(ফাইল ছবি) মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় খাবার বিতরণে ব্যস্ত একজন চালক। ছবিঃ রয়টার্স
(ফাইল ছবি) মুখে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় খাবার বিতরণে ব্যস্ত একজন চালক। ছবিঃ রয়টার্স

ফ্রান্সের মতো বেলজিয়ামেও উবার ইটস এবং ডেলিভেরুর মতো খাবার বিতরণ প্ল্যাটফর্মের চালকরা অনিয়মিত অভিবাসী বা আশ্রয়প্রার্থী হয়ে থাকেন। এটি একটি অনিশ্চিত কাজ যেখানে খুব কম পারিশ্রমিক দেয়া হয় এবং বেশ কষ্টসাধ্য শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। ফলে, অনেকে নিজেদের কাজের বদলে অতিরিক্ত কমিশনের বিনিময়ে অনিয়মিত অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ভাড়া দিয়ে থাকে।

অনেক কুরিয়ার অনুমোদনহীন অভিবাসীদের কাছে তাদের অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য জমা দেয়। এমন সময়ে যখন পেশাটি কাজের জন্য ভালো অবস্থার দাবি করে, কুরিয়ার সংস্থারা ভাবছে কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।

১১ অক্টোবর বেলজিয়ান সংবাদপত্র লো সোয়ারের একটি জরিপ অনুসারে, ডেলিভেরু বা উবার ইটসের মতো খাবার বিতরণ প্লাটফর্মের অর্ধেক চালক বৈধ কাগজহীন অভিবাসী। জরিপ চলাকালে ব্রাসেলসের এই দৈনিকটি কয়েক ডজন চালকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল, যাদের বেশিরভাগই সাইকেলে এবং কেউ কেউ স্কুটার দিয়ে খাবার সরবরাহের কাজ করে থাকে।

১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি এই যুবকদের বেশিরভাগই উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আসা। এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা, পাকিস্তান, সিরিয়া এবং আফগানিস্তান থেকেও এসেছে অনেক অভিবাসী। জরিপে অংশগ্রহণ করাদের প্রায় অর্ধেক ব্যক্তি গণমাধ্যমকে জানায়, বসবাসের কোন বৈধ কাগজপত্র তাদের কাছে নেই এবং তারা তৃতীয় পক্ষের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে খাবার সরবরাহের কাজ করে যাচ্ছে। এই বেলজিয়ান সংবাদপত্রটির জরিপে মূলত ভুয়া অ্যাকাউন্টের প্রকৃত "বাজার" সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।

তবে এই খাতের প্রকৃত পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ এ সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত গবেষণা এখনো হয় নি। তা সত্ত্বেও, এ খাতে কর্মরত অভিবাসী চালকদের পর্যবেক্ষণ থেকে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

ক্রিশ্চিয়ান ওয়ার্কার মুভমেন্টের সদস্য এবং বেলজিয়ামের খাবার সরবারহকারী চালকদের অধিকার বিষয়ক কালেক্টিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাদা লাদরা ইনফোমাইগ্রান্টসকে কর্মরত শ্রমিকদের চিত্র সাম্প্রতিক বিবর্তনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "শুরুতে, উবার এবং ডেলিভেরুতে খাবার সরবরাহ করাদের বেশিরভাগই ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসা তরুণ কলেজ ছাত্র ছিল, সে সময় এটি আজকের মতো অনিশ্চয়তা ঘেরা ছিল না।"

২০১৮ সাল থেকে খাবার সরবরাহ কোম্পানিগুলো কাজের অবস্থার পরিবর্তন এবং এ সংশ্লিষ্ট বেলজিয়ান আইন সংশোধন করে নতুন করে "পিয়ার টু পিয়ার" স্ট্যাটাস তৈরির ফলে অবৈধ ভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। বেলজিয়াম সরকারের অর্থমন্ত্রী নিজে তার কার্যালয়ে বেলজিয়ান সংবাদমাধ্যমের কাছে এ কথা স্বীকার করেছেন। মন্ত্রী বছরের শেষের দিকে এই আইন আবারো পর্যালোচনার পরিকল্পনা করেছেন।

বেতন কমে যাওয়ায় কারা এই কাজ করবে? অনিয়মিত অভিবাসীরা?

ডেলিভেরু বা উবার ইটস এরই মধ্যে বহুবার তাদের নিয়মগুলি পরিবর্তন করেছে। নাদা লাদরা ব্যাখ্যা করেন, “আগে প্রতি ঘন্টা কাজের জন্য পারিশ্রমিক প্রদান করা হতো, কিন্তু সেটি বর্তমানে প্রতি সরবরাহপিছু অর্থ প্রদানের নিয়ম রয়েছে। যেখানে চালকদের অবস্থান থেকে খাবার সরবরাহের দূরত্ব পরিমাপ অসম্ভব। এসব পদক্ষেপ এই কাজটিকে সবচেয়ে অনিশ্চিতএবং কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজে পরিণত করেছে।”

অর্থাৎ অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীরা, আশ্রয়প্রার্থী, কোনো প্রকার বসবাসের অনুমতিবিহীন ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কেউ এই কাজ করতে চাইবে না।

নাদা লাদরা বলেন, "এই সেক্টরে এরকম ঘটনা ইউরোপের সর্বত্র ঘটতে পারে।" 

ফ্রান্সের প্যারিসে চালকদের অধিকার বিষয়ক একটি কালেক্টিভ (সিএলএপি) একই রকমের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন করেছে।

সিএলএপি এর সদস্য এডুয়ার্ড বার্নাসি ২০২০ সালে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানিয়েছিলেন, "এটা আশ্চর্যজনক নয় যে ফ্রিচটি বা অন্যান্য খাবার বিতরণ প্ল্যাটফর্মের অধিকাংশ চালকের বৈধভাবে থাকার অনুমতি নেই।" তিনি যোগ করেছিলেন, "শুরুতে পারিজিয়ান তরুণরা এটি করত। বিশেষ করে যারা সাইকেল এবং বাইকের ফ্যান এবং ছাত্র, তারাই খাবার বিতরণের কাজ করত। কিন্তু আস্তে আস্তে কোম্পানিগুলো পারিশ্রমিক কমিয়ে দিলে ছাত্ররা এই খাত থেকে সরে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে লোকেরা তাদের একাউন্টগুলো অনিয়মিত অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ভাড়া দেয়া শুরু করে।” 

গণমাধ্যমে আসার পরে শুরু পুলিশের তল্লাশি

ডেলিভেরু কোম্পানির একজন মুখপাত্র বেলজিয়ান সংবাদপাত্র লো সোয়ারকে জানান, "এখন পর্যন্ত, আমরা [মিথ্যা অ্যাকাউন্ট] সম্পর্কে খুব কম সুনির্দিষ্ট রিপোর্ট পেয়েছি যার ভিত্তিতে আমরা পদক্ষেপ নিতে পারব।"

তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে অভিযোগ আসার আগেই আমরা পুলিশের সাহায্যে চালকদের মুখাবয়ব যাচাই করার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করি।” 

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, উবার ইটস ইতিমধ্যে চালকের সেলফি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে জানান কোম্পানিটির একজন মুখপাত্র। তিনি যোগ করেন, “একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমাকৃত সেলফির সাথে যদি তার পূর্বের ছবির মিল না থাকে তবে অ্যাকাউন্টটি অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি জালিয়াতির প্রমাণ হলে আমরা অ্যাকাউন্টটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দিতে পারি।"

বেলজিয়ামে এই সেক্টরে কর্মরত অনুমোদনহীন শ্রমিকদের শ্রমবাজার থেকে বাদ না দিয়ে কীভাবে তাদেরকে সমর্থন করা যায় এ ব্যাপারে আলোচনা করেছে বেলজিয়ামের খাবার সরবারহকারী চালকদের অধিকার বিষয়ক কালেক্টিভ। কালেক্টিভের মুখপাত্র নাদা লাদরা বলেন, “এর জন্য প্রয়োজন অনিয়মিতদের নিয়মিতকরণ, আশ্রয় পদ্ধতির মসৃণ প্রক্রিয়া এবং শ্রমবাজারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে গঠনমূলক পরিবর্তন।"

বর্তমানে এই খাতে কর্মরত চালকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা অপেক্ষা করছে। অক্টোবরের শেষ দিকে বেলজিয়ান আদালত ভুক্তভোগী চালক এবং ডেলিভেরু কোম্পানির মধ্যে চুক্তির পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে বিচারের রায় দেবেন। ডেলিভেরুতে কর্মরত চালকদের দায়ের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে এই রায় প্রদানের কথা রয়েছে।



এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন