লিথুনিয়ায় আটকে পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা
লিথুনিয়ায় আটকে পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীরা

ইউরোপে পাড়ি জমানোর লোভে পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে লিথুয়ানিয়ায় আটকে আছেন ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের শত শত শরণার্থী৷ সেখানে তাদের দুদর্দশার চিত্র তুলে ধরেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক আব্বাস আল-খাশাইলি ও হামযা আল-শাওয়াবকেহ৷

লিথুনিয়ার রাজধানী ভিলনিউস থেকে দেশটির রুডনিনকাইয়ের শরণার্থী শিবিরে যেতে ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগে৷ দূরত্ব খুব বেশি না হলেও যাত্রাটি অত সহজ ছিল না৷ বারবার পথচারীদের কাছে জানতে চেয়ে অবশেষে জঙ্গলের পাশে ক্যাম্পের কাছে আমাদের গাড়িটি পার্ক করলাম৷ পৌঁছানোর পরপরই সেখানকার নিরাপত্তারক্ষীরা আমাদের পরিচয় জানতে চাইলো৷ সুবিধার বিষয় ছিল যে আমরা দুই সাংবাদিকই মধ্যপ্রাচ্যের৷ এ কারণে এখানকার শরণার্থীদের সাথে আমাদের চেহারার খুব বেশি পার্থক্য নেই৷ 

যাই হোক, নিরাপত্তারক্ষীদেরকে আমাদের পরিচয় জানালাম৷ বললাম, আমরা এখানে শরণার্থীদের অবস্থা নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি করতে এসেছি৷ আমাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নিরাপত্তারক্ষীরা জানালেন, ক্যাম্পে প্রবেশ করতে হলে লিথুয়ানিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে৷ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি আমরা পেলাম, কিন্তু এর জন্য ক্যাম্পের সামনে আমাদেরকে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে৷ আর তারপর ধীরে ধীরে আমরা স্টিলের বেড়া দিয়ে ঘেরা শিবিরে প্রবেশ করলাম৷

ময়লা কাপড় আর মলিন চেহারা 

ক্যাম্পের ভেতরে কিছু ক্যারাভান আর তাঁবু দেখতে পেলাম৷ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম এগুলো৷ কারণ, ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই আমাদের৷ আমাদের দেখে শরণার্থীদের অনেকেই এগিয়ে এলেন৷ চেহারা দেখে বুঝা যায় যে, তাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন৷ আছেন আফ্রিকার থেকে আসা কেউ কেউও৷ বেশির ভাগই পুরুষ৷ বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হবে বলে মনে হলো৷ পরনের ময়লা পোশাকে দুর্দশার চিহ্ন স্পষ্ট৷ আর চেহারায় ক্লান্তির ছাপ বলছে যে, তাদের শরীর আর সইছে না৷

এ ক্যাম্পটির শরণার্থীদের অনেকেই ইরাক থেকে এসেছেন৷ শুনতে পেলাম, জঙ্গলের ক্যাম্পে বসে তাদের কেউ কেউ ইরাক সরকারের দুর্নীতির বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছেন৷ ইরাক থেকে আসা এ তরুণদের বেশিরভাগই ২০১৯ সালে সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল৷ 

লিথুনিয়ার রুডনিনকাই ক্যাম্পে আটকে পড়া শরণার্থীরা
লিথুনিয়ার রুডনিনকাই ক্যাম্পে আটকে পড়া শরণার্থীরা

ধৈর্য্যের পরীক্ষা

ইরাকের কারবালা শহর থেকে এসেছেন তরুণ শরণার্থী আহমেদ৷ সারা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন৷ বেদনায় ক্লিষ্ট চেহারায় জানালেন যে, ছয় বছর আগে বাগদাদ শহরে গাড়ি বোমায় আহত হন তিনি৷ তবে ২১ বছরের আবদুল্লাহর সমস্যাটা একটু অন্যরকম৷ ছোট বেলা থেকেই তার শরীরে চর্মরোগ রয়েছে৷ 

এমন নানা সমস্যা নিয়ে শত শত অভিবাসী এখানে অপেক্ষা করছে৷ তারা ইউরোপে থাকতে চান৷ নিজ দেশের নির্যাতনের আর অসহায়ত্বের কাছে আর ফিরতে চান না৷ 

কিন্তু ইউরোপ তাদের জায়গা দিতে গিয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করছে৷ আর ছোট্ট দেশ লিথুয়ানিয়া ইতিমধ্যে শত শত আবেদন গ্রহণ করেছে৷ 

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরনোলডাস আব্রোমাভিসিউস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ক্যাম্পের শরণার্থীদের এমন দুর্দশার বিষয়ে আমরা অবগত আছি৷’’ তবে এমন পরিস্থিতির জন্য তিনি বেলারুশের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে দায়ী করেন৷ 

লিথুনিয়ার সীমান্তবর্তী ইউরোপের দেশ বেলারুশ৷ সম্প্রতি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অধিকাংশই বেলারুশ হয়ে লিথুয়ানিয়ায় প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে৷ 

অপ্রস্তুত লিথুয়ানিয়া

একটি ফেসবুক পেজ লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইউরোপে প্রবশের জন্য কতেটা মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ বেলারুশ হয়ে কীভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা যায় এমন নাম দিয়ে ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হয়৷ খোলার কয়েকদিনের মাথায় হাজার হাজার মানুষ ইউরোপে অভিবাসনের তথ্য পাওয়ার আশায় এ পেজে যোগদান করে৷ বর্তমানে পেজটি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই৷ কীভাবে যাত্রা করতে হবে, কোথা থেকে টিকেট কেটে বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে পৌঁছানো যাবে এসব তথ্য পাওয়া যেতো সেখানে৷

লিথুয়ানিয়ার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ভিটিস ইউরকোনিস দাবি করেন, ইরাকসহ অন্যান্য দেশ থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে প্রবেশে সহায়তা করছে বেলারুশ৷ কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা অভিজ্ঞতা কোনোটিই লিথুনিয়ার নেই, বলেন তিনি৷ 

সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় লিথুনিয়ায় আটকে আছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা
সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় লিথুনিয়ায় আটকে আছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা

বেলারুশের চলমান পরিস্থিতির কারণে অনেক রাজনৈতিক কর্মীই লিথুয়ানিয়ায় আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানান তিনি৷ 

এ রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের দাবি, বেলারুশ সরকার নিজ দেশের জনগণকে লিথুয়ানিয়ায় প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পাড়ি দিতে দিচ্ছে৷ 

মুখোশ পরে লাঠি হামলা

লিথুয়ানিয়ায় আটকে পড়া বেশ কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশীকে ইতিমধ্যে ফেরত নিয়েছে বাগদাদ৷ যাদেরকে ফেরত নেওয়া হয়েছে তারা নিঃস্ব আর দেনার দায়ে ভারাক্রান্ত৷ কারণ, জমানো টাকার পুরোটাই তারা লিথুয়ানিয়া পর্যন্ত আসতে গিয়ে খরচ করে ফেলেছেন৷ 

বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে আটকে থাকা একজন ইরাকি শরণার্থী জানান, তিনি বেশ কয়েকবার পোল্যান্ড সীমান্ত দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন৷ ব্যর্থ হয়ে তিনি এখন বেলারুশ হয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছেন৷   

সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টার সময় মুখোশ পরা লোকেরা তার ও তার সাথের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উপর হামলা চালায়৷ ‘‘ইলেকট্রিকের লাঠি দিয়ে তারা আমাদের উপর হামলা চালিয়েছে৷ আমাদের টেনে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে মারতে থাকে৷’’

লিথুয়ানিয়ার এ ক্যাম্পটিতে থাকা ইরাকের আরেক শরণার্থী জানান যে, ইউরোপের দেশগুলো তাদেরকে ‘রাজনৈতিক ফুটবল’ বানিয়েছে৷ এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাঠাচ্ছে৷ 

তবে এর কোনো কিছুই ইউরোপে বসবাস করার যে চেষ্টাকে তা থামাতে পারবে না, বলেন তিনি৷ তিনি ভাবছেন কীভাবে বৈধ পথে সেখানে (ইউরোপে) যাওয়া যায়৷

আরআর/এসিবি      

 

অন্যান্য প্রতিবেদন