লো লাক কলেজের প্রবেশমুখে ইলিয়াসের সহপাঠীদের লাগানো প্লাকার্ড।  ছবি: ডিআর
লো লাক কলেজের প্রবেশমুখে ইলিয়াসের সহপাঠীদের লাগানো প্লাকার্ড। ছবি: ডিআর

ইলিয়াস নামে ১৩ বছরের এক আফগান শিশুকে সম্প্রতি পূর্ব ফ্রান্সের সেদান অঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিনই বাবা-মায়ের সাথে তাকে সুইডেনে পাঠিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ৷ এই ঘটনার তার সহপাঠী ও শিক্ষকরা ‘বাকরুদ্ধ’৷

ফ্রান্সের পূর্বে সেদানের লো-লাক কলেজে চাপা আতংক বিরাজ করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির এক ছাত্রকে সহপাঠীদের সামনে প্রতিষ্ঠানের চত্বর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ এরপর বাবা-মায়ের সাথে ফরাসি ভূখণ্ডের বাহিরে বহিষ্কার করা হয়৷ ইলিয়াস নামের এই শিক্ষার্থী গত ডিসেম্বর থেকেই ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছিলেন।

৯ জুন ১৩ বছর বয়সী এই আফগান শিশুর সন্ধানে একজন সমাজকর্মী কলেজের সামনে উপস্থিত হন। এরপর তাকে নিকটস্থ প্রশাসনিক থানায় নিয়ে যাওয়া হয়৷ পরবর্তীতে বাবা ও মায়ের সাথে তাকে প্রশাসনিক ডিটেনশন সেন্টারে (সিআরএ) আটক রাখা হয়। 

গ্রেফতারের পরদিন সকালে পরিবারটিকে ডাবলিন বিধিমালার অধীনে সুইডেনে ফেরত পাঠানো হয়৷ ইলিয়াসের বাবা-মা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেনে দুইবছর কাটিয়েছিলেন ও সেখানে তারা আশ্রয় আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের আশ্রয় আবেদন নাকচ করা হলে সেখানে অবৈধ হয়ে পড়েন। উপায় না দেখে তারা সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টায় গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সে এসেছিলেন।

ডাবলিন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার জন্য একজন আশ্রয়প্রার্থীকে ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়সীমার মধ্যে নতুন করে কোন আশ্রয় আবেদন করার সুযোগ থাকে না এবং এর মধ্যে আশ্রয়পার্থীকে ইউরোপে তিনি প্রথমে যে দেশে এসেছিলেন সেখানে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা থাকে। ইলিয়াসের বাবা-মা প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে তাদের ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে সফল হলেও তার সুফল তারা বেশিদিন পেলেন না৷ 

সবার প্রিয় শিক্ষার্থী

শিশুটিকে ফেরত পাঠানো ‘প্রক্রিয়াটি অগ্রহণযোগ্য’ বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন সেদান শহরের মেয়র দিদিয়ের হেরবিও৷ তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবশ্যই শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা হতে হবে৷ সেখানে প্রক্রিয়াটি অবশ্যই অন্যরকমভাবে করার সুযোগ ছিল। নিঃসন্দেহে এটি অমানবিক ছিল৷’’

তার শিক্ষকরাও ঘটনাটি বুঝে উঠতে পারেননি৷ ‘‘সবকিছু খুব দ্রুত ঘটেছিল৷ শিক্ষকদের পাশাপাশি কলেজের শিক্ষার্থীরাসহ আমরা সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম,’’ বলেন কলেজটির ফরাসি ভাষা বিভাগের শিক্ষক আন এলেন তেক্সিয়ের এবং কলেজের প্রিন্সিপাল আমানদিন বেক্রে৷

সহপাঠীরা ছাড়াও শিক্ষকদের কাছেও ইলিয়াস খুব প্রিয় ছিল৷ তার শিক্ষকদের মতে, ‘‘ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইলিয়াস খুব দ্রুত সবার সাথে মিশে গিয়েছিল এবং পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিল৷ সে খুব সামাজিক ছিল এবং দ্রুত অনেক ছাত্রছাত্রীকে তার বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিল। ফরাসি ভাষায় ভাল করে কথা না পারলেও সে তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলত৷’’ পড়াশোনায়ও শিক্ষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল ইলিয়াস৷

ইলিয়াস ও তার পরিবারকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটির দ্রুতগতি দেখে শিক্ষকরা ‘অবাক’ হলেও তারা ইলিয়াসের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক৷ প্রতিবাদ হিসেবে তারা শুক্রবার ‘মৃত কলেজ দিবস’ নাম দিয়ে দুই ঘন্টা পাঠবিরতির কর্মসূচী পালন করেন৷ তার শিক্ষক ও সহপাঠীরা ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার ও ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন৷ এমনকি তারা অনলাইনে একটি পিটিশনের ব্যবস্থা করেন৷ তার সহপাঠীরা কলেজের প্রবেশে মুখে বিভিন্ন পোস্টার ও প্লাকার্ডও লাগায়৷ 

ইলিয়াসের জন্য তার সহপাঠী এবং শিক্ষকদের লিখা বিভিন্ন পোস্টার এবং প্লাকার্ডের ছবি। ছবিঃ ডিআর
ইলিয়াসের জন্য তার সহপাঠী এবং শিক্ষকদের লিখা বিভিন্ন পোস্টার এবং প্লাকার্ডের ছবি। ছবিঃ ডিআর

পোস্টারে লেখা বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে ছিল, ‘‘ইলিয়াস, ফিরে আস, আমরা তোমাকে ফেরত চাই, তুমি আমাদের বন্ধু, সহপাঠী’’, ‘‘আমাদের বন্ধু ইলিয়াসকে খুঁজে দিতে আমাদের সহায়তা করুন’’৷

এলেন তেক্সিয়ের ও আমানদিন বেক্রে আরো জানান, ছাত্রছাত্রীরা তাদের কাছে প্রায়ই ইলিয়াসের খবর জানতে চাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মনে এই ঘটনার বিরুপ প্রভাব পড়েছে৷ 

নতুন ঘটনা নয়

অভিবাসন বিষয়ক এনজিও লা সিমাদের কর্মকর্তা জেরা সাদিক বলেন, ‘‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া বিরল ঘটনা৷ তবে ডাবলিন বিধিমালায় সুইডেনে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তিনি আরো জানান, ‘‘সুইডেনে আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়ার পরে অনেক আফগান ফ্রান্সে এসে আবার আশ্রয় আবেদন করেন৷ সুইডেনে আফগানদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর আশ্রয়নীতি অনুসরণ করা হয়। ফ্রান্সে অবতরণের পরপরই তারা বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও ও আইনজীবীদের সহায়তায় ডাবলিন বিধিমালা আটকানোর চেষ্টা করে থাকে৷’’

তবে, ফ্রান্সের আদালতের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তের ফলে অনেক আফগান আবার নতুন করে আশ্রয় আবেদন করার সুযোগ পেয়েছিল৷ কারণ তাদেরকে সুইডেনে ফেরত পাঠানো মানে আফগানিস্তানেই পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা৷ প্যারিস সবসময় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বহিষ্কারের বিপক্ষে।

‘‘ফ্রান্সে আশ্রয় আবেদন করা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্যে সংখ্যার বিচারে আফগানরা প্রথম৷ ইতোমধ্যে ৩০ হাজারেরও বেশি আফগান নাগরিক ফরাসি ভূখণ্ডে শরণার্থী সুরক্ষা মর্যাদা পেয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কার্যত বেশিরভাগ আশ্রয়প্রার্থী ডাবলিন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন’’, বলেন জেরা সাদিক।

কিন্তু ২০২১ সালের ২৮ মে কাউন্সিল অফ স্টেট বা রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা কাউন্সিলের একটি সিদ্ধান্তের কারণে আগের প্রবণতায় বেশ পরিবর্তন এসেছে৷ উপদেষ্টা কাউন্সিলের বিজ্ঞ সদস্যদের মতে, “সুইডেনে এই অপসারণ বৈধ, কেননা কোন আফগান নাগরিককে ইউরোপের কোন দেশে ফেরত পাঠানো মানে এটি প্রমাণ করে না যে, ঐ ব্যক্তিকে সরাসরি আফগানিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে৷’’

তবে সুইডেন থেকে আফগানিস্তানে সরাসরি ফেরত পাঠানোর সংখ্যাও কম নয়। ইলিয়াস ও তার পরিবারের সাথেও এরকম ঘটনার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে৷ এ নিয়ে সেদানের লো লাক কলেজের শিক্ষকরাও চিন্তিত৷ তাদের মতে, সে আফগানিস্তানে তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তাও করতে পারবে না৷ কারণ মাত্র ছয় বছর বয়সেই ইলিয়াস আগফানিস্তান ছেড়ে পরিবারের সাথে তুরস্কে চলে আসে৷ পরবর্তীতে সুন্দর ভবিষ্যতের খোঁজে বলকান অঞ্চলের রাস্তা ধরে ইউরোপে প্রবেশ করে৷ আমাদের কাছে, ইলিয়াস একজন ইউরোপীয় যে একটি নিরাপদ জীবনের সন্ধান করছে। পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে ইউরোপীয় কোন দেশে তাদের জায়গা পাওয়া খুব গুরুত্বপুর্ণ৷’’



এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন