কালাব্রিয়াতে একদল অভিবাসনপ্রত্যাশীকে করোনা বিধি বোঝাচ্ছেন এক কর্মী | ছবি: আনসা
কালাব্রিয়াতে একদল অভিবাসনপ্রত্যাশীকে করোনা বিধি বোঝাচ্ছেন এক কর্মী | ছবি: আনসা

অতিমারির শুরুতে কমতে থাকে অভিবাসন। কিন্তু ইউরোপ আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করলে অভিবাসনের স্রোতে জোয়ার আসতে শুরু করে। ইউরোপের সামনে মূল বাধাগুলি কী?

ইউরোপের অনেকের কাছেই করোনা অতিমারির পর নতুন করে ভিড়ের মধ্যে যাওয়া কিছুটা অস্বস্তিকর। আস্তে আস্তে চারপাশে মানুষ মাস্ক খুলতে শুরু করেছে, লকডাউনও সেভাবে আর নেই। টিকা দেওয়ায় গতি আসার ফলে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে ইইউ।

কিন্তু ইউরোপমুখী অভিবাসনে ততটা স্বস্তির পরিস্থিতি নেই, যেমনটা ছিল ২০২০ সালে। এবছর অভিবাসনপ্রত্যাশীরা নষ্ট হওয়া সময়কে ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বিপদের ঝুঁকি সম্বন্ধে অবগত থাকলেও দলে দলে মানুষ পাড়ি দিচ্ছেন ইউরোপের উদ্দেশ্যে।

অভিবাসনে যা বদলেছে করোনা

২০২০ সালে ৩৩ শতাংশ কমে আসে আগের তুলনায় ইউরোপে আশ্রয়ের আবেদনের হার, জানাচ্ছে ইউরোপিয়ান কমিশনের একটি প্রতিবেদন। এত বড় হ্রাস ২০১৩ সালের পর আর দেখা যায়নি বলে জানায় সেই প্রতিবেদনটি।

শুধু তাই নয়, করোনা অতিমারির ফলে বেশ কিছু পরিষেবায় ভাটা পড়ে, যা এতদিন আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনের সময় তাদের সাহায্য করত। পাশাপাশি, পরিচিত পথগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন নতুন রুট ও পন্থা অবলম্বন করে অবৈধ অভিবাসনের সাথে যুক্তরা।

গ্রিসে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভিবাসনের মোড় ঘুরে যায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে ও বিপজ্জনক মধ্য ভূমধ্যসাগরের পথে।

ইইউ সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের মতে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৬৪ শতাংশ বেড়েছে অনিয়মিত অভিবাসন। বিশেষ করে তুরস্ক থেকে আলবেনিয়া, সার্বিয়া, উত্তর ম্যাসিডোনিয়া ও বসনিয়ার এই বলকান পথে বেড়েছে ভিড়। মধ্য ভূমধ্যসাগরের পথে যাত্রার হার হয়েছে দ্বিগুণ, জানাচ্ছে তারা।

এই বছর মধ্য ভূমধ্যসাগরের প্রাণঘাতী পথে সবচেয়ে বেশি এসেছেন টিউনিশিয়ার নাগরিকরা। এরপর দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ, তৃতীয় স্থানে মিশর। এদের বেশিরভাগই ইউরোপের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা শুরু করেন লিবিয়া বা টিউনিশিয়ার তট থেকে।

সাগরে মৃত্যুও বেড়েছে দ্বিগুণ।

ইউরোপ, অভিবাসন ও অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম-এর ডেটা অ্যানালিস্ট আশা মনোহরণের মতে, "ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে কর্মক্ষম জনতার একটা বড় অংশই অভিবাসীরা।" ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রায় ১৩ শতাংশ কর্মীই অভিবাসী। কিন্তু কর্মক্ষম অভিবাসীরা বিদেশে কাজ করলেও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে তাদের অন্তর্ভুক্তি অসমান।

মনোহরণ বলেন যে আইওএম-এর তথ্যমতে বিশ্বের ১৫২টি দেশের মাত্র ৩৩ শতাংশ রাষ্ট্রেই অনিয়মিত অভিবাসীদের করোনা টিকা দেবার জাতীয় নীতি রয়েছে। তারপরেও, করোনা অতিমারির সময় শ্রমের অভাব পূরণ করতে ইইউ-কে নির্ভর করতে হয়েছে বাইরে থেকে আসা মৌসুমী কর্মীদের ওপর।

একদিকে সংক্রমণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসীরা, অন্যদিকে অর্থনীতিতে তাদের প্রয়োজন ও সাদর অংশগ্রহণ, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য ইউরোপের সামনে চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রিত করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন আইওএম-এর আরেক কর্মী জুলিয়া ব্ল্যাক।

টিউনিশিয়ার মতো বেশ কিছু দেশে করোনা অতিমারি অর্থনৈতিক ধস এনেছে। ফলে, অনেকেই কাজ হারিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন ইউরোপের দিকে। করোনা যে শুধু ইউরোপের জন্য অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নতুন বাঁধা সৃষ্টি করছে তা নয়। সাথে, মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে বিপজ্জনক রুটে দেশান্তরী হতেও বাধ্য করছে অনেক ক্ষেত্রে, এমনটাই মত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর মাইগ্রেশন পলিসি ডেভেলপমেন্টের বলিষ্ঠ কর্মী মার্টিন হফমানের।

ফন্টেক্সও এবিষয়ে একমত হয়ে বলেছে যে, "সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যার সাথে এসে মিলেছে করোনা অতিমারি, মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। এর ফলে, ইউরোপের দিকে আসা অনিয়মিত অভিবাসনের ঢেউ বাড়তে পারে।"

এসএস/কেএম (মূল প্রতিবেদন: সনিয়া আঙ্গেলিকা ডিন, ডয়চে ভেলে)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন