সার্বিয়া-রোমানিয়া সীমান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ছবি সূত্রঃ পিকচার অ্যালায়েন্স
সার্বিয়া-রোমানিয়া সীমান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। ছবি সূত্রঃ পিকচার অ্যালায়েন্স

বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম দেখতে সাধারণ হলেও তার পেছনে রয়েছে পুশব্যাকের গুরুতর চিত্র। ইনফোমাইগ্রেন্টস তুলে ধরছে সেই অবস্থার চিত্র।

সার্বিয়ার সাথে হাঙ্গেরি, রোমানিয়ার মতো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রের সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তে ভিড় করে আছেন অসংখ্য অভিবাসনপ্রত্যাশী। দেশটির সীমান্তবর্তী গ্রাম মাজদানে স্থানীয়দের সাধারণ জীবনযাপনের পাশেই রয়েছে এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রার সমান্তরাল বাস্তবতা।

রোমানিয়া ও হাঙ্গের সংলগ্ন সার্বিয়া সীমান্তে কড়া পাহারা থাকা সত্ত্বেও এই গ্রাম ইউরোপগামী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে জনপ্রিয় 'বলকান রুটের' অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের দেশগুলিতে ঢোকার নানা চেষ্টা চালাতে থাকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের৷ বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার এ চেষ্টার নাম 'গেম মারা'। একবার ‘গেম মারায়’ বিফল হলে নতুন করে গেম মারার জন্য নিতে হয় প্রস্তুতি৷ আর তাই পরের গেমের প্রস্তুতি নিতে সার্বিয়ার মাজদান গ্রামটি হয়ে উঠেছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিশ্রামকেন্দ্র।

এই গ্রামটি ঘুরলে বুঝা যায় যে কীভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা একই জায়গায় দীর্ঘ দিনের জন্য আটকে থাকেন। কয়েক মাস ধরে আটকে থাকা এ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এগিয়ে যাওয়ার কিংবা গেম মারার প্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে আসার অর্থাৎ কোনো সামর্থ্যই থাকে না।

কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে গেলেও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এই সীমান্ত থেকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। আশ্রয়ের আবেদন না করতে দিয়ে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেবার এই ধারাকে বলা হয় 'পুশব্যাক', যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।

মাজদানের গুরুত্ব কোথায়?

মাজদানের বেশ কিছু পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ নতুন জীবনের আশায় তারা দেশ ছেড়েছেন৷ সীমান্তবর্তী এ গ্রামটিতে বর্তমানে মোট দুইশ অভিবাসনপ্রত্যাশী রয়েছেন৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা গ্রামটিতে বসবাসরত জনসংখ্যার প্রায় কাছাকাছি৷ 

সার্বিয়া-রোমানিয়া সীমান্তবর্তী ভুট্টা ও সূর্যমুখী ক্ষেতের মাঝে শয়ে শয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের হাঁটার দৃশ্য এখন আর নতুন কিছু নয়৷ ফিলিস্তিনি অভিবাসনপ্রত্যাশী ২৪ বছর বয়েসি মারসেল ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশ্যে এই পথেই বিশ থেকে ত্রিশবার গেম মারার চেষ্টা করে বিফল হয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘রোমানিয়ার সীমান্ত বড় সমস্যা। সেই সীমান্ত বন্ধ থাকায় বারবার পুলিশ আমাকে ধরে সার্বিয়ায় পাঠিয়ে দেয়৷’’

হাঙ্গেরি সংলগ্ন সার্বিয়ার সীমান্ত অভিবাসীদের এমন স্রোতের ফলে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই কারণে, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা প্রথমে রোমানিয়ায় প্রবেশ করে তারপর হাঙ্গেরিতে যান। বাকি হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীর কেউ কেউ প্রথমে বসনিয়া গিয়ে তারপর ক্রোয়েশিয়ায় যান, বা কেউ কেউ সরাসরি ক্রোয়েশিয়া যাবার চেষ্টা করেন। 

তবে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রোয়েশিয়া পুলিশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রতি নৃশংস আচরণ এর আগেও আলোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে।

তবে স্বাধীনভাবে এইসব পুশব্যাকের ঘটনা যাচাই করার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রগুলো পক্ষে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়ে পড়েছে।

পুশব্যাক ও অন্যান্য অভিযোগ

সোমালিয়ার নাগরিক অ্যাডাম আহমেদ বলেন যে, কেবল গত মাসেই রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির পুলিশ তাকে মোট নয়বার পুশব্যাক করে সার্বিয়ায় ফেরত পাঠিয়েছে। বর্তমানে, মাজদানের একটি পরিত্যক্ত ভবনে আহমেদ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন সোমালিয়ার নাগরিক ও সিরিয়ান অভিবাসনপ্রত্যাশীরা রয়েছেন৷ এর মধ্যে রয়েছে একটি আট বছর বয়েসি বালকও।

আহমেদ বলে, ‘‘সোমালিয়ায় আমার নিজের কোনো বাসা নেই। আমি সেখানে খুবই গরীব। আমি ইউরোপে যেতে চাই। এখানে এই বাসায় আমি আসি। নিজের কাপড় ধুই, রান্না করি, কিন্তু তারপরেই আমি আবার চেষ্টা করব। আমি আবার সীমান্ত পেরোতে যাব।’’

জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রথম মাজদান গ্রামের এমন পরিস্থিতর খবর পাওয়া যায়৷ বলা হয়, এই গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় প্রবল আকার ধারণ করেছে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সাথে দুর্ব্যবহারের চিত্র। আশ্রয়ের আবেদন করতে না দেওয়ার পাশাপাশি, শারীরিক নির্যাতন ও অত্যাচারের কথাও উঠে আসে প্রতিবেদনে।

ডেনিশ রিফিউজি কাউন্সিল বা ডিআরসি ও অন্যান্য সংগঠনের মাধ্যমে তৈরি এই প্রতিবেদনগুলোতে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত মোট তিন হাজার ৪৩ জনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পুশব্যাকের পাশাপাশি, সীমান্ত পারাপারের সময় অভিভাবক ও তাদের সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

ডিআরসি'র সেক্রেটারি জেনারেল শার্লটে স্লেনটে বলেন, ‘‘এই সংখ্যাগুলি আমাদের ভীত করে ঠিকই, কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে কতগুলো মানুষের, নারী, পুরুষ, শিশুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। তা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’’

মাজদানে পৌঁছায় সংবাদসংস্থা এপি, কিন্তু সেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সাংবাদিকদের সাথে মুক্তভাবে কথা বলতে ভয় পান। সেখানে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্থানীয় দালালদের ওপরেই ভরসা রাখতে হয়, যাদের সাহায্যে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করতে থাকেন তারা।

সোমালিয়ার নাগরিক আবদিফিতাহ আহমেদ, যিনি ১৪ বার সীমান্ত পেরোতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, বলেন, ‘‘আমি আরেকবার চেষ্টা করব গেম মারার। সৌভাগ্য থাকলে হবে। নাহলে রোমানিয়া পুলিশ আমাকে ধরবে আর এখানে ফেরত পাঠাবে।’’

আহমেদের মতে, ‘‘সোমালিয়ার জীবন ভালো নয়, ইউরোপের জীবন ভালো।’’

এসএস/আরআর (এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন