বসনিয়া সীমান্তে একটি আফগান পরিবার। ছবি সূত্র এপি/ পিকচার অ্যালায়েন্স
বসনিয়া সীমান্তে একটি আফগান পরিবার। ছবি সূত্র এপি/ পিকচার অ্যালায়েন্স

ক্রোয়েশিয়া-বসনিয়া সীমান্তে শরণার্থীদের উপর পুলিশের অত্যাচার ও পুশব্যাকের খবর সম্প্রতি উঠে এসেছে বেশ কিছু ইউরোপীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে। বিষয়টি ধরা পড়েছে একটি ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ভিডিওতেও।

বেশ কিছু ইউরোপীয় গণমাধ্যম ক্রোয়েশিয়া- বসনিয়া সীমান্তে পুশব্যাক ও অবৈধ আচরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্তে নামে, যার ফলাফল প্রমাণ করছে এই ধরনের অভিযোগের সত্যতা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, শরণার্থী ও অভিবাসীরা এতদিন যাবত অভিযোগ করে এসেছে যে, ক্রোয়েশিয়া অবৈধভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বসনিয়ায় ফেরত পাঠাচ্ছে, কোনো ধরনের আশ্রয় আবেদনের সুযোগ না দিয়েই।

সুইস সংসবাদসংস্থা এসআরএফ রুন্ডশাও, জার্মান সংস্থা এআরডি, লাইটহাউস রিপোর্টস, সংবাদপত্র ডেয়ার স্পিগেল ও ক্রোয়েশিয়ার সংবাদপত্র নোভোস্তি'র সংবাদকর্মীদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে মোট ছয়টি পুশব্যাকের ঘটনা। এছাড়াও আরো ৬৫জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে পুশব্যাক করা হয় বলে অভিযোগ, যার মধ্যে ২০জনই শিশু। এদের মধ্যে একটি বড় আফগানিস্তান থেকে আসা৷

সাংবাবিদকরা অনুসন্ধানের জন্য সীমান্তের একটি তুলনামূলকভাবে ছোট অংশকে বেছে নিয়েছিলেন। মূল সীমান্তটি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ। ফলে, প্রতি সপ্তাহে পুশব্যাক হওয়া মানুষের সংখ্যা ৬৫'র বেশি বলে ধারনা করা হচ্ছে।

গর্ভবতী নারী ও শিশুদের পুশব্যাক

ডেয়ার স্পিগেলের সাংবাদিক স্টেফেন ল্যুডকে টুইট করেন একটি ভিডিও, যেখানে তিনি তুলে ধরেন এই চিত্র। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে ক্রোয়েশিয়ার পুলিশকর্মীরা গর্ভবতী নারী, শিশু, শারীরিকভাবে অক্ষম ও বয়স্কদের জোর করে বসনিয়ায় ঠেলে দিচ্ছে।


এমনই এক গর্ভবতী নারীর বয়ান বুধবার তুলে ধরেছে জার্মান সংবাদ পরিবেশনা 'টাগেশাও'। এ নারী ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগ্রেবে পুলিশের সাথে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। হাসপাতালে নিয়ে যাবার বদলে এই নারীর মোবাইল ফোন, টাকা ও অন্যান্য জিনিস নিয়ে নেয় পুলিশ, জানান সেই নারী ও তার সঙ্গীরা। এরপর আবার বসনিয়া সীমান্তে নিয়ে আসা হয় তাকে।

ডেয়ার স্পিগেলে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিও প্রতিবেদনে স্থানীয় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বলেন, কীভাবে ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ও ভেঙে ফেলে, যাতে পুশব্যাকের দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ না করতে পারেন তারা। সেই ভিডিও প্রতিবেদনে এক তরুণ আফগান বলেন, "ক্রোয়েশিয়ার পুলিশের কাছে আমরা জীবজন্তুর সমান।"

এই একই তরুণ এসআরএফ রুন্ডশাও-এর সাংবাদিকদের বলে কীভাবে তাকে ক্রোয়েশিয়ায় আশ্রয়ের আবেদন করতে না দিয়ে বসনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। যখন এই যুবকটিকে পুশব্যাক করা হয়, সেই সময় তার সাথে উপস্থিত ছিল তার পরিবারের সদস্যরাও, যার মধ্যে রয়েছে তার সাত বছর বয়সি শারীরিকভাবে অক্ষম ভাগ্নে। সেই যুবক সাংবাদিকদের জানায় যে এই পরিবার জার্মানি পৌঁছে এই ছেলেটির চিকিৎসা করাতে চাইছে।

ক্রোয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ যা বলছে

টাগেশাও-কে ক্রোয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় যে ভিডিওতে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা বৈধভাবে দেশে মানুষকে ঢুকতে না দেবার দৃশ্য। সেখানে অবৈধ কিছু নেই। এবং এভাবে দেশে না ঢুকতে দেবার অধিকার রয়েছে তাদের বলে জানায় তারা। ফলে, এক্ষেত্রে এই ধরনের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আশ্রয়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই, বলে জানায় ক্রোয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সাংবাদিকদের জানায় যে তাদের মোটেও সীমান্তের কাছে আটক করা হয়নি। বরং ক্রোয়েশিয়ার ভেতরে, শহরাঞ্চলে ধরে নিয়ে আসা হয় এবং পরে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে, যে দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে তা আসলেই অবৈধ কার্যকলাপের দৃশ্য, জানাচ্ছে তারা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও জেনেভা শরণার্থী নীতি অনুযায়ী, যে কোনো ব্যক্তিকে আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া উচিত। ফলে, যাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার অধিকার রয়েছে, তাদের কোনোভাবেই সীমান্তের ওপারে পুশব্যাক করা যাবেনা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে।

এসএস/আরআর

 

অন্যান্য প্রতিবেদন