সেইন্ট আম্ব্রিউস ক্লাবের খেলোয়াড়রা। ছবি: সেইন্ট আম্ব্রেউস ক্লাবের ফেসবুক পাতা
সেইন্ট আম্ব্রিউস ক্লাবের খেলোয়াড়রা। ছবি: সেইন্ট আম্ব্রেউস ক্লাবের ফেসবুক পাতা

ইটালির মিলান শহরের সেইন্ট আম্ব্রিউস ক্লাবের মাঠে একসাথে ফুটবল খেলেন স্থানীয় তরুণ, আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীরা। নতুন আসাদের সঙ্গ দেওয়া ছাড়াও, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একটা দৃঢ় বার্তা দিচ্ছে এই ক্লাবটি।

সেনেগালের রাজধানী ডাকারে থাকার সময় আবদুলায় ফুটবল খেলতেন। দেড় বছর আগে মিলানে আসার আগে নিজের দেশসহ আরো অনেক কিছুই পেছনে ফেলে আসেন তিনি, যার অন্যতম তার প্রিয় খেলা ফুটবলও। ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিনি বলেন, "প্রথম প্রথম সব কিছু খুব কঠিন লাগত। আমার বয়েসি কাউকে আমি চিনতাম না এখানে। আর ইটালিয়ান ভাষাও জানতাম না।"

তার কিছু দিন পরেই সেন্ট আম্ব্রিউস ক্লাবের কথা জানতে পারেন আবদুলায়। ২১ বছর বয়েসি আবদুলায় ডিফেন্ডার হিসাবে এই ক্লাবে খেলতে শুরু করেন, বন্ধুত্ব হয় 'তার মতো আফ্রিকা থেকে আসা' ক্লাবের গাম্বিয়া, মালি ও বুরকিনা ফাসো থেকে আসা খেলোয়াড়দের সাথে।

ক্লাবের পরিচালক ড্যানিয়েল রাডুয়াৎজো'র মতে, "আমাদের সংস্কৃতি, দৈনন্দিন অভ্যেস ও চিন্তার আদানপ্রদান খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা মনে করি স্থানীয় মিলানবাসী খেলোয়াড়দেরও এই ক্লাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।"

সপ্তাহে দুদিন, বুধবার ও শুক্রবারে, ক্লাবের খেলোয়াড়রা একসাথে অনুশীলন করেন। তারপর, ক্লাবের লাল সাদা জার্সি গায়ে সবাই মিলে রোববারের সাপ্তাহিক ম্যাচের জন্য তৈরি হন তারা। আবদুলায় বলেন, "ভাগ্য ভালো যে, যে বাজারে আমি কাজ করি, সেটা রোববারে বন্ধ থাকে। তার ফলে আমি এই চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে পারি।"

সেইন্ট আম্ব্রিউসের পথচলা

২০১৬ সালে চালু হয় এই ক্লাব। সেইন্ট আম্ব্রিউস উত্তর ইটালির প্রথম ইটালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য ফুটবল ক্লাব, যেখানে একাধারে স্থানীয়দের সাথে খেলেন অভিবাসী ও শরণার্থীরাও। এই ক্লাবের উদ্দেশ্য একটাই- খেলোয়াড়দের বন্ধুত্ব করবার সুযোগ দেওয়া, যাতে করে ঘরের কাছের মানুষদের ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের সাথে সমানতালে চলতে পারেন তারা।

ফুটবল প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইটালিয়ান ভাষার ক্লাসও করানো হয় এই ক্লাবে, যার ফলে আবদুলায় বর্তমানে ইটালিয়ান ভাষায় আড্ডা দিতে পারেন। তিনি হেসে বলেন, "আমি তো এখন ফরাসি ভাষাও জানি।"

সেইন্ট আম্ব্রিউস নিয়মিত বিভিন্ন 'সলিডারিটি নেটওয়ার্ক' তৈরির কাজ করে থাকে। গত জুলাই মাসে এই ক্লাবে বড় সেনেগালিজ দাওয়াত আয়োজন করা হয়। সেই দাওয়াত থেকে যে অর্থ জোগাড় হয়, তা দান করে দেওয়া হয়। ক্লাবের ফেসবুক পেইজে বলা হয়, 'আমাদের এক বন্ধুর এই অর্থের প্রয়োজন ছিল'। মিলানের বাসিন্দাদের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করতে চায় এই ক্লাব, যাতে করে স্থানীয় মানুষ ভালোভাবে শিখতে পারেন কীভাবে নতুন সংস্কৃতিতে এসে পড়া মানুষদের অভ্যর্থনা জানাতে হয়।

দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের পাশে

অনথিভুক্ত অভিবাসীদের প্রায়ই ইটালিতে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা দেওয়া যায় বলে অনেকের ধারণা। এই মানুষদের জনসংখ্যা ২০২০ সালে প্রায় ছয় লাখের কাছাকাছি। রাডুয়াৎজো বলেন, "ইটালিতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অভ্যর্থনা আইনের জটিলতা থাকায় অনথিভুক্ত ব্যক্তিদের বৈধ কাগজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, কাজ পেতে অনেক ভোগান্তি হয়।"

কাগজ ছাড়া কাজ পাওয়া ও কাজ ছাড়া কাগজ পাওয়া দুটিই খুব কঠিন। ফলে চক্রাকারে চলতে থাকে এই ভোগান্তি।

কিছু দিন আগে রিয়াচে শহরের মেয়রের পাশে দাঁড়ায় এই ক্লাবটি। অবৈধ অভিবাসনকে সমর্থন করার জন্য সাবেক মেয়র ডমেনিকো লুকানোর ১৩ বছরের কারাবাসের সাজা হয়েছে। সাগরে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সংস্থা রেসকিউ-এর জাহাজে ওড়ানো হয় সেইন্ট আম্ব্রিউস ক্লাবের পতাকা।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে

সেইন্ট আম্ব্রিউসের নেতৃত্বের কাছে ফুটবল স্থানীয়দের সাথে নতুন আগতদের 'সামাজিক আদানপ্রদান' ও জ্ঞান বিতরণের একটি মাধ্যম। সমাজে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এই খেলা হাতিয়ার হতে পারে বলে মনে করেন রাডুয়াৎজো। তিনি বলেন, "আমাদের কোনো খেলোয়াড় যদি মনে করেন যে তিনি মিলানিজ, তাহলে তিনি অবশ্যই মিলানিজ। কে কোন দেশ থেকে এসেছে, তাদের লিঙ্গ বা বিশ্বাসের পরিচয় কী, তা এখানে গুরুত্ব পায় না।"

ইটালির ফুটবল জগতেও বর্ণবাদের ছায়া এসে পড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বর্ণবাদের শিকার হন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা। কখনো কখনো বর্ণবাদী আচরণের প্রভাব কোনো খেলোয়াড়ের মনে এত গভীর ছাপ ফেলে যায় যে তার ফলাফল হয় চরম। যেমন গত জুনমাসে এসি মিলান ক্লাবের ২০ বছর বয়েসি ইথিওপিয়ান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় সাইদ ভিসিনের কথা বলা যায়। বর্ণবাদী আচরণের ফলে অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেন এই তরুণ খেলোয়াড়। রেখে যান আত্মহত্যার আগে লেখা একটি চিঠি, যেখানে বিস্তারিত বলে যান তিনি নিজের অভিজ্ঞতার করুণ কাহিনি।

আবদুলায়ও একবার বর্ণবাদী আচরণের সম্মুখীন হয়েছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, "রাস্তায় এক নারী আমায় একবার গালি দিয়েছিল, কিন্তু তা তেমন বড় ঘটনা নয়। এছাড়া আর কিছু হয়নি।"

আবদুলায় স্বপ্ন দেখেন এই বছর চ্যাম্পিয়নশিপ জিতবার। অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকেই এখন তার নজর।

মারলেন পানারা/এসএস (আনসা)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন