কৃষিখাতে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের একটি ফাইল ছবি। ফটো ক্রেডিটঃ আনসা
কৃষিখাতে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের একটি ফাইল ছবি। ফটো ক্রেডিটঃ আনসা

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের ভিসায় আসতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিরা বহু ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাদের মূল্যবান সময়, অর্থ এমনকি জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়ে থাকেন। কাজের ভিসায় আসার চমকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ার আগে যেসব ব্যাপারে জানা থাকা দরকার, সেগুলো নিয়ে থাকছে ইনফোমাইগ্রেন্টসের রোমানিয়া সিরিজের ধারাবাহিক পর্বের শেষ পর্ব।

গত পর্বে আমরা রোমানিয়ায় ওয়ার্ক পারমিটের কোটা এবং বেতন, সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। ওয়ার্ক পারমিট সহ এ জাতীয় ভিসাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে আসার ক্ষেত্রে মানুষ বিভিন্ন এজেন্সির সাহায্য নিয়ে থাকে। এছাড়া অনলাইনে নানান রং-বেরংয়ের বিজ্ঞাপন তো আছেই। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা সাধারণত বিপুল অংকের টাকা দিয়ে থাকে এজেন্সি গুলোকে। রোমানিয়ার ওয়ার্ক পারমিটের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি একটি ভিসার জন্য ৬ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করে থাকেন অভিবাসীরা। 

চটকদার বিজ্ঞাপন থেকে দূরে থাকুন

সাধারন মানুষের মধ্যে একটি প্রবণতা আছে যে তারা টাকার বিনিময়ে এজেন্সির সাথে চুক্তির ভিত্তিতে বিদেশ যেতে চায়। যেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিবাসীদের অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত করে। কারণ এজেন্সিগুলো তাদেরকে আশ্বস্ত করে যে একবার রোমানিয়া গেলে আপনি সহজে ইউরোপের শেঙ্গেন দেশগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন। 

এটি একটি সর্বেব মিথ্যা তথ্য। প্রকৃতপক্ষে আলবেনিয়া, বসনিয়া, রোমানিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশগুলি ইউরোপ মহাদেশের হলেও এসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ইউররোপের ধনী দেশগুলোর মতো তেমন উন্নত নয়।

রোমানিয়ায় না থেকে এসব দেশ থেকে আপনি শেঙ্গেন অঞ্চলে প্রবেশ করতে চাইলে আপনার জীবন পর্যন্ত চলে যেতে পারে। 

বর্তমানে ইউরোপে অবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে চলছে ব্যাপক কার্যক্রম। ইতিমধ্যে গ্রিস, পোল্যান্ড সহ বিভিন্ন দেশ কঠিন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করায় অনেকগুলো অবৈধ অভিবাসনের রুট এখন বন্ধ। 

পাশাপাশি যেকোন দেশে ধরা পড়লে সে দেশের পুলিশের আঙুলের ছাপ নিয়ে থাকে যার ফলে একজন অভিবাসী চাইলেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালিতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে পারে না। কারণ ডাবলিন বিধিমালা অনুযায়ী একজন ব্যক্তির প্রথম আঙুলের ছাপ যেখানে, সে দেশেই তাকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিতে হবে। 

অতীতে ডাবলিন বিধিমালা অতটা শক্তভাবে প্রয়োগ হতো না যার ফলে যে কেউ চাইলেই ভ্রমণ ভিসায় এসে আশ্রয় আবেদন করতে পারত। বর্তমানে সেই সুযোগ নেই বললেই চলে। 

বৈধভাবে আসার পথ 

রোমানিয়ায় থাকা প্রবাসীদের সাথে কথা বলে আমরা প্রথম পর্বে জানিয়েছিলাম সেখানে গড়ে মাসিক বেতন ৫০০ (৫০ হাজার টাকা) ইউরো এবং থাকা ও খাওয়া মালিক বহন করে থাকে। 

সুতরাং ৬-১০ লাখ টাকা দালাল অথবা এজেন্সিকে দিয়ে আসা একজন লোকের জন্য এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে এই বেতনের সাথে আপনার লক্ষ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়াটা বেশ গুরুত্বপূর্ন। 

বাংলাদেশ সরকারের সাথে ইউরোপের কোন দেশের সাথে এখনো পর্যন্ত শ্রমিক প্রেরণে কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না হওয়ায় বেসরকারি উদ্যোগে বিপুল খরচ বাঁচিয়ে রোমানিয়া যাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে নিজে একজন নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়া। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো কাজে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি হন তাহলে আপনি অনলাইনে বিভিন্ন কোম্পানিতে আবেদন করলে তারা আপনাকে নিয়োগ করতে সম্মত হলে নিজেরাই আপনার জন্য ভারতের দিল্লীস্থ রোমানিয়া দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করবে। পরবর্তীতে নিজেই আপনি স্বশরীরে দূতাবাসে গিয়ে আবেদনসহ ভিসা গ্রহণ করতে পারবেন। 

তবে কোনভাবেই কারো সাথে অগ্রিম কোনো অর্থনৈতিক লেনদেন করবেন না। সর্বক্ষেত্রে কোন কোম্পানির ওয়ার্ক পারমিট যাচাইয়ের জন্য আপনি দিল্লিতে রোমানিয়া দূতাবাসের সাথে ইমেইলে যোগাযোগ করতে পারবেন। 

মানব পাচারকারী দালাল চক্র সাধারনত অল্প শিক্ষিত বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা লোকদের টার্গেট করে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। 

বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে আমরা চাইলেই খুব সহজে এসব চক্র থেকে দূরে থেকে নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করে বৈধ অভিবাসনের মাধ্যমে নিজের জীবনের ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে অনিয়মিত অভিবাসীদের তকমা থেকে অনেকটা দূরে রাখতে পারি। 

কোন সেক্টরে লোক নেয়া হচ্ছে এবং পূর্বপ্রস্তুতি

রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টসহ বিভিন্ন শহরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে সেখানে অবস্থানরত প্রবাসীরা বেশিরভাগই নির্মাণখাতে কর্মরত। যেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেশ কঠিন কায়িক পরিশ্রমের। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে পরিপূর্ণভাবে আপনাকে ভাবতে হবে আপনি এই কাজ করতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত কিনা। 

নির্মানখাতের পাশাপাশি বিভিন্ন ফ্যাক্টরি এবং হোটেল সেক্টরেও বিভিন্ন পদের কাজের সুযোগ রয়েছে। 

তবে তারা আরও জানিয়েছে, যারা দেশ থেকে বেশ ভালো কারিগরি দক্ষতা যেমন, ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, মেকানিক্যাল, গাড়ি চালনা ইত্যাদি কাজে দক্ষ তাদের ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিতে কাজ পাওয়া এবং বেতন বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 

এক্ষেত্রে নিজে একটি ভালো কোম্পানি খুঁজে পাওয়াটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 

দেশ থেকে আসার আগে প্রত্যেক অভিবাসীর উচিত নূন্যতম ইংরেজি এবং যে দেশে যাবেন সেখানকার ভাষার দক্ষতা অর্জন করা। পাশাপাশি গাড়ি চালনাসহ দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজন এমন খুঁটিনাটি কারিগরি কাজ শিখে আসা। 

আপনি যে কাজে যাবেন সেটি আগে দেশে কখনো করে না থাকলে নিঃসন্দেহে সেটি আপনাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এক্ষেত্রে অনেকেই পালিয়ে গিয়ে পরিবর্তে অবৈধ অভিবাসনের পথ বেছে নেয়। 


বিঃদ্রঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস অভিবাসীদের সর্বাবস্থায় সকল প্রকার অবৈধ এবং অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে সচেতন করে থাকে। কোভিড ১৯ মহামারি পরবর্তী সময়ে রোমানিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ওয়ার্কমিট ভিসা নিয়ে মানব পাচারকারী চক্রগুলো বেশ সক্রিয় থাকায় অভিবাসীদের সতর্ক করতে আমাদের এই তিন পর্বের ধারাবাহিক সিরিজ।



এমএইউ/এসএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন