বসনিয়ার লিপা ক্যাম্পে এক অভিবাসনপ্রত্যাশী | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এপি
বসনিয়ার লিপা ক্যাম্পে এক অভিবাসনপ্রত্যাশী | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এপি

ইউরোপিয়ান কোর্ট অফ অডিটরস (ইসিএ) জানাচ্ছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বৈধ কাগজহীন অভিবাসীদের ফেরানোর প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পাচ্ছে না। এবিষয়ে ইইউ-কে সতর্ক করেছে তারা।

২০০০ সালের পর থেকেই মোট ২০টি রাষ্ট্রের সাথে তাদের দেশের নাগরিকদের, যারা ইউরোপে বৈধ কাগজ ছাড়া বসবাস করছেন, ফেরাতে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ইইউ। পাকিস্তান, গাম্বিয়া, ইথিওপিয়া, টিউনিশিয়া, তুরস্ক, আফগানিস্তান, আইভরি কোস্ট, নাইজেরিয়া, গিনি ও বাংলাদেশসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের যে সকল নাগরিকের ইউরোপে আশ্রয় আবেদন ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ফেরাতেই এমন চুক্তি।

ইসিএ জানাচ্ছে, প্রতি বছরই আনুমানিক পাঁচ লাখ এমন অভিবাসীদের দেশে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইইউ'র নীতি ও অর্থ ব্যবস্থাপনা যাচাই করে এই সংস্থাটি।

কেন ফেরানো হচ্ছে না এই অভিবাসীদের?

২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইইউ'র প্রত্যর্পণ নীতিকে পর্যবেক্ষণ করে ইসিএ। খতিয়ে দেখে যে দশটি দেশের প্রত্যর্পণ নিয়ে ইইউ'র গাফিলতি রয়েছে, সেই পরিস্থিতিকে। এদের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রতি তিনজন প্রত্যর্পণের নির্দেশপ্রাপ্ত অভিবাসীর মধ্যে মাত্র একজনই দেশে ফিরে যান। শুধু তাই নয়, অভিবাসীর দেশ যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশ হয়, সেক্ষেত্রে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রতি পাঁচজনে একজন।

ইসিএ'র প্রতিবেদন জানাচ্ছে, প্রত্যর্পণের নিম্ন হারের দায় বর্তাচ্ছে ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলির মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের অভাবের ওপর। তাদের মধ্য মতের অমিল হয়না অনেক বিষয়েই। ইইউ'র তথ্য কেন্দ্র ইউরোস্ট্যাট প্রত্যর্পণের অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের সংখ্যাকে দাঁড় করিয়েছে পাঁচ লাখে। অন্যদিকে, ফ্রন্টেক্স বলছে এই সংখ্যা অনেকটাই কম।

সম্প্রতি ইউরোপিয়ান কমিশনের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্রের সাথে কথা বলে ইনফোমাইগ্রেন্টস। তারা জানায় যে বৈধ কাগজহীন অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর দায় আসলে যে রাষ্ট্রে অভিবাসী বাস করেন, সেই কর্তৃপক্ষের ওপর। শুধু তাই নয়, দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আরো সাহায্য করার কথা বলা আছে ইইউ নীতিতে, যেমন রি-ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতির আওতায় ভাষা শিক্ষা, সামাজিক, আইনি ও আর্থিক সাহায্য দান ও নতুন করে কর্মসংস্থানের খোঁজ, এই সব বিষয়েই প্রাথমিক সাহায্য করার দায় নীতিগতভাবে ইইউ'র সদস্য রাষ্ট্রের, যা করতে মাথাপিছু এক থেকে দুইহাজার ইউরো খরচ হয়।

কিন্তু সব রাষ্ট্রের মধ্যে এবিষয়ে একীভূত নিয়ম না থাকায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলার।

ইসিএ'র প্রস্তাব, এই নীতিকে বদলাতে হবে এবং অবস্থা অনুযায়ী পাল্টে ফেলার ক্ষমতা রাখতে হবে। পাশাপাশি, যে দেশগুলি তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে ভালো ভূমিকা রাখবে, তাদের জন্য ইইউ'র পক্ষে কিছু ইনসেন্টিভ বা প্রণোদনা বা সুবিধার ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যর্পণের বিষয়টি?

ইউরোপিয়ান কমিশনের পক্ষে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলা হয় যে অনিয়মিত অভিবাসন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য যতটা ক্ষতিকর, তার চেয়ে ঢের বেশি তা বিপজ্জনক এই অভিবাসীদের জন্য। এই পন্থার সাথে যুক্ত রয়েছে মানবপাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক ও অস্ত্রের কারবারসহ নানা বিপদের ঝুঁকি। পাশাপাশি, বিপজ্জনক সব যাত্রাপথে মৃত্যুর হারও বেড়েছে আগের চেয়ে।

ইসিএ'র প্রস্তাব, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে আরো জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে হবে এই বার্তা যে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে আসলে দেশে ফিরে যেতে হবেই। কিন্তু ইসিএ'র সাম্প্রতিক গবেষণাই বলছে যে ইউরোপে চালু বর্তমান প্রক্রিয়া অবৈধ অভিবাসনের পক্ষে উৎসাহিত করছে মানুষকে। সঠিক গতিতে বৈধ কাগজহীন অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে না পারা এখানে ভূমিকা রাখছে। এমনটাই মনে করেন ইসিএ'র গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনটির লেখক লিও ব্রিংক্যাট।

তিনি বলেন, "মানুষকে নিরস্ত করার বদলে এই পদ্ধতি আরো উৎসাহ দিচ্ছে অবৈধ অভিবাসনের পক্ষে। এতদিনে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বুঝে গেছে যে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো এত সোজা নয়, তাই তারা আরো বেশি করে আসছে।"

উল্লেখ্য, ইউরোপিয়ান কমিশনের জানানো তথ্য বলছে যে ২০১৯ সালে নয় হাজার ৫৭৫জন বাংলাদেশি নাগরিককে ইইউ ছাড়তে বলা হলে মোট ৮২০ জন দেশে ফিরে যান। ২০২০ সালে নয় হাজার ৪০০ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেবার পর দেশে যান ৫১৫ জন। কমিশনের মতে, বাকিরা সবাই যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভেতরেই আছেন, তা হলফ করে বলা যাচ্ছেনা। কেউ কেউ হয়তো স্বেচ্ছায় অনিবন্ধিতভাবেই দেশে ফিরে গেছেন, বলে ধারণা তাদের।

তবে এই সংখ্যা কোনোমতেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বৈধ কাগজহীন বাংলাদেশিদের মোট সংখ্যার ধারেকাছে নেই, বলে জানায় তারা। এই সংখ্যা শুধু তাদেরই গোনে, যারা কোনোভাবে কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছেন ও চিহ্নিত হয়েছেন।

এসএস/এআই (এএফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন