়ে সাড়ে আট হাজারেরও বেশি’’ মানুষকে আটকেছেন তারা।

২০১৬ থেকে সীমান্তে কড়াকড়ি হাঙ্গেরিতে প্রবেশ অনেকটাই কঠিন করে তুলেছে, যার ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এখন রোমানিয়া হয়ে ইইউতে ঢুকতে চেষ্টা করেন।

যত ধরনের দালাল

প্রতিবেদনে মূলত তিন ধরনের দালাল চিহ্নিত করা হয়েছে - ফিক্সার, গেটকিপার ও প্যাকেজ ডিলার। ফিক্সার তারা, যারা ছোট আকারের পাচারের কাজ করে, যেমন ট্যাক্সি চালক বা ট্রাক ড্রাইভার, যারা সামান্য অর্থের বিনিময়ে গ্রাম থেকে অভিবাসীদের বিভিন্ন শহরে যাওয়া-আসায় সাহায্য করেন। বা কখনো কখনো নিজেরা গাড়ি না চালিয়ে অন্য কোনো চালকের সাথে রফা করে দেন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে, এই ফিক্সাররা নিজস্ব ভাষাগোষ্ঠী বা দেশ থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের টার্গেট করে। মাঝে মাঝে, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশকর্মী বা সীমান্তরক্ষীও ফিক্সারের কাজ করেন অর্থের বিনিময়ে।

দুর্নীতি ও কর্তৃপক্ষ

এই দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে রয়েছে বলে মনে করেন আলবেনিয়াতে অভিবাসীদের আইনি সহায়তা দেওয়া এক আইনজীবী। তার মতে, ‘‘স্থানীয় পুলিশের সাহায্য ছাড়া এক দেশ থেকে আরেক দেশে অভিবাসীদের পাচার নিশ্চিত করা অসম্ভব।’’

তিনি আরো বলেন, সব বড় রাস্তায় পুলিশি টহল থাকে ও ভিন্ন চেহারা ও ভাষার কারণে অভিবাসীদের শনাক্ত করা খুবই সহজ কাজ। সেক্ষেত্রে কেন তারা সেই কাজে সফল হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, টিরানার স্থানীয় সীমান্ত রক্ষীদের একটি গোটা চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পরেছিল। আরো জানানো হয়, চার পুলিশকর্মী এ কারণে গ্রেপ্তারও হয়েছেন।

ক্ষমতার শিকড় আরো উঁচুতে

গেইটকিপাররা অভিবাসীদের সীমান্ত পেরোতে সাহায্য করেন। এই ধরনের দালালরা চক্রের কিছুটা উঁচুতে অবস্থান করেন। যে সীমান্তগুলি পেরোনো সবচেয়ে কঠিন, সাধারণত এমন সব সীমান্তের কাছেই থাকে এই গেইটকিপাররা। সাধারণত, গেইটকিপাররা এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, পুলিশের কাজ করার ধরনের পাশাপাশি, অভিবাসীদের দেশ থেকে আসা বা তাদের সম্পর্কে ধারণা রাখা মানুষ হয়ে থাকে।

জিআই বলছে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে দালালরা অভিবাসী সেজে শরণার্থী ক্যাম্পে ঢুকে তারপর দল বেঁধে সীমান্ত পেরোতে সাহায্য করে।

এই কাজের জন্য গেইটকিপাররা প্রয়োজনীয় নৌকা বা ভেলা জোগাড় করে দেন, যাতে করে নদী বা সুড়ঙ্গ পেরোনো যায়। কিছু কিছু চক্রের কাছে চুরি হওয়া বা পুরনো গাড়ির নাম্বার প্লেট থাকার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

একটি দেশের ভেতর যাতায়াত করতে দেড়শ ইউরো খরচ হলেও গ্রিক-আলবেনিয়ান সীমান্ত পেরোতে খরচ ওঠে সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার ইউরো পর্যন্ত। প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত কর্তৃপক্ষকে দেওয়া ঘুসের হিসাবও।

গভীর জলের মাছ

মানবপাচার চক্রে সবচেয়ে বড় 'মাছ' নিঃসন্দেহে প্যাকেজ ডিলাররা, যারা ব্যাপক সংগঠিতভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, যার সাহায্যে গাড়ি-কাগজ সবকিছুই তুলনায় অনেক সহজ হয়ে ওঠে।

যে অভিবাসীদের হাতে যথেষ্ট পয়সা থাকে, তাদের কাছে পশ্চিম ইউরোপে ঢোকার 'সম্পূর্ণ প্যাকেজের' প্রস্তাব রাখা হয়। জিআই বলছে, এই গোটা যাত্রার জন্য মাথাপিছু ছয়শ থেকে বিশ হাজার ইউরো খরচ হতে পারে, যা নির্ভর করছে যাত্রাশুরুর স্থল থেকে গন্তব্যের দূরত্বের ওপর।

উদাহরণস্বরূপ জানানো হয়, ইরান বা আফগানিস্তান থেকে ইইউ-র কোনো দেশে ঢুকতে খরচ হবে মাথাপিছু তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ইউরো। পাকিস্তান থেকে ক্রোয়েশিয়া ঢুকতে খরচ হবে ছয় হাজার ইউরো মাথাপিছু।

এই প্যাকেজের মধ্যে ধরা থাকেন যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় ভুয়া কাগজপত্র ও গোপনে থাকার জায়গার খরচ।

'বলকানে শুধুই টাকার খেলা'

প্রতিবেদন বলছে, নারীদের জন্য এই পথে একা যাত্রার সাথে জড়িত রয়েছে ধর্ষিত হবার ঝুঁকি। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রার 'খরচ দিতে মেটাতে হয় দালালদের শারীরিক চাহিদা'। এক নারীকে কয়েক মাস ধরে আটক করে তাকে দিয়ে অন্যান্য অভিবাসীদের জন্য রান্না করানোর কথাও উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

কিন্তু পশ্চিম বলকানের এই পথ ধরে আনুমানিক কত অভিবাসী পাচার হয়, তা আন্দাজ করা কঠিন, কারণ, বহু অভিবাসীই একাধিকবার সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট ধারণা পেতে মোট অর্থের কারবারের সাথে মোট অভিবাসীর সংখ্যার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়।

এছাড়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে এই পথে যাত্রা ও তার সাথের আনুষঙ্গিক খরচ সম্পর্কে ধারণা করা গেছে। পাশাপাশি, স্থানীয় সাংবাদিক, পুলিশকর্মী ও এনজিও-র সাথে কথা বলেও ধারণা আরো পোক্ত করা হয়েছে।

গবেষকদের মত, পশ্চিম বলকানে চালু থাকা এই মানুষের বাজারের মূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ২৯ মিলিয়ন ইউরো।

এর কোনো শেষ নেই

যদিও মূল আর্থিক লেনদেন হয় এই অঞ্চলে প্রবেশের আগে বা এই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার পরে, অন্য আরো অবৈধ কীর্তিকলাপ মাথায় রাখলে, এই অঞ্চল কয়েক বিলিয়ন ইউরোর অর্থের জোগান দেয়, বলছে প্রতিবেদন।

এই অর্থের একটা বড় অংশ আসে মাদক পাচার থেকে। জাতিসংঘের মাদক বিষয়ক সংস্থা ইউএনওডিসি বলছে, এই অঞ্চল দিয়ে বর্তমানে দেড় থেকে পাঁচ বিলিয়ন মূল্যের মাদক যাতায়াত করে থাকে।

এই কালো টাকাই 'সাদা' করা হয় স্থানীয় রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ ব্যবসা, দামী পণ্যের কেনাবেচার মাধ্যমে, যার একটা অংশ আসে পশ্চিমা ইউরোপের দেশগুলিতেও।

প্রতিবেদনে বিস্তারিত লেখা রয়েছে কীভাবে নির্মাণ খাতে এই টাকার বিনিয়োগ ও দামী বিলাসবহুল আবাসনের কেনাবেচার মাধ্যমে বলকান অঞ্চলে বাসার দাম আকাশ ছুঁয়েছে। পাশাপাশি, বাড়ন্ত অপরাধের ফলে কিছু মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখ দেখছেন। ফলে আইন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপরাধ চক্রের বাড়বাড়ন্তের মাঝে বাড়তে থাকছে এই চক্রগুলির তৎপরতা।

এসএস/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন