সার্বিয়া-হাঙ্গেরি সীমান্তে পুলিশি প্রহরা। ছবি: ইপিএ/টিবর রস্টা
সার্বিয়া-হাঙ্গেরি সীমান্তে পুলিশি প্রহরা। ছবি: ইপিএ/টিবর রস্টা

গত দুই বছর ধরে বলকান পথে ইউরোপগামী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড় বাড়ছে। বসনিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়ার পাশাপাশি এবার রোমানিয়াকেও ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিচ্ছেন তারা।

একটি পরিত্যক্ত বাসার ভেতরে খোলা চুলায় পেঁয়াজ ভাজি করছেন চার সন্তানের মা সেরর আলহায়ানি। এখানেই তার প্রিয়জনদের জন্য একটি ইরাকি খাবার তৈরি করছেন তিনি।

হাঙ্গেরি-রোমানিয়া সীমান্তের কাছে সার্বিয়ার মাটিতে অসংখ্য ভেঙে পড়া বাসার ভেতর আশ্রয় নিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বহু অভিবাসনপ্রত্যাশী। তাদেরই অন্যতম আলহায়ানি পরিবার।

এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বেশিরভাগেরই গন্তব্য রোমানিয়া হয়ে পশ্চিম ইউরোপ। ইউরোপে প্রবেশের বলকান পথে গত দুবছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রোমানিয়া।

২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের সময়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভিড় সার্বিয়া থেকে সরাসরি হাঙ্গেরিতে ঢুকে যায়, রোমানিয়াকে এড়িয়ে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ইউরোপে প্রবেশের জন্য এই পথ আরো সহজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর কারণ, ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে পুলিশি কড়াকড়ি বাড়ানো ও হাঙ্গেরি সীমান্তে বৈদ্যুতিক কাঁটাতার, যা ২০১৫ থেকেই কার্যকর।

সেররের ১৬ বছর বয়সি মেয়ে আলহায়ানি পরিবারের একমাত্র ইংরেজি-জানা সদস্য। সে বলে, "এটা কোনোমতেই আমাদের স্বপ্নের বাসস্থান না। কিন্তু আমরা আর কিই বা করতে পারি? ভবিষ্যতে আমাদের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হলে আমাদের এখানে থাকতে হবে।"

তিন বছর আগে ইরাক থেকে পালিয়ে আলহায়ানি পরিবার এসে পৌঁছেছিলো সার্বিয়াতে। এর আগে, বসনিয়া হয়ে ক্রোয়েশিয়া ঢোকার চেষ্টায় বিফল হলে দুই বছর গ্রিসের একটি ক্যাম্পে কাটায় তারা।

এক মাস আগে তারা সার্বিয়ার উত্তরাঞ্চলের মাজদানে এসে পৌঁছায়। এখান থেকে প্রতিদিনই রোমানিয়াতে প্রবেশের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারা।

রোমানিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশের পথ তুলনায় সহজ হলেও 'গরিব মানুষের পথ' হিসাবে পরিচিত। সীমান্ত পেরোতে চাওয়া একদল সিরিয়ান যুবকের এটাই ধারনা।

কিন্তু এই পথে যাত্রা তাদের জন্য আরো বেশি কষ্টকর ও দীর্ঘ। এই পথের প্রথম ইউরোপীয় শেঙ্গেন রাষ্ট্র হাঙ্গেরি, যা এড়িয়ে যাওয়া এই পথের যাত্রীদের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

সংবাদসংস্থা এএফপিকে ৩০ বছর বয়সি এক সিরিয়ান যুবক বলেন, "আমার কাছে যদি পাঁচ বা ছয় হাজার ইউরো থাকতো, তাহলে আমি দালালকে টাকা দিয়ে সার্বিয়া থেকে সরাসরি হাঙ্গেরিতে চলে যেতাম।"

রোমানিয়ার পুলিশের ভূমিকা

২০২০ সালে ৪৫ হাজারেরও বেশি বার সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা হয়েছে বলে জানিয়েছে রোমানিয়ার পুলিশ, যা ২০১৯ সালের তুলনায় চারগুণ। তাদের মতে, এর মধ্যে ৮০ শতাংশ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

এক সময় ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরির পুলিশের চেয়ে উন্নত হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে রোমানিয়ার পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইনভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে।

এএফপিকে এক সিরিয়ান অভিবাসনপ্রত্যাশী বলেন, "রোমানিয়ার পুলিশ দুবার আমার পা ভেঙেছে, আমার হাত একবার ভেঙেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভালো হয় আবার কেউ খারাপ।"

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা ইউএনএইচসিআরের লিউবিমকা মিত্রোভিচ জানান, ২০২০ সালে রোমানিয়া সীমান্ত থেকে ২৫ হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা এর আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।

এই ধরনের ফিরিয়ে দেওয়া বা 'পুশব্যাক', যার কারণে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার অধিকার পায়না অভিবাসনপ্রত্যাশীরা, তা আসলে বেআইনি, জানান মিত্রোভিচ। তার মতে, রোমানিয়া থেকে পুশব্যাক হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ১২ শতাংশ সহিংসতার শিকার হ়য়েছেন।

এএফপির তরফে বহুবার যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে রোমানিয়ান পুলিশের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের সাথে তিক্ততা

সার্বিয়ার হাঙ্গেরীয়ভাষী এলাকায় আটকে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য সেখানে কোনো ভালো পরিবেশ থাকে না। স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই হাঙ্গেরির অভিবাসনবিরোধী গণমাধ্যম থেকে নিজেদের তথ্য পেয়ে থাকেন। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, "এই অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইঁদুরের মতো। তারা না গেলে আমাদের জীবনে শান্তি আসবে না।"

স্থানীয় বনাম অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে হাতাহাতি রোধে পুলিশকর্মীরা সারাদিন সারারাত টহল দেন। এখানে একটি ক্যাম্প গঠনের প্রস্তাব এলেও স্থানীয়দের বিরোধিতার কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি।

যদিও ইউরোপে ঢোকার এই বলকান পথ ২০১৫ সালের সংকটের মতো অত ব্যস্ত আজ আর নয়, তাও গত কয়েক বছর ধরে এই পথের প্রতি বাড়ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগ্রহ। হাজারে হাজারে মানুষ সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন প্রায়ই। স্থানীয়রা খুব শিগগিরই আরেকটি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢলের আশঙ্কা করছেন।

এসএস/এপিবি (এএফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন