লিথুনিয়ার রুদনিঙ্কাই শিবিরে তিনশ’র বেশি অভিবাসী আছে | ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
লিথুনিয়ার রুদনিঙ্কাই শিবিরে তিনশ’র বেশি অভিবাসী আছে | ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

লিথুয়ানিয়ায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তাড়াহুড়া করে তৈরি শিবিরে মাসখানেকেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছেন কিছু অভিবাসী৷ তারা কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন এবং কোনরকম তথ্য পাচ্ছেন না৷ দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, আলাদা আলাদাভাবে অভিবাসীদের সুরক্ষা বিষয়ক আবেদন যাচাইয়ের মতো সময় এখন তাদের হাতে নেই৷

ধুলামাখা অসমতল রাস্তার শেষ প্রাপ্তে অবস্থিত রুদনিঙ্কাই শিবিরটি দেখলে মনে হবে জায়গা পেতে জঙ্গলের সঙ্গে রীতিমত লড়াই চলছে৷ শিবির এবং সেটির আশেপাশের এলাকা গাছপালায় ভরা৷ এটি আগে লিথুনিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল৷ শিবিরটির চারপাশে বেড়া রয়েছে৷ আর বেশ কয়েকটি পুলিশ ভ্যান সেটি পাহারা দিচ্ছে৷ শুধু তাই নয়, একটি ড্রোনও ব্যবহার করছে পুলিশ, যেটি সবসময় অস্বস্তিকর শব্দ করে৷  

যদিও ভিলনিয়ুস শহর থেকে শিবিরটির দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার, তারপরও সেখানে গেলে মনে হবে সেটি সবকিছু থেকেই অনেক দূরে রয়েছে৷ সবুজ বনের মধ্যে অবস্থিত এই শিবিরে বসবাসরত অভিবাসীরা মনে করেন তাদের শুধু লুকিয়েই রাখা হয়নি, তাদের কথা ভুলেও গেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ৷ 

‘‘তারা আমাদের বিষয়ে কী বলছে? আমাদের কী হবে?’’ বেড়ার ফাকা দিয়ে আমাদের প্রশ্ন করেন ৩৩ বছর বয়সি ইরাকি নাগরিক সাফা৷ 

রুদনিঙ্কাই শিবির দুই স্তরের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ সাংবাদিকরা শুধুমাত্র প্রথম বেড়া অতিক্রম করে যেতে পারেন৷ দ্বিতীয় বেড়ার ভেতরে অভিবাসীরা যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই সাংবাদিকদের৷ 

‘‘সবাই আমাদের প্রশ্ন করে, কিন্তু কেউ আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয় না,’’ বলেন সাফা৷ শিবিরটিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে তাকে৷ লিথুনিয়ায় অভিবাসীরা আসার পর প্রথম ছয়মাস তাদের বিভিন্ন শিবিরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে৷ গত ১৩ জুলাই এক নতুন আইন পাস করার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে৷  

বাগদাদ থেকে মিনস্ক-এ ফ্লাইট বৃদ্ধি

এবছর লিথুনিয়ায় আসা বাকি ২,৮০০ ইরাকির মতো তরুণ এই যন্ত্র প্রকৌশলীও বাগদাদে অবস্থানকালে বেলারুশ বা লিথুনিয়া সম্পর্কে কিছুই জানতেন না৷ ইরাকের রাজধানীতে যখন সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে এমন খবর পৌঁছায়, তখন তিনি দ্রুত মিনস্ক-এর একটি টিকিট কেটে বিমানে উঠে পড়েন৷ এরপর মিনস্ক থেকে ট্যাক্সিতে করে লিথুনিয়ার সীমান্তে আসেন এবং বাকি পথ পায়ে হেঁটে শেষ করেন৷ লিথুনিয়ার সীমান্ত রক্ষীরা তখন তাকে গ্রেপ্তার করে রুদনিঙ্কাই নিয়ে যায়৷   

গ্রীষ্মের শুরুতে বাগদাদ এবং মিনস্ক-এর মধ্যে উড়ালের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হলে ইরাক থেকে আসা অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়৷ তখন দুই শহরের মধ্যে সপ্তাহে চারটি উড়াল চালু করা হয়৷ আর মিনস্ক-এ পৌঁছানোর পর ইরাকিদের পর্যটক ভিসা দেয়া হয় যা নিয়ে তারা সীমান্ত অবধি যেতে পারতেন৷ 

তবে, ছয় আগস্ট ইউরোপের চাপের মুখে বেলারুশের সঙ্গে বিমান চলাচল সাময়িক বন্ধ করে দেয় ইরাক৷ পাশাপাশি ইরাকিদের ফেরত পাঠানোও চলছে৷  

যেসব অভিবাসী মনে করেছিল, কিছুদিনের মধ্যেই তারা পশ্চিম ইউরোপে পৌঁছাতে পারবে, তাদের অধিকাংশই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন৷ 

সাফা (বামে) এবং কাদিম (হ্যাট পরিহিত) এক সপ্তাহের বেশি ধরে লিথুনিয়ার একটি শিবিরে আটকে আছেন  | ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
সাফা (বামে) এবং কাদিম (হ্যাট পরিহিত) এক সপ্তাহের বেশি ধরে লিথুনিয়ার একটি শিবিরে আটকে আছেন | ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

রুদনিঙ্কাইয়ের অবস্থা আরো শোচনীয় কেননা সেখানে বিদ্যুৎ সুবিধা খুবই সীমিত৷ ফলে অভিবাসীদের পক্ষে তাদের মোবাইল ফোন চার্জ দেয়াও এক কঠিন ব্যাপার৷ এতে করে সেখানকার বাসিন্দারা পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় আরো বেশি উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন৷ 

বিতাড়নের আতঙ্ক 

ভিলনিয়ুস থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের শহর ভিডেনিআইয়ে অবশ্য সহজেই বিদ্যুৎ পাওয়া যায়৷ সেখানে একটি বিদ্যালয় ভবনে ১৪৬ জনের মতো অভিবাসীকে রাখা হয়েছে৷ তারা সবাই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন৷ নারীদেরকে নীচ তলায় এবং পুরুষদের প্রথম তলায় রাখা হয়েছে৷ প্রত্যেক অভিবাসীর একটি করে বিছানা ও স্লিপিং ব্যাগ রয়েছে৷

ভিডেনআইয়ে অবস্থানরত অভিবাসীদের অবস্থা রুদনিঙ্কাইয়ের চেয়ে ভালো হলেও উদ্বেগ প্রায় একইরকম৷ তাদেরও একটাই প্রশ্ন, ‘‘আমাদের সম্পর্কে বাইরে তারা কী বলছে?’’ যেকোনো সময় ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে বলে একধরনের আতঙ্ক কাজ করছে তাদের মধ্যে৷  

লিথুয়ানিয়ার উপস্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আর্নল্ডাস আব্রামাবিশিয়াস ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেছেন, ‘‘যাদের সুরক্ষা দরকার তাদের সবাই দেশটিতে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারবেন৷ এবং প্রতিটি আবেদনই আলাদাভাবে যাচাই করা হবে৷’’

তবে, মাত্র ৩০ লাখ বাসিন্দার দেশটির পক্ষে ৪,১০০-র বেশি আশ্রয়ের আবেদন যাচাইবাছাই করা পরিকাঠামোগত দিক থেকে বেশ কঠিন৷ দেশটিতে ২০১৯ সালে মাত্র ৩৭ জন আর ২০২০ সালে মাত্র ৭৪ জন আশ্রয়ের জন্য এসেছিলেন৷ সেই তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা৷

 

অন্যান্য প্রতিবেদন