রাজধানী নিকোসিয়া তে তুর্কি সাইপ্রাস ও ইউরোপীয় সাইপ্রাস'কে পার্থ্ক্যকারী সবুজ লাইন। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
রাজধানী নিকোসিয়া তে তুর্কি সাইপ্রাস ও ইউরোপীয় সাইপ্রাস'কে পার্থ্ক্যকারী সবুজ লাইন। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস

৩৯ বছর বয়সী ক্যামেরুনের নাগরিক লেকে নিজ দেশে সমস্যায় পড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে। সেখান থেকে ইইউ পরিচালিত দ্বীপ সাইপ্রাসের দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নিতে গিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার আগে দ্বীপটির তুরস্কের দখলকৃত উত্তর অঞ্চলে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করে তুর্কি বাহিনী। পরবর্তীতে তাকে আবার কঙ্গোর রাজধানী কিনশায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল। পুরো সাক্ষাৎকারটি পড়ুন।

"আমি আমার ভিন্ন যৌন আচরণ বা সমকামিতার জন্য বাধ্য হয়ে ক্যামেরুন থেকে পালিয়ে আসি। দেশে আমি যে বাসায় থাকতাম সেখানে আমার বন্ধুর পরিবার যখন জানতে পেরেছিল আমি সমকামী, তখন তারা আমাকে মারধর করে বাড়িতে তালাবদ্ধ করে দেয়। একদিন আমি সেখান থেকে পালিয়ে আমার দেশ ছেড়ে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো (ডিআরসি)’তে আশ্রয় নিয়েছিলাম।”

“রাজধানী কিনশায়, আমি এক বন্ধুর সহায়তায় সেদেশের একটি নকল পাসপোর্ট পেতে সক্ষম হয়। আমি একটি ভিন্ন নাম ব্যবহার করেছিলাম কারণ আমার পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছিলাম। কঙ্গোর রাজধানীতে দু'বছর কাটানোর পরে আমি সাইপ্রাসে আমার ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ ডিআরসি-তে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারছিলাম না।”

ডিআরসি-তে সমকামিতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, তবে এটি সমাজে তেমন স্বীকৃত নয়।

“কঙ্গোতে, অনলাইনে কিছু 'ট্র্যাভেল এজেন্সি' রয়েছে যারা সাইপ্রাসের উত্তর অংশে (তুর্কি অধিকৃত অঞ্চল) বৈধভাবে প্রবেশের পরিষেবা দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ ২,৪০০ ডলার (২,০০০ ইউরোর কিছু বেশি) অর্থের বিনিময়ে তারা আপনাকে কঙ্গোর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া সনদের সাহায্যে সাইপ্রাসের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ফি প্রদান করে বৈধ নিবন্ধ করিয়ে দেয়। কিন্তু বিমানের টিকিটের দায়িত্ব তারা নেয় না এটি গ্রাহকদের নিজ থেকে কিনতে হয়।” 

"দালালের ফোন নম্বরটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল"

২০২১ সালের ১০ এপ্রিল, আমি [উত্তর সাইপ্রাসের] এর্কান বিমানবন্দরে পৌঁছায়। করোনা মহামারীর কারণে আমাকে বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইনের জন্য একটি হোটেলে পাঠানো হয়েছিল। দু'সপ্তাহ পরে হোটেল থেকে বেরিয়ে আমাকে কোভিড পরীক্ষা করানো হলে আমার কোভিড পজিটিভ ধরা পড়লে আমাকে আরও দু'সপ্তাহ হোটেলে থাকতে হয়।

হোটেলে কোয়ারান্টাইন শেষে আমি সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ সাইপ্রাসে প্রবেশের জন্য সেই পরিচিত দালালকে ফোন করলে বারবার তার নম্বরটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অকার্যকর দেখায়। পরবর্তীতে উত্তর সাইপ্রাসে বসবাসরত একজন আইভেরিয়ান শিক্ষার্থীর সাথে দেখা হলে তিনি আমাকে কয়েক দিনের জন্য তার বাসায় থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন।

অবশেষে একজন ক্যামেরুনিয়ানের সাহায্যে অন্য একজন দালালের নম্বর পেতে সক্ষম হই। যার সাহায্য ক্যামেরুনের এই নাগরিক ২৫০ ইউরোর বিনিময়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ সাইপ্রাসের সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল।  

সাইপ্রাস দুটি ভাগে বিভক্ত: উত্তরের অংশ(টিআরএনসি), তুর্কি প্রজাতন্ত্রের (টিআরএনসি) অধীনে রয়েছে। তবে এই অংশটি তুরস্ক ছাড়া অন্য কোনও দেশ দ্বারা স্বীকৃত নয়। দক্ষিণ অংশ বা সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র একটি স্বাধীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ। তবে দুটি দেশেরই রাজধানী হচ্ছে নিকোসিয়া শহর। আলাদা করার জন্য শহরের অভ্যন্তরে একটি সীমানা বা (গ্রিন লাইন) দেয়া হয়েছে। 

১ মে প্রস্থানের উদ্দেশ্যে রাতে আমরা সাতজনের একটি ছোট দল প্রস্তুতি নিতে থাকি। গ্রুপে আমি ছাড়া একজন ক্যামেরুনিয়ান, একজন নাইজেরিয়ান, দু'জন বাংলাদেশি, দু'জন পাকিস্তানি মানবপাচারকারী দালাল ছিল। সীমান্তে পৌঁছতে আমরা নিকোসিয়ার উত্তর অংশে পৌঁছতে প্রায় এক ঘন্টা হেঁটেছিলাম। তবে সীমানা প্রাচীর থেকে থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে সৈন্যরা আমাদের দেখতে পেয়ে থামিয়ে দিয়েছিল। পরে কয়েক ঘন্টা একটি সামরিক শিবিরে রেখে আমাদের স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা সবাই থানার একটি কক্ষে তিন দিন অবস্থান করার পরে আদালতে বিচারকের সামনে হাজির করা হয়।

অবৈধ অভিবাসনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত

বিচারক আমাদেরকে অবৈধ অভিবাসনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ থেকে ৪০ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। কারাগারে প্রথম এক সপ্তাহ আমরা একটি বড় কক্ষে কাটিয়েছি কারণ আশেপাশের অন্য কক্ষগুলি তখন খালি ছিল না। আমরা সেখানে প্রায় প্রায় বিশ জন আটক ছিলাম।

এক সপ্তাহ পরে ঘর খালি হলে আমাদের আলাদা করা হয়েছিল এবং আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নতুন বিভাগগুলি ছিল বেশ বড় যেখানে আলাদা চারটি কক্ষ ছিল। বন্দীদের মধ্যে সৌদি, পাকিস্তানি, বাংলাদেশিসহ আমরা প্রায় ৪০ জন নাগরিক ছিলাম যারা সবাই বিদেশি। তবে সেখানে অনেকে ধর্ষণ, মাদক সহ অন্যান্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামী ছিল। তাদের সাথে কথাবার্তার ফলে আমি বলতে পারি সেখানে প্রায় ৪০% বন্দী অবৈধ অভিবাসনের দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন এবং বাকিরা সাধারণ ফৌজদারী অপরাধের জন্য দন্ডিত ছিলেন।

সেখানে বিভিন্ন দেশের এবং ভিন্ন ভিন্ন অপরাধের ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে তেমন কোনও সমস্যা হয় নি এবং কারাগারের পরিবেশটি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা কারাগারের আঙ্গিনায় বিভিন্ন ধরণের খেলাধূলা করে আমাদের অবসর সময় কাটাতাম।

জুলাইয়ের শুরুতে আমি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে তুর্কি সাইপ্রাস কর্তৃপক্ষ আমাকে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে বা ডিআরসিতে ফেরত পাঠানোর জন্য বিমানের টিকেট করে দেয়। 

যে বন্ধুটি আমাকে কঙ্গোর রাজধানী কিনশায় থাকতে দিয়েছিল তার সহায়তায় আমি ফিরে আসি। তবে এখন আমি এখানে কি করব জানি না। কারণ ডিআরসিতে আমার কোন চাকুরী নেই এবং আমি ইউরোপীয় সাইপ্রাসে রাজনোতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে চাই কিন্তু আমাকে একবারের জন্য সেই সুযোগ দেয়া হয়নি । তবে আমি ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রথমবারের মতো আবারও দক্ষিণ সাইপ্রাসে ঢুকার চেষ্টা করব।

ফিরে আসার পর থেকেই আমি ভাবছি: এই সব ঘটনা থেকে আসলে কারা উপকৃত হয়? তুর্কী কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের আটক রেখে বন্দীদের খাবারের জন্য অর্থ প্রদান থেকে শুরু করে বন্দীদের তাদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়। এসব করে তাদের লাভ কী তা আমি বুঝতে পারি না? "



এমএইউ/এসএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন