জারজিস শহরের জেলেরা প্রায়ই অভিবাসী বোঝাই নৌকা দেখতে পাওয়ার কথা জানান। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
জারজিস শহরের জেলেরা প্রায়ই অভিবাসী বোঝাই নৌকা দেখতে পাওয়ার কথা জানান। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস

টিউনিশিয়ার দক্ষিণের বিভিন্ন উপকূলে কর্মরত জেলেরা নিয়মিত সমুদ্র থেকে অভিবাসী নৌকাগুলিকে উদ্ধার করে থাকে৷ সাগরে প্রতিকূল স্রোত সত্ত্বেও প্রতিবেশি লিবিয়া থেকে আসা মৃত বা জীবিত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ফিরিয়ে আনে জেলেরা৷

পানিতে ভাসমান লাশ খুঁজে পাওয়ার মতো অভিবাসী বোঝাই ডিঙি পারাপার যেন দৈনিক রুটিন হয়ে উঠেছে। টিউনিশিয়া থেকে ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশেষ সংবাদদাতা লেসলি কারেতেরো জানাচ্ছেন বিস্তারিত।

মাশরেক দক্ষিণ টিউনিশিয়ার একটি ছোট উপকূলীয় শহর জারজিসে একটি ক্যাফের বারান্দায় বসে আছেন। ৫৩ বছর বয়েসি সালাউদ্দীন সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফিরলেন। আজকে অবশ্য সাগর বেশ শান্ত। বিগত কয়েক দিন ধরে, সাগর খুব রুক্ষ থাকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ডিঙি নৌকায় ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার চেষ্টা করার ঝুঁকি নেয়নি।

১৫ বছর বয়সে মাছ ধরা শুরু করেন সালাউদ্দীন মাশরেক। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, সমুদ্রে তার অভিজ্ঞতা মাছ ধরার বাইরে একটি ভিন্ন মোড় নিয়েছে। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌযানগুলি নিয়মিতভাবে এই রুটে পারাপার করে। তার ভাষায় প্রতিবেশি লিবিয়া এবং টিউনিশিয়ার উপকূল পাড়ি দেয়া অভিবাসনপ্রত্যাশী ও নির্বাসিতদের সাহায্য করা ‘রুটিন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সালাউদ্দীন মাশরেক দীর্ঘদিন যাবৎ জারজিশ শহরের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ছবিঃ ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস
সালাউদ্দীন মাশরেক দীর্ঘদিন যাবৎ জারজিশ শহরের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ছবিঃ ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস


জারজিস বন্দরে নিকটে মাছ ধরা জেলেদের সবার সামগ্রিক পর্যবেক্ষণে একটি সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে অন্য একজন জেলে জামেল ঘোয়েল বলেন, "বিদেশিরা? আমরা যখনই আমাদের নৌকা নিয়ে যাই তখনই আমরা তাদের দেখি।"

সালাউদ্দীন মাশরেক দীর্ঘদিন যাবৎ জারজিশ শহরের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। তিনি বলেন, "আমরা ২০০০ সালের শুরু থেকেই সমুদ্র অভিবাসীদের ডিঙি নৌকা দেখছি কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংখ্যা বেড়েছে এবং নৌকাগুলি আরও বেশি অভিবাসী বোঝাই হয়েছে।" কফির কাপে চুমুকের সাথে তিনি যোগ করেন, "আমি কতগুলি নৌকা দেখেছি তা আমি গণনাও করতে পারব না, প্রচুর!” 

লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের চাপ

সমুদ্রে অভিবাসীদের কোনো দল সমস্যার মুখোমুখি হলে জেলেরা সাথে সাথেই টিউনিশিয়ার কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। কোস্ট গার্ড জাহাজ ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকলে উদ্ধার কাজ চালায়। নাহলে, অভিবাসীদের সহায়তা করা জেলেদের উপর নির্ভর করে। সাগরে একের পর এক দুর্ঘটনা এড়াতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, ডক্টর্স উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) ২০১৫ সালে স্থানীয়দের সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার উপর প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

অন্যদিকে, জেলেরা লিবিয়ার কোস্টগার্ডের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত ছিলেন না। টিউনিশিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রকৃতপক্ষে অভিবাসীদের নৌকা আটকানোর জন্য লিবিয়ার কোস্টগার্ডকে তাদের জলসীমায় প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ২০১৬ সালের চুক্তির পর থেকে ত্রিপলি তার অঞ্চলে অনুসন্ধান এবং উদ্ধার অভিযানের জন্য দায়ী। 

স্থানীয় জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, তারা লিবিয়ান মিলিশিয়াদের কাছ থেকে ক্রমাগত চাপ পেয়ে থাকে। 

জারজিস বন্দরের কাছে জেলেদের পুরনো কিছু নৌকা। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস
জারজিস বন্দরের কাছে জেলেদের পুরনো কিছু নৌকা। ছবিঃ ইনফোমাইগ্রেন্টস

সালাউদ্দীন মাশরেক ব্যাখ্যা করেন, "তারা সশস্ত্র এবং প্রায়শই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ডিঙি নৌকাগুলির দিকে গুলি চালায় যাতে অভিবাসীরা যাত্রা চালিয়ে যেতে না পারে। কখনও কখনও তারা আমাদের নৌকাগুলিতেও গুলি চালায়।"

জারজিসের আরেক জেলে শামসেদ্দিন বোরাসাইন বলেন, "যতবারই আমি অভিবাসীদের নৌকার কাছে লিবিয়ানদের দেখেছি, ততবারই গুলি চলতে দেখেছি।" 

তিনি যোগ করেন, "আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। আইন ছাড়া মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের হাতে আর কিছুই নেই ।"

"আমরা চোখের সামনে মানুষকে মরতে দিতে পারি না"

সমুদ্রে লিবিয়ানদের সাথে সংঘর্ষই স্থানীয় জেলেদের বেদনার একমাত্র কারণ নয়। উদ্ধার অভিযানের অপরাধে শাস্তির ভয়ে জেলেরা বেশ চিন্তিত। তারা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ভয় পায়। 

সালাউদ্দীন মাশরেক বলেন, "আমার সহকর্মীরা অভিবাসীদের উদ্ধার করতে ভয় পায়, কারণ তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ আনা হতে পারে। ২০১৮ সালের শেষের দিকে, লাম্পেদুসার উপকূলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বাঁচানোর এবং ইটালীয় দ্বীপে নিয়ে যাওয়ার জন্য জারজিস শহরের ছয় জেলের বিচার করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি আমাদের স্মৃতিতে চিহ্ন রেখে গেছে।” 

বিচারের মুখোমুখি হওয়াদের মধ্যে শামসেদ্দিন বোরাসাইন অন্যতম অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এ ঘটনায় আর অবাক হতে চান না। এই খারাপ অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও, তিনি দুর্দশাগ্রস্ত অভিবাসীদের সাহায্য করে চলেছেন। অক্টোবরের শুরুর দিকে তিনি সর্বশেষ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "আমাদের চোখের সামনে মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না। এটা করে আমাদের কিছু লাভ হয় না, এটা শুধুই মানবতা।"

প্রতিবেশি লিবিয়ার উপকূলরক্ষীদের হুমকি এবং তাদের কার্যকলাপের মধ্যেও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারে টিউনিশিয়ানরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান বৃদ্ধি হলে তাদের দায়িত্ব কমে আসবে বলে বলে করেন জেলেরা।

উদ্ধার কাজে অংশ নিয়ে জেলেরা মৎস শিল্প থেকে আয় হারানোর পাশাপাশি রয়েছে ট্রমা বা মানসিক ধাক্কার ঝুঁকি। পানিতে ভাসমান লাশের ওপর পড়ে যাওয়াও তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্রোতের সাথে লিবিয়ার জলসীমা থেকে অনেক মৃতদেহও টিউনিশিয়ার দিকে প্রবাহিত হয়ে দেশটির দক্ষিণের সমুদ্র সৈকতে অবতরণ করে। কিছু লাশ পানির সাথে ফুলে যায় বা পচনশীল অবস্থায় থাকে।

সালাউদ্দীন মাশরেক বলেন, "লাশ থেকে যে গন্ধ বের হয় তা বর্ণনা করা অসম্ভব। সবচেয়ে খারাপ জিনিসটি হল বাচ্চাদের দেখা। আপনি কখনই এসব দৃশ্য ভুলতে পারবেন না। আমি চোখে অন্ধকার দেখি অনেক সময়! ছবিগুলো ভেসে উঠে!”

এমএইউ/এসএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন