মরক্কো থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্যানারি দ্বীপের পুলিশ। ছবি সূত্রঃ এপি
মরক্কো থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্যানারি দ্বীপের পুলিশ। ছবি সূত্রঃ এপি

অবৈধ উপায়ে ইউরোপে প্রবেশ করতে গিয়ে ঠিক কতজন প্রাণ হারান, তা নিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সঠিক পরিচয়পত্রর অভাবে এই কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না সাগরে প্রাণ হারানো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃতদেহ। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপ পর্যন্ত অতলান্ত মহাসাগরের পথ এমনই এক মারণ পথ।

ইন্টারন্যাশনাল অর্গ্যানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরের এই পথে ইউরোপে আসতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী।

কিন্তু আইওএমও একমত যে, আসলে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হতে পারে। আইওএমের মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রকল্পের জুলিয়া ব্ল্যাক কিছু দিন আগেই বলেন যে, সাগরে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের দুই-তৃতীয়াংশের খোঁজ কখনোই মেলে না।

অন্যদিকে স্প্যানিশ এনজিও কামিনান্দো ফ্রন্তেরাস (যার অর্থ, পায়ে হাঁটা সীমান্ত) জানায়, ২০২১ সালে এখন পর্যন্ত স্পেনে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত দুই হাজার ৮৭ জন। এর মধ্যে এক হাজার ৯০০ জনেরও বেশি হারিয়েছেন ক্যানারি দ্বীপগামী এই অতলান্ত পথেই।


বেমালুম নিখোঁজ যারা

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটা বড় অংশ কখনোই হিসেবে আসে না, কারণ তারা তাদের পরিবার বা কাছের মানুষদের না জানিয়েই দালালের মাধ্যমে নকল নথি জোগাড় করে বেরিয়ে পড়েন। ফলে তাদের সংখ্যা জানা কঠিন হয়ে যায়।

এমনই অভিজ্ঞতা ২০০৩ সালে দেশ ছেড়ে আসা সেনেগালের নাগরিক এমবায়ে বাবাকার দিওউফের। ইনফোমাইগ্রেন্টসের আসন্ন পডকাস্ট সিরিজের জন্য আমাদের সাথে কথা বলেছেন দিওউফ। দেশ ছাড়ার বহু মাস পর যখন দিওউফ ক্যানারি দ্বীপে পৌঁছান, তখনই তার মাকে জানান তিনি কোথায় আছেন।

ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিনি বলেন, "দীর্ঘ নয় মাস পর আমি মায়ের সাথে কথা বলতে পারি ও তাকে জানাই যে আমি স্পেনে নিরাপদে আছি। আমার এক বন্ধু আমায় জানায় যে, এতদিন ধরে আমার মায়ের ধারণা ছিল যে আমি সাগরে মারা গেছি।"

দিওউফ সফল হলেও তার সাথে যাত্রা করা অনেকেরই সেই সৌভাগ্য হয়নি। মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রকল্পের ধারণা, সাগরে প্রতিটি শনাক্ত হওয়া মৃত্যুর পেছনে রয়েছে অন্তত আরো পনেরো থেকে বিশজন নিখোঁজ, যাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এমবায়ে বাবাকার দিওউফ, সেনেগাল থেকে এসেছেন ক্যানারি দ্বীপে। | ছবি: এপি, পিকচার অ্যালায়েন্স
এমবায়ে বাবাকার দিওউফ, সেনেগাল থেকে এসেছেন ক্যানারি দ্বীপে। | ছবি: এপি, পিকচার অ্যালায়েন্স

নিখোঁজের প্রভাব নারীর ওপর বেশি

হারিয়ে যাওয়া বা মৃত অভিবাসনপ্রত্যাশীর পরিবারের সকল সদস্যের ওপর প্রভাব পড়লেও, সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন পরিবারের নারীরা, জানাচ্ছে আইওএম।

অনেক ক্ষেত্রে স্বজন মারা গেছেন তা প্রমাণ করতে না পারার ফলে নারীদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। শুধু তাই নয়, দালালদের ঋণ শোধ করবার দায় এসে পড়ে পরিবারের নারীদের ওপরেই, জানাচ্ছেন আইওএমের মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রকল্পের গবেষকরা।

আটলান্টিক থেকে ক্যারিবীয় সাগরে

এমনও দেখা গেছে যেখানে অতলান্ত মহাসাগরে নামা নৌকা স্পেনে নোঙর ফেলার বদলে পথভ্রষ্ট হয়ে এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় সাগরে। ত্রিনিদাদ ও টোবাগো পুলিশের কমিশনার উইলিয়াম নার্স সম্প্রতি গার্ডিয়ান পত্রিকাকে জানান, এ বছরের মে মাসে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, কীভাবে একটি নৌকা খুঁজে পান তিনি, যা ছিল সারি সারি পচাগলা মৃতদেহে ভরা।

নার্স বলেন, "আমি এরকম দৃশ্য জীবনেও দেখিনি। এতগুলি লাশ একটা নৌকায় কোনো দিন দেখিনি। বেশির ভাগ লাশ নৌকার মাঝখানে ছিল। কয়েকটা নৌকার পেছন দিকেও ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় নৌকার সামনের দিকে থাকা মানুষদের সবার শেষে মৃত্যু হয়েছিল, কারণ, আমি যখন সেই নৌকাটি পাই, তখনও সামনের দিকে থাকা মৃতদেহের মাথার চুল অবশিষ্ট ছিল।"

মৌরিটানিয়ায় নিবন্ধিত এই ডিঙি নৌকাটিতে ১৫টি মৃতদেহ ও কয়েকটি কঙ্কাল। পুলিশ জানায় যে, সাগরে চলার জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন ছিল না সেই নৌকায়। মৃতদেহের কাছ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে এক হাজার সুইস ফ্রাঙ্ক, ৫০ ইউরো ও কয়েকটি মোবাইল ফোন।

ময়না তদন্ত করে জানা যায় যে, উদ্ধার হওয়া কঙ্কালগুলি আসলে কয়েকজন আফ্রিকান পুরুষের। অন্য মরদেহগুলোর কয়েকটি থেকে আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে বলে নার্স ও তার দল আশাবাদী যে তাদের হয়ত শনাক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগকে চিহ্নিত করার কোনো উপায় না থাকায় তাদের বর্তমান গন্তব্য পোর্ট অফ স্পেন শহরের মর্গ।

এই নৌকাটি আবিষ্কৃত হবার ছয় সপ্তাহ পরেই আবার আরেকটি নৌকা এসে পৌঁছায় ক্যারিবীয় সাগরের তীরবর্তী শহর তুর্ক্স ও কাইকোসে। সেখানেও ছিল ১৫টি মৃতদেহ।

মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা

দিওউফ জানান, ২০০৩ সালে তার যাত্রার সময় মৃতদেহে ভরা একটি নৌকার পাশ দিয়ে গিয়েছিল তার নৌকাও। তিনি বলেন, "এই নৌকাটি আমাদের কিছু দিন আগেই টেনেরিফের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল। এই দৃশ্য দেখে আমরা অনেক কিছু ভাবছিলাম। হয়ত আগে রওয়ানা দিলে আমাদেরও অবস্থা এমন হতো। যেহেতু আমরা জানতাম না আমাদের সাথে ঠিক কী হবে, আমরা প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম।"

যদিও নিখোঁজ হওয়া মানুষের হিসাব করা অত্যন্ত কঠিন, আইওএমের এক গবেষকের মতে, সাগরপথে ইউরোপ পাড়ি দেওয়া চার বা পাঁচজনের মধ্যে একজন অন্তত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যান।

অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এই বিপদ সম্বন্ধে অবগত থাকা সত্ত্বেও উন্নত জীবনের আশায় ও পরিবারকে সচ্ছল জীবন দিতে গিয়ে এই ঝুঁকি নেন।

যে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সফলভাবে ইউরোপে পৌঁছাতে পারেন, তাদের যুদ্ধ সেখানেই শেষ হয় না। সঠিক মর্যাদা প্রাপ্তি, প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র পাওয়া ও ভাষা শিক্ষার মতো বেশ কিছু কঠিন ধাপ পেরোতে হয় তাদের।

যুদ্ধ থেকে পালাতে, দারিদ্র্য থেকে পরিবারকে বাঁচাতে ও নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য যে সকল অভিবাসনপ্রত্যাশী পাড়ি দেন ইউরোপের উদ্দেশ্যে, এই ঢল কবে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। নেই সাগরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার পরিষেবাও। ফলে বাড়তে থাকে সাগরে মৃত্যুর হার।

এমা ওয়ালিস/এসএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন