মিয়ানমার সীমান্তে, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ছবি। ছবিঃ রয়টার্স
মিয়ানমার সীমান্তে, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ছবি। ছবিঃ রয়টার্স

বাংলাদেশের একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে শুক্রবার এক বন্দুকধারীর হামলায় কমপক্ষে সাতজনকে হত্যা করেছে এবং ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছে। সাম্প্রতিক মুহিব্বুল্লাহ নামে রোহিঙ্গা নেতাকে গুলি করে হত্যার পর থেকে ক্যাম্পগুলোতে উত্তেজনা বেড়েছে।

মিয়ানমারের সীমান্তের কাছে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত বালুখালী শরণার্থী শিবিরের একটি মাদ্রাসায় ঢুকে এলোপাথাড়িভাবে গুলি এবং অনেক লোককে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।

তিন সপ্তাহ আগে রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহ তার কার্যালয়ের বাইরে গুলি করে হত্যার পর থেকে মিয়ানমার থেকে আসা নয় লাখেরও বেশি শরণার্থী শিবিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

শুক্রবারের দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ঘটা হামলায় চারজন নিহত হন। এছাড়া আহতদেরকে স্থানীয় বালুখালী শরণার্থী কমপ্লেক্সের একটি হাসপাতালে নেয়ার সময় অন্য তিনজন মারা যান।

পুলিশসূত্রে ঘটনায় কতজন আহত হয়েছে সে ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি, তবে ক্যাম্পে দায়িত্বরত ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) -এর একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হামলায় নিহতদের পাশাপাশি আরও প্রায় ২০জন আহত হয়েছেন।

তিনি বলেন, "প্রায় ২০ জন গুরুতর আহত ব্যক্তি আমাদের হাসপাতালে এসেছিলেন, যাদের অনেকেরই হাত, পা বা চোখে মারাত্মক জখম ছিল। তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন।"

পুলিশ কর্মকর্তা কামরান হোসেন বলেন, শুক্রবার ভোরে কিছু "রোহিঙ্গা দুর্বৃত্তরা" মাদ্রাসায় প্রবেশ করে এবং ভেতরে থাকাদের উপর এলোপাথাড়ি গুলি ও কুপিয়ে পালিয়ে যায়"।

নিরাপত্তা বাহিনী অবিলম্বে শিবিরটিতে নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত টিম পাঠানোর কথা জানিয়েছে। ক্যাম্পটিতে প্রায় ২ লাখেরও বেশি লোক বাস করে। ক্যাম্প বাসিন্দারা মাদ্রাসার মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতদেহের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন।

সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়নের আঞ্চলিক প্রধান শিহাব কায়সার খান সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা ঘটনার পরপরই একজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করেছি।"

তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তির কাছে একটি বন্দুক, ছয় রাউন্ড গোলাবারুদ এবং একটি ছুরি পাওয়া গেছে।

সহিংসতার আশঙ্কায় আতংকিত শরণার্থীরা 

বালুখালী ক্যাম্পের কাছেই অজ্ঞাত হামলাকারীদের হাতে নিহত আইনজীবী ও রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর থেকে অনেক রোহিঙ্গা কর্মী আত্মগোপন করেছেন এবং স্থানীয় পুলিশ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কাছে সুরক্ষা চেয়েছেন।

নিহত রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহ। ছবিঃ রয়টার্স
নিহত রোহিঙ্গা নেতা মুহিব্বুল্লাহ। ছবিঃ রয়টার্স


নিহত ৪৮ বছর বয়সী মুহিব্বুল্লাহ রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায়ের হয়ে একটি প্রধান মধ্যপন্থী প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন।

কিছু রোহিঙ্গা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (আরসা) দায়ী করেছেন।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলার পেছনে এই আরসা জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করে আসছে মিয়ানমার। যার ফলে রোহিঙ্গাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হলে প্রাণ বাঁচাতে তারা ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে নির্বাসন শুরু করে। তবে আরসা একটি টুইটার বিবৃতিতে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে এবং এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।

পুলিশ বলছে, মুহিব্বুল্লাহ হত্যার জন্য কমপক্ষে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু বসবাসরত রোহিঙ্গারা বলছেন শিবিরে আরও সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে।

হাকিম নামের এক শরণার্থী বলেন, "মুহিব্বুল্লাহমৃত্যুর পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। কিন্তু এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আজকে আরও সাতজনকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা কিভাবে এই নিরাপত্তার উপর আস্থা রাখতে পারি?" 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই মাসে এক বিবৃতিতে বলেছে, মুহিব্বুল্লাহ হত্যার পর থেকে অন্তত এক ডজন কর্মী জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর কাছে গিয়েছে নিরাপত্তার জন্য।

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) নেতা কেয়া মিন সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে এএফপিকে বলেন, "আমরা মনে করি তারা (পুলিশ) ভীত ও অনিচ্ছুক। মুহিবুল্লাহ হত্যার পর থেকে শিবিরের মধ্যে একটি গুরুতর উত্তেজনা বিরাজ করছে।"

তবে বাংলাদেশ পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে, ক্যাম্পে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।



এমএইউ/এসএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন