প্রতীকী ছবি। ছবি সূত্র পিকচার অ্যালায়েন্স
প্রতীকী ছবি। ছবি সূত্র পিকচার অ্যালায়েন্স

১৯৮০ থেকে ইটালিতে রয়েছেন বেশ কিছু ভারতীয় শ্রমিক। তাদের দুঃসহ বাস্তবতার গল্প প্রায়ই রয়ে যায় অশ্রুত।

বহু বছর ধরেই ইটালিতে বাস করছেন বলবীর সিং। তার জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি প্রায়ই ইটালিয়ান বলতে শুরু করেন। নিজের জীবনকে 'মাচেলো' অর্থাৎ জগাখিচুড়ি হিসাবে বর্ণনা করলেও বাস্তবে অবস্থা আরো গুরুতর।

ইটালির রাজধানী রোমের দক্ষিণে লাতিনা অঞ্চলে টানা ছয় বছর ধরে তিনি যে অবর্ণনীয় কষ্টের জীবনযাপন করেছেন, তা বলে বোঝানোর নয়। সেখানে আরো হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিকের মতো তিনিও গরু-ছাগল দেখভালের কাজ করতেন।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, "সপ্তাহের সাতদিন, অর্থাৎ রোববারও আমি দিনে ১২-১৩ ঘণ্টা কাজ করতাম। কোনো ছুটি নেই, কোনো বিশ্রাম নেই।"

ভয়াবহ অবস্থায় বাস

যে খামারে কাজ করতেন বলবীর, সেখানে তাকে মাসে ১০০ থেকে ১৫০ ইউরো দেওয়া হতো, যা হিসাব করলে ঘন্টাপিছু ৫০ সেন্টেরও কম দাঁড়ায়।

অথচ নিয়ম অনুযায়ী ইটালিতে খামার শ্রমিকদের ঘন্টাপিছু জন্য ন্যূনতম আয় দশ ইউরোর মতো হওয়ার কথা।

ফেসবুক ও হোয়াটসাপের মাধ্যমে স্থানীয় ভারতীয়দের ও এক ইটালিয়ান মানবাধিকার কর্মীর কাছে সাহায্য চাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১৭ মার্চ বলবীরকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার হবার সময় তিনি একটি ক্যারাভানে থাকছিলেন। কোনো ধরনের হিটিং বা উষ্ণায়ন, বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই সেখানে থাকছিলেন তিনি।

মুরগি বা শুয়োরকে খাওয়াতে যে সমস্ত উচ্ছিষ্ট খামারের মালিক ফেলে দিতেন, তখন তা খেয়েই বাঁচতেন বলবীর।

ঘোড়া, গরু ছাগলকে স্নান করানোর জন্য যে পাইপ ছিল, সেটা দিয়েই তিনি স্নান করতেন এবং এসব নিয়ে অভিযোগ করার কোনো সুযোগ ছিল না তার।

বলবীর বলেন, "আমি যখন এই বিপদ থেকে বেরোতে একজন আইনজীবীর কাছে গেলাম, আমার খামারের মালিক আমায় বলল আমায় মেরে ফেলবে। মাটিতে গর্ত করে আমায় সেখানে ফেলে দেবে এবং গর্ত বুজিয়ে দেবে। আমার মালিকের কাছে বন্দুকও ছিল, আমি দেখেছি।"

বলবীর জানান, তাকে বেশ কয়েকবার মারধর করা হয় ও তার কাছ থেকে সমস্ত নথিও কেড়ে নেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রাণের ভয়ে একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে আছেন বলবীর, কারণ তার সেই সাবেক মনিব বর্তমানে শ্রমিক অত্যাচারের দায়ে বিচারাধীন আছেন।

অন্যায়ের চক্র

বলবীরের কাহিনী অন্য অনেকের চাইতে হৃদয়বিদারক হলেও এমন জীবন কাটাচ্ছেন লাতিনা ও আগ্রো পন্তিনো অঞ্চলের বহু খামার শ্রমিক।

জাতিসংঘের দাসত্ব বিষয়ক কমিটি জানায়, ২০১৮ সালে চার লাখেরও বেশি কৃষিকর্মী ইটালিতে অত্যাচারিত হন ও এক লাখেরও বেশি শ্রমিক 'মানবেতর পরিস্থিতিতে' কাজ করেন।

২০২১ সালের জুন মাসে, ২৭ বছর বয়সি এক যুবক ইটালির আপুলিয়া অঞ্চলের খামারে সারাদিন চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় বিরামহীন কাজ করে যাওয়ার ফলে মারা যায়।

আগ্রো পন্তিনো অঞ্চল, যেখানে ইটালির ফুল, ফল ও পনীর তৈরির বিশাল কারখানা ও খামার রয়েছে, তা আশির দশক থেকেই ভারতীয় শ্রমিকদের পছন্দের কর্মস্থল।

তিরিশের দশকে ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির আমলে এই অঞ্চলের শুকিয়ে যাওয়া জলাভূমিতেও কাজ করতে যান বহু ভারতীয়।

সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মী মার্কো ওমিৎজোলো, যার সাহায্যে মুক্তি পান বলবীর, জানান যে আগ্রো পন্তিনো অঞ্চলে বাস করেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভারতীয়, যাদের বেশিরভাগই পাঞ্জাব অঞ্চল থেকে আসা শিখ ধর্মাবলম্বী।

এভাবে শ্রমিকদের কাজ করানোর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবৈধ হলেও প্রক্রিয়াটি সুসংগঠিত। জমির মালিকের হয়ে এসব শ্রমিক নিয়োগ করে স্থানীয় 'কাপোরালি' বা গ্যাং নেতারা। যদিও শ্রমিকদের সাথে চুক্তির আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে বহু কম টাকা পান তারা।

ওমিৎজোলো এএফপিকে বলেন, "কেউ ২৮ দিন কাজ করলেও, কাগজে কলমে দেখানো হবে যে সে মাত্র চারদিনের কাজ করেছে। ফলে মাসের শেষে শ্রমিকের আয় হবে ২০০ বা ৩০০ ইউরো।"

সাম্প্রতিক একটি পুলিশি তদন্তের ফলে উন্মোচিত হয়েছে এই অবস্থার আরো একটি দিক। দেখা গেছে, ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তি।

তদন্তে দেখা যায়, সাবাওদিয়া শহরে এক ডাক্তার ২২২জন ভারতীয় শ্রমিককে অবৈধভাবে দেড় হাজার বাক্স দেপালগোস ওষুধ দিয়েছেন। এই ওষুধের মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রায় অক্সিকোডন, যা মূলত ক্যানসার রোগীদের দেওয়া হয়।

মূল তদন্তকারী জিউসেপে দে ফালকো এএফপিকে বলেন, "এই ওষুধ খেয়ে শ্রমিকরা শারীরিক যন্ত্রণা ও ক্লান্তি ভুলে মাঠে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে পারতেন।"

অধিকারের লড়াই

খামার শ্রমিকদের ওপর ঘটে চলা অত্যাচার শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অশ্রুত থাকেনি ইটালির কর্তৃপক্ষের কাছে। বলবীরের খামার মালিকের গ্রেপ্তার ও বিচার পুরোটাই হচ্ছে দেশটিতে ২০১৬ সালে প্রণয়ন হওয়া কাপোরালি-বিরোধী আইনের অধীনে।

কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলির মত, কড়াকড়ি এখনও পর্যাপ্ত নয়।

ওমিৎজোলো বেশ কিছু বছর ধরে লাতিনা অঞ্চলের খামারে শ্রমিক নির্যাতনের ওপর গবেষণা করে আসছেন। আরেকটি ভারতীয় শ্রমিক অধ্যুষিত গ্রাম বেলা ফার্নিয়াতে তিন মাস কাটান তিনি।

গবেষণা করতে গিয়ে বহুবার প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন ওমিৎজোলো৷ এ কারণে পুলিশি নিরাপত্তায় থাকতে হয় তাকে।

২০১৯ সালে তার কাজের জন্য ‘নাইট’ উপাধি পান ওমিৎজোলো। ২০১৬ সালে ইটালিতে আগ্রো পন্তিনোর ভারতীয় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের জন্য প্রথম ধর্মঘটের আয়োজন করেন তিনি।

এরপরেই ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় তিন ইউরো থেকে বেড়ে হয় পাঁচ ইউরো , যদিও তা এখনও দেশের সার্বিক ন্যূনতম মজুরির অর্ধেক।

উন্নত ভবিষ্যৎ এখনও দূর অস্ত, তবুও ওমিৎজোলো মনে করেন, এই ধরনের ছোট ছোট পদক্ষেপের ফলে ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে অধিকারের লড়াইয়ের গুরুত্ব জন্মায়। তারা বুঝতে পারে যে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের দাম আছে।

এসএস/এসিবি (এএসফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন