তিমিসুয়ারায় অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় সবাই আফগান তরুণ, যাদের বেশীরভাগ দেশটিতে চলমান সহিংসতার কারণে দেশ ত্যাগ করার কথা জানায়। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
তিমিসুয়ারায় অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় সবাই আফগান তরুণ, যাদের বেশীরভাগ দেশটিতে চলমান সহিংসতার কারণে দেশ ত্যাগ করার কথা জানায়। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস

সার্বিয়া পার হয়ে আসা বেশকিছু অভিবাসী সার্বিয়া সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রোমানিয়ার পশ্চিমে অবস্থিত তিমিসুয়ারা শহরে অবস্থান করছেন। হাঙ্গেরিতে পৌঁছানোর উদ্দেশে তারা এখন পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

 তিমিসুয়ারা শহরে সন্ধ্যার শুরুতেই ভোগ্যপণ্যের চেইন শপ উশো’র কাছে আমাদের সাথে বেশ কিছু আফগান কিশোরের দেখা হয়, যাদের সবারই এখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার কথা। সেখানে ১৭ বছর বয়সি মোস্তফা ও দরিয়াব, ১৬ বছর বয়সি এমরান এবং তাদের বন্ধুরা দোকান থেকে খাবার কিনতে এসেছিল। দুই হাত ভর্তি মুরগি, দই এবং পাউরুটি কিনে তারা চলে গিয়েছিল। 

 এই আফগানরা রোমানিয়ার বেশিরভাগ আশ্রয়প্রার্থীদের মতো কয়েক সপ্তাহ আগে সার্বিয়া সীমান্ত পেড়িয়ে তিমিসুয়ারা পৌঁছেছিল। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে হাঙ্গেরি ও ক্রোয়েশিয়ার সীমান্ত বন্ধ হওয়ার কারণে, পশ্চিম রোমানিয়ার এই শহরটি বালকান অভিবাসন পথে নতুন ‘স্টপওভার’ হয়েছে৷

 তিমিসুয়ারার আঞ্চলিক অভ্যর্থনা কেন্দ্রের সীমান্ত পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের নিবন্ধন কার্ড যাচাই করতে আসা সত্ত্বেও আফগান কিশোরদের মুখে হাসি ছিল।

 তবে তাদের চেহারা জানান দিচ্ছিল তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো নেই। তাদের হাতে পোকামাকড়ের কামড়ের দাগ ছিল, তারা ক্রমাগত চুলকাচ্ছিল। আবার যারা হাফপ্যান্ট পরেছিল, সীমান্ত অতিক্রম করার সময় পায়ের ক্ষতগুলি ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। 

 "সার্বিয়ায় শুনেছিলাম রোমানিয়া একটি ভালো দেশ"

 সার্বিয়া থেকে রোমানিয়া ঢোকার সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায় হচ্ছে পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করা। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে মাইলের পর মাইল বিভিন্ন মাঠ, জঙ্গল এবং বড় বড় গাছবেষ্টিত অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে। দ্বিতীয় পথ হচ্ছে টাকার বিনিময়ে গাড়িতে বা নৌকায় করে সীমান্তবর্তী দানিয়ুব নদী পার হওয়ার চেষ্টা করা। 

এইড রোমের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৮ বছর বয়সী সওদা দানিয়ুব নদী পার হয়ে রোমানিয়া প্রবেশ করেন। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
এইড রোমের আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৮ বছর বয়সী সওদা দানিয়ুব নদী পার হয়ে রোমানিয়া প্রবেশ করেন। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস


১৮ বছর বয়সি সোমালিয়ান কিশোরী সওদা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিল। তিমিসুয়ারা এইড রোম (একুম্যানিকাল অ্যাসোসিয়েশন অফ চার্চস অফ রোমানিয়ার) আশ্রয় কেন্দ্রে সোমালিয়ান মহিলাদের সাথে এখন আছেন। নীল এবং লাল রংয়ের স্কার্ফ বা হিজাব পরা এই মেয়েটি সোমালিয়া থেকে তুরস্কে বিমানে করে এসেছিলেন। সেখান থেকে তিনি গ্রিস হয়ে সার্বিয়া পৌঁছেছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে বাগানে বসে তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, "আমি সার্বিয়ায় দু'মাস কাটিয়েছিলাম। সেখানে, আমি মানুষকে বলতে শুনেছি রোমানিয়া একটি ভালো দেশ।"

তিনি জানান, “ দাদী আমার জন্য দানিয়ুব নদী পাড়ি দিতে পাচারকারীদের দিতে ৯০০ ইউরো পাঠিয়েছিল। নৌকায় আমরা প্রায় দশ জন ছিলাম এবং মাঝরাতে নদীটি পেরিয়ে গিয়েছিলাম। ঘটনাটি ভয়াবহ ছিল কারণ চারদিক থেকে নৌকায় পানি ঢুকছিল।"

তিনি আরও বলেন, "এখানে আসার পরে, রোমানিয়ান পুলিশ আমাদের গ্রেপ্তার করে আঙুলের ছাপ নেয় এবং ১০ দিনের জন্য আমাদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তারপরে আমাকে এইড রোম কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।"

ট্রানজিট দেশ

সার্বিয়া থেকে আসা সুপার শপের সামনে দেখা হওয়া তরুণ আফগান দলটি জানায়, আমাদের জন্য রোমানিয়ায় প্রবেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্রবেশ করার মতই ব্যাপার ছিল। ঐতিহ্যবাহী আফগান পোশাক পরা মোস্তফা তার বুকে থাকা উল্কি বা ট্যাটু দেখিয়ে বলতে থাকেন, “২০০৭ সাল থেকে দেশটি কার্যকরভাবে ইউইউ সদস্য হলেও তরুণ আফগানদের কাছে এটি ইউরোপের চিত্রের সাথে মেলে না। সার্বিয়ায়, আমরা রসিকতা করে বলতাম, একবার রোমানিয়ায় ঢুকতে পারলে ইউরোপে পৌঁছে যাব, কিন্তু আসলে তা সত্য নয়।" 

বেশিরভাগ আশ্রয়প্রার্থীর মতে রোমানিয়া অভিবাসন পথের শরেষ দেশ হলেও অনেকের মতে, তিমিসুয়ারা অভিবাসীদের জন্য পশ্চিমা ইউরোপে প্রবেশের প্রধান ধাপ।

জেআরএস রোমানিয়া সংস্থার প্রকল্প সহকারী গ্যাব্রিয়েল ইলিয়াস বলেন "কেউ এখানে থাকতে চায় না কারণ রোমানিয়া অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ নয় এবং অভিবাসীদের বন্ধুবান্ধব অথবা পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই ইউরোপের অন্যান্য দেশে বাস করে থাকেন৷’’

ইইউতে যোগ দেয়ার চৌদ্দ বছর পরে, রোমানিয়া এখন শেঞ্জেন এলাকায় যোগদানের প্রার্থী। এ কারণে রোমানিয়ান কর্তৃপক্ষ ইইউকে অভিবাসন প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে দক্ষতার প্রমাণ দিতে আগ্রহী।

ছয়টি অভ্যর্থনা কেন্দ্র

রোমানিয়ান আশ্রয় ও ইন্টিগ্রেশন অধিদফতরের প্রধান ইলিয়ডোর পিরভু ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “রোমানিয়ায় উপস্থিত সব আশ্রয়প্রার্থীরা ছয়টি ভিন্ন আঞ্চলিক অভ্যর্থনা কেন্দ্রের (বুখারেস্ট, তিমিসুয়ারা, সোমকুটা মেরে, গিরিগিউ, রাডোটি এবং গালাতীতে অবস্থিত) যেকোন একটিতে নিবন্ধিত আছেন। এই উন্মুক্ত কেন্দ্রগুলিতে থাকা আশ্রয়প্রার্থীরা দিনের বেলায় ক্যাম্প থেকে বের হতে পারেন, তবে তাদেরকে অবশ্যই সন্ধ্যায় বাধ্যতামূলকভাবে ফিরে আসতে হয় এবং বিশেষ অনুমোদন ছাড়া শহরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই।”

রোমানিয়ায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য মোট ছয়টি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে রয়েছে। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
রোমানিয়ায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য মোট ছয়টি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে রয়েছে। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস


অনেক চেষ্টার পরে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিমিসুয়ারা কেন্দ্রটি পরিদর্শনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। সাধারণত প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় না। সেখানে ইনফোমাইগ্রেন্টস দেখতে পায়, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৬৫ জন আশ্রয়প্রার্থীকে রাখা হয়েছে৷ তবে ক্যাম্পে ২৫০ জন লোক রাখার সক্ষমতা রয়েছে। সেখানে শিগগিরই আরও ১০০ জন অতিরিক্ত লোক রাখার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। আশ্রয়কেন্দ্রটির কেন্দ্রে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এলিডোর পিরভু ব্যাখ্যা করেন, "এগুলি মূলত আরও বেশি আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহার করা হবে। এছাড়া আমরা যেসব এনজিও ও সংস্থাদেরদের সাথে কাজ করি তাদের জন্য নতুন অফিস এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত জায়গা রাখা হবে।"

অতিরিক্ত ১০০ জনের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিমিসুয়ারার আশ্রয় কেন্দ্রে চলমান নির্মাণ কাজ। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
অতিরিক্ত ১০০ জনের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিমিসুয়ারার আশ্রয় কেন্দ্রে চলমান নির্মাণ কাজ। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস


ইনফোমাইগ্রেন্টসকে আশ্রয় প্রার্থীদের থাকার জায়গাগুলো দেখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ক্যাম্পের পরিচালক জানান, "শিগগিরই এসব জায়গা সংস্কার করা হবে৷’’

বসবাসরত অভিবাসীদের ইনফোমাইগ্রেন্টস আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে সাক্ষাতকার নিলে তারা জানায়, থাকার জায়গাগুলো নোংরা এবং পোকামাকড়ে ভর্তি। এছাড়া, অন্যান্য কেন্দ্রের মত এখানেও প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের অভাবের কারণে, রোমানিয়ান কর্তৃপক্ষ কেবলমাত্র ১৬ বছরের কম বয়সিদের বিশেষ কাঠামোয় রাখে। এ কারণে মোস্তফা, দারিয়াব এবং এমরান প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সাথে একই কেন্দ্রে নথিভুক্ত।

কঠোর এবং সহিংস পুলিশি অভিযান

যেখানে তারা নিবন্ধিত সেই শহর ছাড়ার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিছু অভিবাসী তিমিসুয়ারায় বাস করেন। এরকম ঘটেছে ১৪ বছরের সাহেল এবং ২৫ বছর বয়সি ফরহাদের ক্ষেত্রে। এই আফগানদের মধ্য গালাতী অভ্যর্থনা কেন্দ্রে নিবন্ধন করা হয়েছে৷ তবে সেখানে পুরানো পরিত্যক্ত স্কুলে ঘুমাতে দেয়া এবং আশপাশের জায়গা আবর্জনা এবং দুর্গন্ধযুক্ত ছিল। 

গালাতী শহরের একটি পরিত্যক্ত দালানে ঘুমন্ত আফগান তরুণ সাহেল এবং অপরপাশে বসা ফরহাদ। পরবর্তীতে তারা তিমিসুয়ারা চলে যায়। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
গালাতী শহরের একটি পরিত্যক্ত দালানে ঘুমন্ত আফগান তরুণ সাহেল এবং অপরপাশে বসা ফরহাদ। পরবর্তীতে তারা তিমিসুয়ারা চলে যায়। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস


কয়েক সপ্তাহ আগে, তাদের কয়েকজন গালাতী শহরের বিভিন্ন পরিত্যক্ত ভবনে ঘুমাচ্ছিলেন। তবে ১৯ ই এপ্রিল তাদের এক পরিচিত আফগান আরেক তরুণ আফগানকে হত্যার পরে, শহরে পুলিশি অভিযান আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলে শহরটির প্রায় সব স্কোয়াট খালি হয়ে যায়।

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেও পুলিশ আরও বেশি উপস্থিত থাকে এবং অভিবাসীদের সংখ্যাও সেখানে কমে আসে৷ সীমান্তবর্তী গোটলব গ্রামে কিছুদিন আগে কিছু "অল্প বয়স্ক বিদেশিদের" কয়েকদিন আগে স্থানীয়রা একটি ফুটবল মাঠের পাশে দেখতে পেয়েছিল। স্থানীয় ফুটবল ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, "আমি কোন বিদেশীকে দেখা মাত্র পুলিশকে ফোন করব না। কারণ আমি নিজেই একটা সময় রোমানিয়া থেকে সার্বিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলাম।’’ উল্লেখ্য নিকোলা স্যুসেস্কুর স্বৈরশাসকের আমলে ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার রোমানিয়ান দেশ ছেড়ে সার্বিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল।"

সীমান্তে পার হতে গিয়ে অনেক অভিবাসী সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে থাকেন। যেমন মুস্তাফা বলেছিলেন, তিনি সাতবার সার্বিয়ান-রোমানিয়ান সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিলেন। 

গত জানুয়ারিতে ইনফোমাইগ্রেন্টস এমন একজন মালির নাগরিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, যিনি দাবি করেছিলেন, রোমানিয়ান পুলিশ তাকে মারধোর করে ফিরিয়ে দিয়েছে। মে মাসে ড্যানিশ শরণার্থী কাউন্সিল এবং অন্য দশটি সংস্থার একটি প্রতিবেদনে রোমানিয়া ও সার্বিয়ার সীমান্তে কমপক্ষে ৩৩১ টি পুশব্যাকের ঘটনা উঠে এসেছে।

হাঙ্গেরি সীমান্তের তথ্য পাওয়া বেশ কঠিন। তিমিসুয়ারায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরা এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানাতে চান না। তারা জানায়, সীমান্তের কাছে কেবল গাড়ি পার্কিং ব্যবহার করা যায়৷


এমএইউ/এপিবি


 

অন্যান্য প্রতিবেদন