সেওটায় আসছেন অভিবাসীরা৷ ছবি: রয়টার্স
সেওটায় আসছেন অভিবাসীরা৷ ছবি: রয়টার্স

চলতি সপ্তাহে হাজার হাজার অভিবাসীর সাঁতরে বা কাঁটাতার পেরিয়ে স্পেনের ছিটমহল সেওটায় ঢোকার পর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে৷ এক্ষেত্রে অন্য দেশের উপর তারা কতটা নির্ভরশীল সে নিয়েও আলোচনা চলছে৷

২০১৫ সালে সিরিয়ায় শরণার্থী সংকটের পর ইউরোপে দশ লাখেরও বেশি অভিবাসী এসে পৌঁছেছেন৷ সেই থেকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসীদের বিপজ্জনক পথে ইউরোপে প্রবেশ ঠেকাতে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করে আসছে৷

যেমন, অভিবাসন ঠেকাতে তুরস্ককে কয়েক শত কোটি ইউরো ও অন্যান্য সুযোগ দিয়েছে৷ তা সত্ত্বেও একবছরের কিছু আগে তুরস্ক হাজার হাজার মানুষকে গ্রিসের দিকে ঠেলে দেয়৷ যার ফলে, সেখানে ভয়াবহ সহিংসতার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল৷

এই পদক্ষেপের কারণ হিসাবে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের অভিযানের বিপক্ষে ইইউ’র অবস্থানের প্রসঙ্গটি উঠে আসে৷ এরপর, ইইউ আবার নতুন করে তুরস্কের সঙ্গে বোঝাপড়ার দিকে যাচ্ছে৷ নতুন আলোচনায় রয়েছে আরো বেশি অর্থায়ন ও বাণিজ্য সুবিধার সুযোগ৷

একইভাবে সম্প্রতি স্পেনের ছিটমহলে প্রবেশেও মরক্কো তার নিরাপত্তা বাধা তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে৷ যার কারণে দলে দলে মানুষ ইউরোপের সঙ্গে আফ্রিকার এই স্থল সীমান্তে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন৷ মরক্কোর হঠাৎ এমন আচরণের পেছনেও স্পেনের সঙ্গে দেশটির সাম্প্রতিক মনোমালিণ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে৷

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের স্পেনের অভ্যন্তরীণ নীতি প্রধান ভার্জিনিয়া আলভারেজ বলেন, ‘‘মরক্কো মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করছে৷ এভাবে নিজেদের নাগরিকদের রাজনৈতিক খেলার ঘুঁটি বানানো উচিত নয়৷’’

অভিবাসনের বড় খেলোয়াড়

গত দুই দিনে আট হাজারেরও বেশি মানুষ সেখান থেকে স্পেনের মাটিতে প্রবেশ করেছেন৷ এর মধ্যে অনেকেই সমুদ্রে সাঁতরে উপকূল দিয়ে ছিটমহলটিতে প্রবেশ করেন৷

সংবাদসংস্থা এপিকে মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউটের পরিচালক হানে বাইরেনস বলেন, অভিবাসন যে ধরনেরই হোক না কেন, তা ইইউর সাথে অন্য কোনো দেশের আলোচনার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে৷

তিনি বলেন, ‘‘কোনো দেশের কাছে আজ যদি অভিবাসনের কার্ডটি থাকে, তাহলেই সে একজন বড় খেলোয়াড়৷’’

রাশ যাদের হাতে

২০১৫ সালের অভিবাসনের ঢল ইউরোপের জন্য একটি মোড় ঘোরানো সময় ছিল৷ অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলিতে ছিল উপচে পড়া ভিড়, যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ইইউ’র শরণার্থী নীতির ঘাটতিগুলিকে৷ ইইউ’র অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলি একে অন্যের ঘাড়ে শরণার্থীদের দায় চাপানো শুরু করে যা এখনও চলছে৷

তারপর থেকে এখন অভিবাসনের হার অনেকটাই কম৷ তুলনায় লেবানন, জর্ডান বা তুরস্কের মতো দেশগুলির ওপর চাপ অনেক বেশি, যেখানে রয়েছে সিরিয়া থেকে আসা ৩৭ লাখ শরণার্থী৷

কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একটি ধনী জোটের কাছে এই জনসংখ্যার সমন্বয় বা শরণার্থীদের উন্নত জীবন দিতে না পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে৷

বাইরেনস বলেন, ‘‘২০২১ সালের ইইউ আজও নতুন অভিবাসীদের ঢলের কথায় শিউরে ওঠে৷ কার ঘাড়ে দায় পড়বে তা সামলানোর বা কে কীভাবে এদের ফেরত পাঠাবে, তা নিয়ে চিন্তিত ইইউ৷ ফলে, এটা সত্যিই একটা বড় সমস্যা৷’’

ছয় বছর আগের ইইউ-তুরস্ক সমঝোতা সেই সময় অভিবাসী স্রোত সামলাতে সক্ষম হওয়ায় প্রশংসিত হয়েছিল৷ সেই থেকে তা একটি মডেল হয়ে উঠেছে মরক্কো ও টিউনিশিয়ার সাথে ইইউ’র বোঝাপড়ার ক্ষেত্রেও৷

যে লিবিয়া থেকে অসংখ্য অভিবাসী পাড়ি দেন ইউরোপের উদ্দেশ্যে, সেই লিবিয়াতেও লাখ লাখ ইউরো খরচ করেছে ইইউ৷

মরক্কো বনাম স্পেন

এই ধরনের ‘মাইগ্রেশন এইড’ বা অভিবাসন সহায়তা মরক্কোও পেয়েছে ইউরোপের কাছ থেকে, যার মূল্য সাড়ে ৩৪ কোটি ইউরোর বেশি৷ ১৯৭৫ সালে পশ্চিম সাহারার দখল নেয় মরক্কো৷

গত মাসের শেষের দিকে স্পেন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী পলিসারিও ফ্রন্ট- এর নেতা ব্রাহিম ঘালিকে দেশটিতে চিকিৎসার সুযোগ দেয়ার পর মাদ্রিদ-রাবাত সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়৷ এর ফলে সেউটা সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে রেখে স্পেনকে চাপ দিচ্ছে মরক্কো৷

এ বিষয়ে প্রথম জনসমক্ষে কথা বলেন মরক্কোর মানবাধিকারমন্ত্রী মোস্তাফা হামিদ৷ একটি ফেসবুক পোস্টে তিনি মঙ্গলবার বলেন স্পেনের এই সিদ্ধান্ত ছিল ‘অসতর্ক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’৷

তিনি আরো বলেন, ‘‘যে গোষ্ঠী মরক্কোর বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে সেই গোষ্ঠীর এক নেতাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে কী প্রত্যাশা করেছিল স্পেন?’’

এ বিষয়ের গভীরে যাননি বাইরেনস৷ তাঁর মত, ‘‘পাল্টা জবাব দেওয়ার এই আচরণ একদিকে যেমন অভিবাসনের পক্ষে আওয়াজ সংগঠিত করছে৷ অন্যদিকে, নানা ধরনের বাণিজ্যিক বা কূটনৈতিক সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে, যা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷’’

একদিকে যখন সেওটা সীমান্তের ঘটনাবলী নাটকীয় মোড় নিচ্ছে, অন্যদিকে মঙ্গলবার স্পেন মরক্কোকে তিন কোটি ইউরো দিয়েছে অনিয়মিত অভিবাসনকে ঠেকাকে৷ কিন্তু মাদ্রিদ বলছে যে এই বিনিয়োগ সাম্প্রতিক ঘটনার আগেই ঠিক হয়েছিল৷

ইউরোপীয় কমিশনের উপ-সভাপতি মার্গারিটিস শিনাস স্প্যানিশ ন্যাশনাল রেডিওকে বুধবার বলেন যে ‘ কেউ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে না’৷

কিন্তু তা সত্ত্বেও মরক্কো, টিউনিশিয়া, লিবিয়া ও তুরস্কের মতো দেশের হাতেই রয়েছে ইউরোপগামী অভিবাসন নীতি নির্ধারণ ক্ষমতা৷

এসএস/এফএস (এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন