র্সাবিয়ার সঙ্গে সীমান্তে বসনিয়ার সৈন্য পুলিশ টহল গাড়ি। ছবি: ইপিএ/টিবর রোস্তা
র্সাবিয়ার সঙ্গে সীমান্তে বসনিয়ার সৈন্য পুলিশ টহল গাড়ি। ছবি: ইপিএ/টিবর রোস্তা

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের সীমান্তে দুই হাজারের বেশি জনকে অবৈধভাবে পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হয়েছে৷ একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি৷

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার ১৬২ জনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সীমান্তে আটকে দেয়া হয় এবং অবৈধভাবে ফেরত পাঠানো হয়৷ প্রটেকটিং রাইটস অ্যাট বর্ডার-পিআরএবি এর ‘পুশিং ব্যাক রেসপনসিবিলিটি’ বা ‘ফেরত পাঠানোর দায়’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ প্রতিবেদনটি তৈরিতে গ্রিস, সার্বিয়া, বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনা, উত্তর মেসিডোনিয়া ও হাঙ্গেরির তথ্য সংগ্রহ করেছে ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল (ডিআরসি)৷ এছাড়া আরো ছয়টি দেশের ১০ টি সংগঠন ভূমিকা রেখেছে৷ এটি প্রকাশের আগে ব্রিটেনের গণমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, মহামারির সময়ে পুশব্যাকের কারণে অন্তত দুই হাজার অভিবাসী মারা গেছেন৷

পিআরএবি এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘মধ্য ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম বলকান রুট, সেইসঙ্গে ইইউ এর অভ্যন্তরীণ সীমান্তেও পুশব্যাকের ঘটনা ব্যতিক্রম ছিল না৷’’ অভিবাসীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এক তৃতীয়াংশ পুশব্যাকের ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে৷ তাদেরকে আশ্রয় আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়নি৷ এমনকি শারীরিক নির্যাতন, হামলা, চুরি, জোরপূর্বক অর্থ আদায় ও সম্পত্তি বিনষ্টের ঘটনা ঘটেছে৷ এজন্য সীমান্ত পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলায় নিয়োজিত অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে৷

নির্যাতনের যত অভিযোগ

ইটালি থেকে ফ্রান্সের উপকূলীয় সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অভিবাসীরা ফরাসি সীমান্ত পুলিশের বাধার মুখে পড়েন৷ তারপর তাদেরকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় ফরাসি পুলিশের সীমান্ত ফাঁড়িতে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে তাদের আশ্রয় আবেদনের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়৷ অভিবাসীদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও কম্বল দেয়া হয় না৷ এমনকি যোগাযোগের জন্য অনুবাদকের সহযোগিতা কিংবা চিকিৎসা সহায়তাও পান না তারা৷ পরের দিনই তাদের ফেরত পাঠানো হয় ইটালিতে৷

সার্বিয়া থেকে হাঙ্গেরি বা রোমানিয়ায় পুশব্যাকের শিকার অভিবাসীরাও বিভিন্ন দুর্ব্যবহার ও নিপীড়নের কথা জানিয়েছেন৷ দুইটি ক্ষেত্রে অভিবাসীরা জানিয়েছেন তারা সীমান্তরক্ষীদের ছেড়ে দেয়া কুকরের কামড়ের শিকার হয়েছেন৷ অন্যরা থাপ্পড়, লাথি, পুলিশের লাঠিপেটা, শরীরের পেছনের অংশে বা হাত, পায়ে আঘাতের কথা জানিয়েছেন৷ বেশিরভাগ সাক্ষাৎকারদাতা বলেছেন, বৃষ্টি বা বরফ যাই থাকুক না কেন তাদেরকে মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসতে বাধ্য করা হতো৷ এমনকি ফোন কেড়ে নিয়ে তা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বা আর ফেরত দেয়নি৷

নির্যাতনের এমন চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল৷ ‘‘এত মানুষের পুশব্যাক ও সীমান্ত নির্যাতনে ভোগার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়৷ এটা বলা বাহুল্য যে, রাষ্ট্রগুলোকে অবশ্যই এই সহিংসতা ও এধরনের বেআইনি কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে,’’ বলেন ডিআরসি এর মহাসচিব শারলোটে স্লেন।

১৭ বছর বয়সী আবদুল রহমান বসনিয়া থেকে সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে ক্রোয়েশিয়া পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
১৭ বছর বয়সী আবদুল রহমান বসনিয়া থেকে সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে ক্রোয়েশিয়া পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি

শুধু যে ইউরোপের সীমান্ত থেকেই অভিবাসীদের পুশব্যাক বা ফেরত পাঠানো হচ্ছে তা নয়৷ এমনকি সদস্যভুক্ত এক দেশ থেকে আরেক দেশে তাদেরকে ক্রমাগত ফেরত পাঠানো হয়৷ এভাবে চলতে থাকে যতদিন না ইউরোপ থেকে তাদের বের করা হচ্ছে৷ বিভিন্ন দেশের এমন সমন্বিত ১৭৫টি ‘চেইন পুশব্যাক’ এর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন অভিবাসীকে ইটালি অথবা অস্ট্রিয়া থেকে স্লোভেনিয়া, ক্রোয়েশিয়ার মতো কোনো দেশ হয়ে বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনার মতো তৃতীয় কোন দেশে পাঠানো হয়৷

সবচেয়ে বেশি এক হাজার ২১৬টি ঘটনা ঘটেছে ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার মধ্যে৷ উল্লেখ্য বসনিয়া সীমান্ত দিয়ে ক্রোয়েশিয়া হয়ে ফ্রান্স, ইটালি যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেক অভিবাসী৷ গত বছর সেখানে আটকা পড়েন বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার মানুষ৷ যার একটি বড় অংশ ছিল বাংলাদেশি৷ 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোমানিয়া থেকে সার্বিয়ায় ফেরত পাঠানোর ঘটনা ছিল ৩৩১টি৷ ২৮৫টি ছিল হাঙ্গেরি থেকে সার্বিয়ায়৷ তবে প্রকৃত সংখ্যাটা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে৷ কেননা বেসরকারি সংগঠনগুলোর পক্ষে সব তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ সম্ভব হয় না৷ যেমন, গ্রিস-তুরস্ক স্থলসীমান্তের এভরোস  অঞ্চলে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ৷ আবার অনেক অভিবাসীও ভয় ও তাদের ভবিষ্যত সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় পুশব্যাক সংক্রান্ত তথ্য দিতে চান না৷ অনেকে মনে করেন এসব তথ্য জানিয়েও কোন লাভ হবে না৷ 

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নজরদারির দাবি

প্রতিবেদনে একটি স্বাধীন সীমান্ত নজরদারি ব্যবস্থাপনা চালুর উপর জোর দিয়েছে সংগঠনগুলো, যাতে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা এবং এনজিওগুলোর দেয়া পুশব্যাক সংক্রান্ত তথ্য ভবিষ্যতে তদন্ত করা হয়৷ সীমান্ত মানবাধিকার নিশ্চিত করতে শুধু বিশ্বাস এর উপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করছে পিআরএবি৷

প্রতিবেদনটি তৈরিতে যুক্ত সংগঠনগুলো বলছে, সীমান্তে চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাষ্ট্রগুলোর রয়েছে৷ কিন্তু সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষিতে৷ এক্ষেত্রে মানবাধিকার আইন মেনে চলতে তারা বাধ্য৷ এজন্য মানুষের আশ্রয় আবেদনের অধিকার লঙ্ঘন কিংবা রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার দোহাই দিয়ে কাউকে ফেরত পাঠানো অবৈধ৷ 

পিআরএবি-এর প্রতিবেদনে ইউরোপীয় সীমান্ত বাহিনী-ফ্রনটেক্সের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে৷ স্বচ্ছতার অভাবে সংস্থাটির জবাবদিহিতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ 

এফএস/এসএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন