রঞ্জন দাহালের মতো অভিবাসীরা পর্তুগালে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট, তবে সেখানকার পরিস্থিতি ভালো নয় | ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে
রঞ্জন দাহালের মতো অভিবাসীরা পর্তুগালে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট, তবে সেখানকার পরিস্থিতি ভালো নয় | ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে

বিপুল কৃষি পণ্য রপ্তানি করা ইউরোপীয় দেশগুলোর খামারে অনেক এশীয় শ্রমিকরা কাজ করেন৷ এসব শ্রমিকদের প্রায়ই মানবপাচারকারীদের বিভিন্ন চক্র নিয়ে আসে এবং অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করে৷

পর্তুগালের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের শহর আওমেইরিংয়ে ভোরবেলায় কাজে যাওয়া এশীয় শ্রমিকদের দেখলে মনে হবে লেবার ক্যাম্প-এর একদল শিকলবাঁধা কয়েদি যাদের বিভিন্ন খামারে, গ্রিনহাউসে এবং আঙ্গুরক্ষেতে নেয়া হচ্ছে৷

সেখানে ভারতীয়রা আঙুর গাছ পরিষ্কার করেন, থাইরা ক্ষেত থেকে রাস্পবেরি তোলেন যা জার্মানিতে রপ্তানি হয়, নেপালিরা ব্রোকলি চাষ করেন যা ব্রিটেনে রপ্তানি হয় আর পাকিস্তানিরা চাষ করেন মিষ্টি আলু যা যায় ফ্রান্সে৷ 

নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংস্থাগুলোর হিসেবে তিনহাজারের মতো অভিবাসী খামার শ্রমিক শুধু এই অঞ্চলেই কাজ করেন, আর গোটা পর্তুগালের হিসেবে সংখ্যাটি ত্রিশহাজারের বেশি৷ এসব শ্রমিকের অধিকাংশই দেশটিতে পুরোপুরি বৈধ নন, অর্থাৎ এখনো বৈধ হতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন৷ তারা অমানবিক পরিবেশে বসবাস করেন, প্রায়ই দিনে ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন এবং যেসব সংস্থা তাদের বিভিন্ন খামারে সাময়িক কাজ দেয় তাদের হাতে নির্মমভাবে শোষিত হন৷

বেসরকারি উন্নয়নসংস্থা প্রোয়াবেরাকার-এর সমাজকর্মী কাচা সেকেইরা আওমেইরিংয়ে বসবাসরত শ্রমিকদের বৈধ হতে সহায়তা করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘২০১৮ সাল থেকে এশীয়রা এখানেই আসছেন৷’’

এর আগে এশীয় শ্রমিকরা মূলত পর্তুগালের দক্ষিণের আলেনতেজো অঞ্চলে যেতেন৷ সেই অঞ্চলটি বেরিচাষ শিল্পের জন্য বিখ্যাত৷ এখন তারা সবখানেই রয়েছেন, কেননা কৃষি পণ্য রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে পর্তুগালের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সস্তা শ্রমিক পাওয়ার লোভও বেড়েছে৷

‘‘অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে,’’ বলেন সেকেইরা৷

পাচারকারী চক্র

করোনা মহামারি শুরুর পর গতবছর পর্তুগালের কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের শোষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি জানতে পারে৷ তখন দেশটি ঘোষণা দেয় যে যেসব শ্রমিক অন্তত তিনমাস টাকার বিনিময়ে কাজ করেছেন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় অবদান রেখেছেন, তাদেরকে বৈধ করা হবে৷ 

তবে, এই ঘোষণা সমস্যার সমাধান করেনি৷ কারণ পর্তুগালের অভিবাসন পুলিশ শ্রমিকদের বৈধ হওয়ার আবেদন যাচাইবাছাই করতে কয়েকমাস থেকে বছর অবধি সময় নিচ্ছে৷ ফলে কিছু আবেদনকারীকে কন্টেইনারে বা পরিত্যক্ত ভবনেই কোনরকমে থাকতে হচ্ছে এবং জীবিকার জন্য মাফিয়াদের মতো চাকুরিদাতা সংস্থার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে৷

পর্তুগালের কৃষিখাতের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকদের চাহিদাও বাড়ছে, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে
পর্তুগালের কৃষিখাতের সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসী শ্রমিকদের চাহিদাও বাড়ছে, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে

‘‘শ্রমিকদের জন্য একদিকে মহামারি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, কেননা এই কারণে তাদের বৈধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে৷ অন্যদিকে, নানা নাটকীয়তা এখনো চলছে,’’ ডয়চে ভেলেকে বলেন সেকেইরা৷ 

দক্ষিণ ভারতের কেরালা থেকে আসা ৩১ বছর বয়সি অর্জুন যোশী এসব বিষয় খুব ভালোভাবেই জানেন৷ মোটর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রশিক্ষিত এই যুবক ২০১৯ সালের জুলাইয়ে পর্যটক হিসেবে ইউরোপে প্রবেশ করেন৷ 

কিন্তু লিসবন বিমানবন্দরে এক চাকুরিদাতা দালালের খপ্পরে পড়েন তিনি৷ যোশী তাকে পর্তুগালে কাজ এবং বৈধভাবে থাকার কাগজ পেতে প্রায় ১৪০০ ইউরো দেন৷ 

কয়েকমাস পর অবশ্য ইউরোপের দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষেত থেকে বেরি তোলার কাজে ক্ষান্ত দেন তিনি৷ সেই কাজ করে মাসে দু’শো ইউরোর মতো রোজগার করতেন যোশী৷ সেখান থেকে বৈধ হওয়ার কাগজপত্রও পাননি তিনি৷ 

‘‘আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম৷ কিন্তু চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেখি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আমি নিবন্ধিত নই৷ ফলে নিজের পকেট থেকে আটশো ইউরো খরচ করে চিকিৎসা নিতে হয়েছে,’’ বলেন তিনি৷ 

সস্তা শ্রম দাস 

যোশী কিছুদিনের জন্য চালক হিসেবে কাজ করতে পেরেছিলেন৷ ‘‘কিন্তু তারপরই কোভিড আসলো এবং সাতমাস আমার ঘরে বসে কাটাতে হয়েছে বেকারত্বের হতাশা নিয়ে,’’ বলেন তিনি৷ 

তারপর অবশ্য ভাগ্য বদলে যায় অর্জুন যোশীর৷ পর্তুগালের এক নাগরিক তাকে বৈধ হতে সহায়তা করেন৷

‘‘এজন্য মাত্র একশ’ ইউরো খরচ হয়েছে,’’ বলেন সন্তুষ্ট যোশী৷ এরই মধ্যে তিনি গাড়ি সারানোর একটি ছোট্ট দোকানও দিয়েছেন৷ 

পর্তুগালে গাড়ি সারানোর কারখানা চালু করেছেন অর্জুন যোশী, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে
পর্তুগালে গাড়ি সারানোর কারখানা চালু করেছেন অর্জুন যোশী, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে

যোশী এখন একদিন তার প্রকৌশল শিক্ষার দিকে ফিরে যেতে চান৷ তার স্বপ্ন হচ্ছে হাইব্রিড গাড়ির খাতে একটি স্টার্টআপ তৈরি করা৷ 

‘‘আগামী কয়েকবছরে আমি এজন্য প্রয়োজনীয় টাকা জমা করবো এবং ততদিনে সব কাগজপত্রও তৈরি হয়ে যাবে,’’ বলেন তিনি৷ 

তবে, সব অভিবাসী যোশীর মতো ভাগ্যবান নন৷ অধিকাংশ শ্রমিকই মাসে রাষ্ট্র নির্ধারিত ছয়শ’ ইউরো বেতনে চাকুরি করেন, কিন্তু তাদের বাড়ি ভাড়া, কাজে যাওয়ার খরচ, এমনকি খাবারের টাকা চাকুরিদাতাকে দিতে হয়৷ ফলে প্রতিদিন কাজ শেষে তাদের হাতে দশ ইউরোর মতো অবশিষ্ট থাকে বলে জানান যোশী৷ 

তার দেশ থেকে আসা অনেক অভিবাসী পর্তুগালে বৈধ হতে মানবপাচারকারী চক্রকে দশহাজারের বেশি ইউরো দিয়েছেন৷ তাদের কেউ কেউ এভাবে বৈধ হতে পারলেও ঠিক মুক্ত হতে পারেননি৷ কারণ এই টাকা তারা নানাভাবে ঋণ নিয়েছেন৷ এখন সেই ঋণ পরিশোধের চাপে রয়েছেন অনেকে৷ 

‘‘তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত হয়েছে,’’ বলেন যোশী৷ 

বেকারত্ব থেকে মুক্তি 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্তুগালের কৃষিখাতে ব্যাপক সাফল্য দেশটির জন্য অভিশাপে পরিনত হয়েছে৷ দেশটি থেকে বেরি এবং সবজি রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সস্তা শ্রমিকের চাহিদাও অনেক বেড়েছে৷ 

‘‘পর্তুগালের নাগরিকেরা কৃষি খাতে কাজ আর করতে চান না,’’ বলেন কৃষক ভিটর জর্জি৷

পর্তুগালের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের শহর টোরিস ভ্যাদরেস-এ নিজের খামারেও তাই এশীয়দের নিয়োগ দিয়েছেন এই কৃষক৷ বর্তমানে সাতজন নেপালি জর্জির খামারে ব্রোকলি চাষ করছেন৷ এই সবজি বিদেশে রপ্তানি করে ভালো টাকা আয় হয় তার৷ 

অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন সহজ করতে চান চাষী ভিটর জর্জি, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে
অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন সহজ করতে চান চাষী ভিটর জর্জি, ছবি: ইয়খেন ফেল/ডয়চে ভেলে


‘‘আমি সবকিছু বৈধভাবে করছি৷ শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছেন৷ তারা সবাই নিবন্ধিত,’’ নিশ্চিত করেন তিনি৷ 

শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে খামারেই একটি ভবনে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন জর্জি৷ তবে তার ব্যবস্থা করা বাংক বেডসহ সাধারণ ঘর আর সবার জন্য একটি রান্নাঘরের আয়োজন ঠিক পুরোপুরি বৈধতার মানদণ্ড পার করে না৷ 

এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি আর কী করতে পারি৷ চাকুরিদাতা কার্যালয় আমাকে পর্তুগীজ শ্রমিক দিতে পারছে না, আর বাড়িসংক্রান্ত নিয়মকানুন আমলাতান্ত্রিকভাবে অত্যন্ত জটিল এবং একটি পুরনো খামারের পক্ষে তা মানা অসম্ভব ব্যাপার৷’’

রঞ্জন দাহাল অবশ্য এসব নিয়ে চিন্তা করছেন না৷ নেপালি এই নাগরিক মাত্র তিনদিন আগে জর্জির ক্ষেত থেকে ব্রোকলি তোলার কাজ শুরু করেছেন৷ 

‘‘আমি পর্তুগালে একবছর ধরে আছি এবং এই কাজটি পেয়ে সন্তুষ্ট,’’ বলেন তিনি৷ 

এর আগে তিনি এক কুখ্যাত চাকুরিদাতার অধীনে দক্ষিণে রাস্পবেরি ক্ষেতে কাজ করেছেন৷ 

‘‘আমাকে ছোট একটি বাড়িতে আরো পনেরজনের সঙ্গে থাকতে হয়েছে৷ এবং সেখানে সবসময় কোন না কোন সমস্যা ছিল৷ টাকাপয়সাও ঠিকভাবে পাওয়া যেত না,’’ বলেন তিনি৷ 

নেপালে কোন চাকুরি না পাওয়ায় পরিবারের অর্থকষ্ট মেটাতে পর্তুগালে পাড়ি জমান দেহাল৷ আগে ফ্লোরে ঘুমাতে হতো তার, এখন জর্জের খামারে বাংক বেডকে তারচেয়ে অনেক ভালো মনে করেন ২৯ বছর বয়সি এই অভিবাসী৷ 

প্রতিবেদন: ইয়খেন ফেল / এআই

প্রথম প্রকাশ: জুন ৭, ২০২১

মেধাসত্ত্ব ডয়চে ভেলে - সকল সত্ত্ব সংরক্ষিত

বাহ্যিক কোন ওয়েবসাইটের বিষয়বস্তুর জন্য ডয়চে ভেলে দায়ী নয়

সূত্র: ডিডাব্লিউ ডটকম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন