শামসেদ্দিন মারজৌগকে জার্জিসের অভিবাসীদের কবরস্থানে দেখা যাচ্ছে। যেখানে বেওয়ারিশ লাশদের দাফন করা হয়। শিশুদের কবরগুলোকে একটি করে খেলনার পুতুল দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। ছবিঃ মেহেদি শেবিল
শামসেদ্দিন মারজৌগকে জার্জিসের অভিবাসীদের কবরস্থানে দেখা যাচ্ছে। যেখানে বেওয়ারিশ লাশদের দাফন করা হয়। শিশুদের কবরগুলোকে একটি করে খেলনার পুতুল দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছে। ছবিঃ মেহেদি শেবিল

টিউনিশিয়ার জারজিস বন্দর এবং ইটালি উপকূলের মধ্যে অবৈধ পারাপার ২০২১ সালে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অভিবাসীদের অধিকার সংস্থার সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত এনজিও কর্মী শামসেদ্দিন মারজৌগ এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তার স্ত্রী তাকে কিছু না জানিয়ে দুই নাতি-নাতনিদের সাথে অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

টিউনিশিয়ার অভিবাসী অধিকার কর্মী শামসেদ্দিন মারজৌগ জানান, দক্ষিণ টিউনিশিয়ার জার্জিসে বসবাসরতদের প্রায়ই তাদের প্রিয়জনদের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখতে হয়। তিনি নিজেই এরকম ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছেন, একদিন তিনি জানতে পারেন ১৪ আগস্ট তার স্ত্রী এবং তার দুই নাতি-নাতনি ইটালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন।

শামসেদ্দিন ইনফোমাইগ্রেন্টস কে জানান, "আমি পুরোপুরি বিস্মিত ছিলাম! কারণ যাত্রার আগে বাড়িতে কোন ধরণের প্রস্তুতির চিহ্ন আমি দেখিনি। আমার স্ত্রী খুব ভালো করেই জানতেন আমি এর বিরোধিতা করব।"

"সমুদ্র ছাড়া আমার আর কোনো বিকল্প নেই"

দীর্ঘ দিন ধরে অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা শামসেদ্দিন একজন অবসরপ্রাপ্ত মৎস্যজীবী। তিনি জানান, “হঠাৎ গভীর রাতে আমার স্ত্রীর আমাকে একটি শেষ বার্তা পাঠায়। যেখানে সে জানায়, নৌকায় থাকা সবাইকে ফোন বন্ধ করে দিতে হচ্ছে যেন সমুদ্র পার হতে গিয়ে কেউ ধরা না পড়ে।”

তিনি তার স্ত্রীর রেখে যাওয়া হাতে লেখা চিরকুটটির কয়েকটি সংক্ষিপ্ত লাইন বারবার পড়ছিলেন, "মাফ করবেন, আমি ইটালিতে যাচ্ছি। আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন। সমুদ্র ছাড়া আমার আর কোনো বিকল্প নে।”

তিনি, তার স্ত্রী মৌফিদা এবং তাদের দুই নাতি-নাতনি - একটি আট বছরের ছেলে এবং ছয় বছর বয়সি মেয়ের - অবস্থা কল্পনা করছিলেন। ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে একটি ছোট্ট গোপন নৌকায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে তাদের রাত কাটানোর কথা চিন্তা করতেই তার পাকস্থলী উল্টে যাবার উপক্রম হচ্ছিল। 

এরকম ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্র পারাপার কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তা শামসেদ্দিনের চেয়ে আর কারো ভালো জানার কথা না। তিনি জারজিসে "অজানা ব্যক্তিদের কবরস্থান" তৈরি করার জন্য সবার কাছে পরিচিত। এটি এমন একটি ভূমি যেখানে সাগরে ডুবে যাওয়া বেওয়ারিশ অভিবাসীদের কবর দেওয়া হয়। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে লিবিয়া ছেড়ে আসা বিপুল সংখ্যক সাব-সাহারান আফ্রিকানসহ ডুবে যাওয়া প্রায় ৪০০ অভিবাসীদের এখানে দাফন করা হয়েছে।

সৌভাগ্যবশত, যে নৌকায় তার স্ত্রী ও নাতি -নাতনিরা ছিলেন, সেই নৌকাটি ভালোভাবে সমুদ্র পারি দিতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীরা তারা প্যারিসের উত্তরে একটি শহরে পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগ দেয়। শামসেদ্দিন মারজৌগ জানতে পেরেছিলেন, কিছুদিন আগে ফ্রান্স থেকে জারজিসে এক ঝটিকা সফরে আসা তার এক আত্মীয় এই যাত্রার ব্যবস্থা করেন। 

শামসেদ্দিন ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, “আমার ঐ আত্মীয় জানত আমার সাথে পাচারকারীদের যোগাযোগ আছে এবং আমি যদি জানতে পারতাম, তাহলে যে কোনো মূল্যে তাদের আটকাতাম।" 

এই জাহাজের অধিকাংশ যাত্রী ছিলেন নারী ও শিশু। দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে "পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা" এর আবেদনের কোনো জবাব না আসায় অনেকগুলো পরিবারকে নিয়ে এই গোপন সমুদ্র পারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

নাতি নাতনিদের ঘরে শামসেদ্দিন। তাদের রেখা যাওয়া সব কাপড়চোপড়  একটি অভিবাসী সংস্থায় দিয়ে দিতে গুছিয়ে রাখছেন। ছবিঃ মেহেদি শেবিল
নাতি নাতনিদের ঘরে শামসেদ্দিন। তাদের রেখা যাওয়া সব কাপড়চোপড় একটি অভিবাসী সংস্থায় দিয়ে দিতে গুছিয়ে রাখছেন। ছবিঃ মেহেদি শেবিল


শামসেদ্দিন মারজৌগ উল্লেখ করেন, তার মেয়ে আইনী জটিলতার কারণে কাগজপত্র ঠিক না থাকায় দুই নাতি-নাতনিকে বৈধভাবে ফ্রান্সে নিতে পারছিল না ।

প্রতি পারাপারে দেড় হাজার ইউরো

এই প্রাক্তন মৎস্যজীবী ইউরোপে প্রবেশের জন্য টিউনিশিয়ানদের ব্যবহৃত বিভিন্ন মাধ্যমের একটি তালিকা করেছেন। প্রথমত, স্বাভাবিক পন্থায় একটি ভিসার আবেদন এবং তারপর একটি বসবাসের অনুমতির মাধ্যমে ইউরোপে যাওয়া। তবে এটি এক প্রকার রাজকীয় রাস্তা, যা প্রায় অসম্ভব। 

দ্বিতীয় পথটি একটি আধা-স্বীকৃত রাস্তা, যেটি হচ্ছে শেঙ্গেন টুরিস্ট ভিসার জন্য মধ্যস্থতাকারীদের ১৭,০০০ থেকে ২০,০০ দিনার (৫,১৫০ - ৬,০০০ ইউরো) অর্থ দেওয়া হয়। যার সাহায্যে বৈধভাবে ইউরোপে একটি অস্থায়ী ভিসায় ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয়। এভাবেই তার মেয়ে ফ্রান্সে এসেছিল। সমস্যা হচ্ছে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে একজন অভিবাসী আইনত অবৈধ হয়ে যায়।

টিউনিশিয়ার উপকূল রক্ষী বাহিনীর হাতে আটক গোপন নৌকাগুলিকে টুকরো করে ভেঙে দেয়া হয়  যেন পাচারকারীরা সেগুলো আর ব্যবহার করতে না পারে । জার্জিস বন্দরের কাছে এরকম কয়েকটি ভাঙ্গা নৌকার অংশ দেখা যাচ্ছে। ছবিঃ মেহেদি শেবিল।
টিউনিশিয়ার উপকূল রক্ষী বাহিনীর হাতে আটক গোপন নৌকাগুলিকে টুকরো করে ভেঙে দেয়া হয় যেন পাচারকারীরা সেগুলো আর ব্যবহার করতে না পারে । জার্জিস বন্দরের কাছে এরকম কয়েকটি ভাঙ্গা নৌকার অংশ দেখা যাচ্ছে। ছবিঃ মেহেদি শেবিল।


তৃতীয় সম্ভাবনাটি হচ্ছে, জার্জিস উপকূল থেকে গোপন নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইটালি পৌছানো। শামসেদ্দিনের মতে, বর্তমানে একজন ব্যক্তি সমুদ্র পারাপারে "মাত্র" ৫,০০০ দিনার (১,৫০০ ইউরো) দালালদের দিতে হয়।”

তিনি আরও জানান, "আমরা এর আগে রাজধানী তিউনিস ভ্রমণ করে নাতি-নাতনিদের ভিসার আবেদনের জন্য ২,০০০ দিনার (৬০০ ইউরো) খরচ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের অনুরোধ তিনবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।"

টিউনিশিয়ান ফোরাম অফ ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রাইটস (এফডিটিইএস)-এর সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুসারে, টিউনিশিয়া থেকে ইটালিতে অবৈধ সমুদ্র যাত্রার সংখ্যা ২০২১ সালে বেড়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে দশ হাজারেরও বেশি অভিবাসী ইটালীয় উপকূলে পৌঁছেছে।

শামসেদ্দিন মারজৌগ এখন তার বাড়িতে একা থাকেন, বেশ কয়েকটি বিড়াল তাকে সঙ্গ দেয়। তিনি আশা করেন, ফ্রান্সে কয়েক মাস কাটানোর পর তার স্ত্রী পুনরায় জার্জিসে ফিরে আসবেন।

তাদের চলে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পরে তিনি অনুধাবন করে বলেন, "আমি এতটা স্বার্থপর হতে পারি না এবং তাদের চলে যাওয়ার জন্য আমি তাদের দায়ী করি না। আসল সমস্যা ছিল বারবার আবেদন করেও তারা ভিসা পায়নি।"


টিউনিশিয়া থেকে ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশেষ প্রতিনিধি মেহেদি শেবিল।


এমএইউ/এসএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন