শরণার্থী সাঁতারু ইয়ুসরা মারডিনি, ছবি’: পিকচার এলায়েন্স
শরণার্থী সাঁতারু ইয়ুসরা মারডিনি, ছবি’: পিকচার এলায়েন্স

টোকিও অলিম্পিকের প্রাথমিক ধাপ পার হওয়ার মতো অবস্থাতেও ছিলেন না সিরীয় সাঁতারু ইয়ুসরা মারডিনি৷ তবে শরণার্থী দলের পতাকাবাহী এই ক্রীড়াবিদের অলিম্পিকে অংশগ্রহণটাই ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷

পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম৷ তারপর এক মিনিট, ছয় সেকেন্ড ও আরো প্রায় এক সেকেন্ড পর সব শেষ৷ একশ’ মিটার বাটারফ্লাইয়ের হিটেএটাই ছিল সবচেয়ে দুর্বল পারফর্ম্যান্স৷

খেলার চেয়ে সুযোগই আসল

বাইরে থেকে দেখলে প্রিলিমিনারি রাউন্ডের এই পারফর্ম্যান্স ইয়ুসরা মারডিনির জন্য একটি ছোট্ট, আবেগহীন মুহূর্ত৷ সাঁতারের সময় ভেন্যুর প্রেসবক্স ভর্তি ছিল৷ তবে দর্শকের কাতারে বিভিন্ন দেশের অল্প কিছু সমর্থক আর কোচ ছাড়া কেউ ছিল না৷ সেখানে যতটুকু উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তা মার্কিন দলের হুইসেল আর করতালির কারণে৷  

২০১৫ সাল থেকে শরণার্থী হিসেবে জার্মানিতে বসবাসরত মারডিনির জন্য এটা অবশ্য এক বিশেষ মুহূর্ত৷ আন্তর্জাতিক শরণার্থী দলের অংশ হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিকে যোগ দিয়েছেন তিনি৷ এই দলে মনোনীত হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমার কাছে রিও ডি জানিরোর চেয়ে টোকিও অনেক বেশি আবেগের ব্যাপার৷’’ 

রিও অলিম্পিকে মারডিনি, ছবি: মিশায়েল কাপেলার / ডিপিএ / পিকচার এলায়েন্স
রিও অলিম্পিকে মারডিনি, ছবি: মিশায়েল কাপেলার / ডিপিএ / পিকচার এলায়েন্স


নিজের পারফর্ম্যান্সের কথা যদি বলা হয় তাহলে মারডিনি বিশ্বের সেরা সাঁতারুদের তুলনায় দশ সেকেন্ডেরও বেশি সময় পিছিয়ে রয়েছেন৷ তবে, বিশেষ রিফিউজি অলিম্পিক টিম (আরওসি)-এর সদস্য হওয়ায় অলিম্পিকের স্ট্যান্ডার্ মানার বাধ্যবাধকতা ছিল না তার৷ আরওসি-র সদস্য হিসেবে মোট ২৯ ক্রীড়াবিদ টোকিও অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছেন৷ তাদের মধ্যে সাতজন জার্মানিতে থাকেন৷   

এই শরণার্থী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে অবশ্য মারডিনি সবচেয়ে পরিচিত৷ পাঁচ বছর আগে ব্রাজিলে প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে অংশ নেন তিনি৷ সেসময় তরুণী শরণার্থী হিসেবে তার জীবনের গল্প গোটা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল৷ নিজের বোনকে সাথে নিয়ে আটটি দেশ ঘুরে জার্মানিতে পৌঁছান তিনি৷ এই যাত্রায় রাবারের ডিঙ্গিতে সাড়ে তিনঘণ্টার সমুদ্র যাত্রাসহ দুর্বিষহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা৷ 

পোপের সফর, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারি 

তিনি এখন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর একজন প্রতিনিধি এবং ইতোমধ্যে পোপের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন৷ মারডিনির জীবন নিয়ে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে৷ তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হচ্ছে, যা আগামী বছর নেটফ্লিক্সে দেখা যাবে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিপল ম্যাগাজিন’-এর হিসেবে তিনি হচ্ছেন ‘বিশ্ব বদলানো ২৫ নারীর একজন৷’

মারডিনি এবং পুরো আরওসি দলের কাছে অলিম্পিকে অংশ নেয়া মানে সময়, উচ্চতা, দূরত্ব, পয়েন্ট, গোল কিংবা অন্য কোনো মাঠের সাফল্য নয়৷ তাদের কাছে এটা স্বপ্নে বিশ্বাস রাখা এবং সেই স্বপ্ন অর্জনে নিজে এগিয়ে যাওয়া এবং অন্যকেও উৎসাহিত করার ব্যাপার৷ নিজের দেশে যত বাধাই আসুক না কেন এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হতে চান এই ক্রীড়াবিদরা৷ 

পোপের সঙ্গে মারডিনি, ছবি: পিকচার এলায়েন্স
পোপের সঙ্গে মারডিনি, ছবি: পিকচার এলায়েন্স


‘‘আমি এই গল্প শত সহস্রবার বলেছি,’’ বলেন ২৩ বছর বয়সি মারডিনি৷ ‘‘আর যদি দরকার হয়, আমি আরো অসংখ্যবার এটা বলবো৷ আমি আমার জীবনের গল্প বলে মানুষকে আশা দিতে চাই৷ যদিও আমি শুধু সাঁতারে মনোযোগী হতে আগ্রহী, তবুও আমি আমার জীবনের গল্প বারংবার বলতে চাই যাতে অন্যরা উৎসাহী হয়৷’’

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পতাকাবাহী

দু’টি অলিম্পিকে অংশ নিয়ে ইতোমধ্যে জীবনের দু’টি বড় স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন মারডিনি৷ তবে টোকিওতে আরো একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার৷ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সহক্রীড়াবিদ ইরিত্রিয়ার টাকলোউইনি গাব্রিয়াসোসকে সঙ্গে নিয়ে অলিম্পিকের পতাকা বহন করেছেন তিনি৷ 

‘‘রিফিউজি অলিম্পিক পতাকা বহন এবং দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমার যে কী অনুভূতি হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না,’’ ইন্সটাগ্রামে লিখেছেন ইয়ুসরা মারডিনি৷ এক লাখ চল্লিশ হাজারের বেশি মানুষ ছবি শেয়ার করার প্ল্যাটফর্মটিতে তাকে অনুসরণ করেন৷

টোকিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পতাকা বহন করছেন ইয়ুসরা মারডিনি এবং টাকলোউইনি গাব্রিয়াসোস
টোকিও অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পতাকা বহন করছেন ইয়ুসরা মারডিনি এবং টাকলোউইনি গাব্রিয়াসোস


তবে অলিম্পিকে এটাই সম্ভবত তার শেষ অংশগ্রহণ৷ ইতোমধ্যে নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা শুরু করেছেন তিনি৷ 

‘‘আমি একটি জার্মান পাসপোর্ট পেতে চাই, তারপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং সাঁতারের স্কুল চালু করতে চাই,’’ বলেন মারডিনি৷ 

লেখক: সারাহ ভিয়ার্ৎস

প্রথম প্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২১

 

অন্যান্য প্রতিবেদন