গ্রিক পুলিশের এই সাবেক কর্মকর্তা সীমান্তে পুশব্যাকের কথা স্বীকার করেছেন। ছবিসূত্রঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
গ্রিক পুলিশের এই সাবেক কর্মকর্তা সীমান্তে পুশব্যাকের কথা স্বীকার করেছেন। ছবিসূত্রঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস

সীমান্তে পুশব্যাকের ঘটনা প্রতিনয়তই চলছে জানিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এক গ্রিক পুলিশ কর্মকর্তা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘‘তিনি নিজে প্রায় দুই হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে তুরস্কে ফেরত পাঠিয়েছন৷‘‘

ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেওয়া সাক্ষাতকারে নিজের নানা অভিজ্ঞতরা কথা তোলে ধরেন তিনি৷ তার দাবি,ইউরোপের সীমান্ত রক্ষার একমাত্র সমাধান হল পুশব্যাক।

গ্রিক-তুর্কি সীমান্তের মধ্যবর্তী এভ্রোস নদীতে বিশেষ নৌযানের সাহায্যে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে হাজার হাজার অভিবাসীকে তুর্কি উপকূলে ফিরিয়ে দেয়ার কথা জানান এই সাবেক কর্মকর্তা। 

চতবে তিনি জানান, উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাকে এই কাজ করতে হয়েছিল। 

এন ছদ্মনামে গ্রিক পুলিশের এ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাম, পরিচয় গোপন রেখে তুর্কি গ্রিক সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলমান পুশব্যাকের ব্যাপারে ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে সাক্ষ্য দিতে এবং ব্যাখ্যা করতে রাজি হয়েছেন। 

তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে অবস্থিত ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক সীমান্তে্র এভ্রোস নদীতে তিনি অবৈধভাবে শত শত অভিবাসীকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।  

গ্রিক তুর্কি সীমান্তের মধ্যবর্তী এভ্রোস নদী। কোন কাঁটাতারের বেড়া ছাড়ায় এই নদীটি দুই দেশের মাঝখানে প্রাকৃতিক সীমান্ত সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
গ্রিক তুর্কি সীমান্তের মধ্যবর্তী এভ্রোস নদী। কোন কাঁটাতারের বেড়া ছাড়ায় এই নদীটি দুই দেশের মাঝখানে প্রাকৃতিক সীমান্ত সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস


সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে কয়েক বছর আগে অবৈধ মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। 

এন বলেন, “গ্রিক কর্তৃপক্ষ এই পুশব্যাকের সম্পর্কে সম্পূর্ন সচেতন ছিল। আমি আমার উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের আদেশে এই কাজ করেছিলাম।”

তিনি জানান, ‘‘আমার সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমার বিরুদ্ধে বিষেদগার করেছিলেন৷ কারণ আমি তাদের সাথে এসব ব্যাপার নিয়ে দন্দ্বে জড়িয়েছিলাম।’’ 

এন এখন বিশ্বাস করেন, "তিনি তাদেরকে আর কিছুই দেয়ার নেই"। 

এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করে তিনি এখন তার গ্রামে থাকেন। তার নিরাপত্তার সাথে বিভিন্ন অভিযানের তারিখগুলো অস্পষ্ট থাকবে।

‘’৯০ এর দশক থেকে আমি পুশব্যাক করে আসছি। এখানে এটি প্রায়শই করা হয়। সীমান্ত এলাকাগুলো সম্পূর্ন সামরিক নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এখানে এটি তেমন কোন জটিল কাজ নয়। কারণ কেউ আমাদের দেখতে পায় না।’’

প্রথম দিকে, ঠিক কিভাবে আমি অভিযান শুরু করেছিলাম আমার মনে পড়ছে না । তবে আমার দায়িত্ব ছিল এভ্রোস ন্দীর পাশে অবস্থিত একটি সীমান্তবর্তী গ্রামে। আমার সেখানে নিজস্ব একটি ছোট নৌকা ছিল যেটির সাহায্যে চলাফেরা এবং দায়িত্ব পালন করতাম।’’  

"তুরস্ক থেকে অভিবাসীরা সীমান্তে আসার আগে আমার সহকর্মীরা আমাকে নিয়মিত ফোনে জানিয়ে দিত। অভিবাসীরা সাধারণত প্রায় সময় ১০ জনের গ্রুপে জড়ো হতো। আমার ভূমিকা ছিল তাদেরকে আমার নৌকায় করে তুর্কি উপকূলে ফিরিয়ে আনা। প্রায়শই আমাকে রাতের বেলায়ও এসব কাজ করে হতো। তবে এসব পুশব্যাক খুব বেশি দিন স্থায়ী হতো না কারণ অভিবাসীরা আবার ফিরে আসত।’’

"সেনাবাহিনী স্পষ্টতই এটি সম্পর্কে জানত। আমি যা করছিলাম তা সবাই জানত।’’

এদিকে গ্রীক কর্তৃপক্ষ সবসময় এই অবৈধ পুশ্যব্যাকের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে। এনজিও এবং অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রশ্ন করা হলে এথেন্স জানায়, গ্রিস থেকে তুরস্ক অভিমুখে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক বহিষ্কারের অভিযোগ মিথ্যা।

গ্রিক সীমান্তের নদী তীরবর্তী গ্রাম থিয়েরোতে বর্তমানে কর্মরত গার্ড পুলিশ সদস্য ক্রাইসোভালান্টিস গিয়লামাস ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে সকল পুশব্যাকের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এই পুলিশ সদস্য আরও জানান, "যদি কোন ব্যক্তি নদীতে সমস্যায় পড়ে, আমরা তাদের সন্ধান করে থাকি। আমরা কোন অভিবাসীকে এভ্রোস নদীতে ডুবে যেতে দেই না।"

অপরদিকে এন স্মৃতিচারন করে বলেন, “আমাকে খুব কমই নারী এবং শিশুদের পুশব্যাক করতে হয়েছিল। অধিকাংশই ছিল পুরুষ। তারা পাকিস্তান, ইরান, সিরিয়া থেকে এসেছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ বছরে আমি ২ হাজারেরও বেশি মানুষকে তুর্কি উপকূলে পুশব্যাক করেছি।”

তিনি যোগ করেন, “না, আমি আমার কর্মকান্ডে অনুতপ্ত নই। আমি মনে করি গ্রিসে অনেক বেশি সংখ্যক বিদেশী আছে, আমাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ নেই। এছাড়া আমি মনে করি মুসলিমরা আমাদের সংস্কৃতি পছন্দ করে না।”

আমি কখনো অভিবাসীদের আঘাত করিনি। যখন তারা এসেছিল, তখন আমার ছোট নৌকায় ওদেরকে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে কখনোই আমাকে শক্তি ব্যবহার করতে হয়নি। তারা জানত তাদের আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তাদের কেউই চলে যেতে ইচ্ছুক ছিল না।

‘‘আমরা আমাদের বন্দুক কখনো সরাসরি ব্যবহার করি নি। কখনো কখনো আমরা নদী পার হতে আসা অভিবাসীদের ঠেকাতে ফাকাঁ গুলি চালাতাম।

‘‘প্রায়শই, বিকেলের শেষ দিকে বা সন্ধ্যার শুরুতে ৬টার দিকে অভিবাসীদের পুশব্যাক করা হতো। কারণ অপর প্রান্তে থাকা তুর্কি সৈন্যদের উপস্থিতি জানতে আমাদের দিনের আলোর দরকার হতো।’’

‘‘একবার, তুর্কি সৈন্যদের না পেয়ে আমি আমার নৌকা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছিলাম । আমার সাথে থাকা অভিবাসীদের নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিতে পারিনি। তবে আমি যাত্রা অব্যাহত রেখে তাদেরকে অন্য একট পয়েন্টে ফেলে দিয়েছিলাম। তুর্কি সৈন্যদের টহলের অবস্থান প্রায়ই পরিবর্তিত হয়।’’

‘‘অবশ্য আজকের দিনেও পুশব্যাক চলছে। আপনারা সংবাদপত্রে যা পড়ে থাকেন তা সত্য। প্রায়ই সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ কর্তৃক আটক করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের জন্য যথেষ্ট অপেক্ষা করে এবং তাদেরকে আবার তুরস্কে ফেরত পাঠায়।’’

‘‘এটি এরকম ছিল, এবং এটি সর্বদা হতে থাকবে। আমি মনে করি ইউরোপীয় সীমান্ত রক্ষার একমাত্র সমাধান হল পুশব্যাক।’’

ইউরোপীয় সীমানায় জনসংখ্যার গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী অ্যাসোসিয়েশন বর্ডার ভায়োলেন্সের মতে, এ বছরের শুরু থেকে এভ্রোস অঞ্চলে ৪,০০০ মানুষ পুশব্যাকের শিকার হয়েছে।



এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন