ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

বিশ্বব্যাংকের একটি নতুন প্রতিবেদন জানাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের ছয়টি অঞ্চলের প্রায় ২২ কোটি মানুষ ক্রমাগত বসবাসের স্থান বদল করতে বাধ্য হবেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে যারা গৃহহীন হবেন, সেইসব মানুষের পাশে সদস্য রাষ্ট্রদের দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের প্রধান।

আফগানিস্তানে ভারী বর্ষণের ফলে ১৬ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। দাবানলের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহহীন হয়েছেন ৭৩ হাজার মানুষ। মাদাগাস্কারে চার বছর বৃষ্টিপাত না হবার ফলে আসন্ন বিশ্বের প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনগত দুর্ভিক্ষ। এই সব দুর্যোগ এখন রুঢ় বাস্তবতা।

দুর্যোগের কারণে ভিটা হারাচ্ছেন মানুষ বিশ্বজুড়ে, ফলে জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের অভিবাসনের, যার মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি।

'মানবাধিকারের পথে প্রধান বাধা'

গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার মিশেল বাশেলে পরিবেশভিত্তিক অভিবাসীদের জন্য নির্দিষ্ট অভিবাসনের পথ খুলে দেওয়ার দাবি করেন।

১৩ সেপ্টেম্বর একটি অনলাইন বিবৃতিতে তিনি বলেন, "দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যের বিপন্নটা সব একসাথে মিলে সংকট সৃষ্টি করেছে। এসব সংকটের ফলে সংঘর্ষ ও চাপ বাড়ে, বাড়ে কাঠামোগত অসাম্য। মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়।"

কমিশনারের মতে এইসব পরিবেশগত সংকট 'মানবাধিকারের প্রশ্নে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় বাধা'। বাংলাদেশের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি তুলে ধরেন বাড়তে থাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রসঙ্গ, যার ফলে দেশটির ১৭ শতাংশ ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু তাই নয়, এশিয়াতে পরিবেশভিত্তিক অভিবাসন যেভাবে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে উঠছে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায়, তাও তুলে ধরেন তিনি।

ইন্টার্নাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটারিং সেন্টারের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে শুধু চীন, ভারত, ফিলিপাইনস ও বাংলাদেশেই ঘটেছে গোটা বিশ্বের ৭০ শতাংশ বাস্তুচ্যুতি বা ডিসপ্লেসমেন্টের ঘটনা।

'বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষুধা'

বাশেলে জানান, ব্রাজিল ও দিক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চলে পরিবেশকর্মীরা অত্যাচারের সম্মুখীন হন ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত্যু হয় তাদের। বাশেলে বলেন যে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি'র পক্ষে একটি নতুন প্রকল্প চালু করবেন তিনি, যার আওতায় পরিবেশোকর্মীদের নিরাপত্তা দেবার বিষ্যটি দেখা হবে।

আসন্ন সপ্তাহগুলিতে জার্মানিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য ৪৭টি রাষ্ট্রের বৈঠক হবে যেখানে আলোচিত হবে একটি নতুন মঞ্চ তৈরির প্রস্তাব। সেই মঞ্চে আলোচিত হবে মানবাধিকার ও পরিবেশের সংযোগ স্থাপনকারী নানা দিক।

প্রতিবেদন বলছে বাড়ন্ত অভিবাসনের কথা

২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের পক্ষে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, "জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে পানীয় জলের সংকট, শস্যের সংকটের ওপর। সাথে বাড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, যা জীবিকাকে উচ্ছেদ করার মাধ্যমে মানব জীবনকে বিপন্ন করবে।"

ইন্টার্নাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটারিং সেন্টার বা আইডিএমসি-র আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে কেবল ইন্দোনেশিয়াতেই ঘটেছে দশ লাখ মানুষের বাস্তুহারা হবার ঘটনা।

গবেষকদের মতে, বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজের দেশের ভেতরেই এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া বা ইন্টার্নাল ডিসপ্লেসমেন্টের শিকার বিশ্বের প্রায় ৮৩ কোটি মানুষ, জানাচ্ছে ইউএনএইচসিআর।

একাধিক কারণে বাস্তুহারা

পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি সহিংসতা বা যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ এসে জুটলে তা আরো কঠিন রূপ ধারণ করে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এমনটা হতে দেখা গেছে।

কিন্তু পরিবেশগত কারণে ঘরহারা ব্যক্তিদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে 'ক্লাইমেট রিফিউজি' শব্দবন্ধটি। কিছু কিছু অঞ্চলে পরিবেশগত কারণে ঘরহারা হয়ে অন্য রাষ্ট্র আশ্রয় প্রার্থনা করা ব্যক্তিদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হয়না। কারণ, ক্লাইমেট রিফিউজি বা জলবায়ু শরণার্থী বা অভিবাসনপ্রত্যাশী বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষায় স্পষ্ট নয়।

বর্তমান বিশ্বে নানা কারণে দেখা দিচ্ছে অভিবাসনের বাড়ন্ত ঢল। কিন্তু জাতিসংঘের মতে, জলবায়ু সংকট এই সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ, যা অন্যান্য নানা সংকটকে আরো প্রকট করে তুলতে পারে।

এসএস/এআই (এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন