লিবিয়ায় অসংখ্য অভিবাসনপ্রত্যাশীর দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম কঠিন। ছবিঃ এএফপি
লিবিয়ায় অসংখ্য অভিবাসনপ্রত্যাশীর দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম কঠিন। ছবিঃ এএফপি

ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স বা এমএসএফ-এর সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৩৬৭জন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে ১৪০জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রুটে পাড়ি দিয়ে তাদের নানা ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছে।

অক্টোবর মাসে এমএসএফ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয় কীভাবে অভিবাসনের যাত্রা একা সম্পন্ন করে থাকে বহু অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্করা। ফলে এই যাত্রায় অন্যদের তুলনায় আরো বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হয় তারা।

সাম্প্রতিক একটি অভিযানে এমএসএফ-এর জাহাজ জিওব্যারেন্টস সাগর থেকে উদ্ধার করে ৩৬৭জনকে। এদের মধ্যে ৪০ শতাংশের বয়েস আঠারোর কম। ১৪০জন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসনপ্রত্যাশী এই যাত্রায় বেরিয়েছেন কোনো অভিভাবক ছাড়াই। এখন পর্যন্ত এই জাহাজে উদ্ধার হওয়া এটিই সবচেয়ে বড় অপ্রাপ্তবয়স্কদের দল।

এমএসএফ কর্মী জুলিয়া মেলিশারের মতে, বর্তমানে এই কিশোর-কিশোরীরা নিরাপদে ইটালিতে অবতরণ করলেও যাত্রাপথের সমস্ত ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের মনে দীর্ঘমেয়াদী ছাপ ফেলে যাবে।

সহিংসতার মুখোমুখি

টুইটারে একটি পোস্টে এমএসএফ জানায়, "এই ধরনের যাত্রায় অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জোর করে কাজ করানো হয়। তাদের অত্যাচার করা হয়, আটক করা হয় ও কখনো কখনো শারীরিক বা যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেন যে কেন এত এত কিশোর এই পথে একা যাত্রা করে থাকেন। আমি জানি যে আমি তাদের হয়ে উত্তর দেবার যোগ্য নই। কিন্তু বেশিরভাগ কিশোরদের কাছ থেকে আমি জেনেছি যে তারা লিবিয়াকে নরক মনে করে। তাই তারা সেখান থেকে পালাতে চায়।"

সাম্প্রতিক অভিযানে এমএসএফ উদ্ধার করে সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া, মালি ও ক্যামেরুন থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের। এদের মধ্যে একজনের বয়েস ছিল মাত্র ১২, জানান মেলিশার।

পালিয়ে আসা এই কিশোর জানায় যে তার বাবাকে হত্যা করা হয় কারণ 'তিনি চাননি তার ছেলেকে সেই দেশের সামরিক বাহিনিতে নেওয়া হোক'। বাবা মারা যাওয়ার পর এই কিশোরের মা তাকে জোর করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন।

লিবিয়া থেকে ফেরা অসম্ভব

দক্ষিণ লিবিয়ায় এসে পৌঁছানোর পর পালিয়ে আসা কিশোরকে সাত মাস ধরে আটকে রাখা হয় বলে জানায় সে। পালানোর আগে সেখানে অভাবনীয় অত্যাচারের শিকার হয় সে।

এমএসএফ কর্মীরা বলেন যে, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যে কোনো কারণেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন, যেমন যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বৈষম্য বা পরিবারের নিরাপত্তা। কিন্তু একবার লিবিয়ায় আসলে সেখান থেকে বের হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকে।

এর পেছনে রয়েছে বর্তমান লিবিয়ায় মানবপাচার ও অবৈধ অর্থের লেনদেনের কারবারের বাড়বাড়ন্ত, যার মধ্যে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ঢুকে পড়লে বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, এই চক্রের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হচ্ছে তাদের পণ দেওয়া। এই পণ জোগাড় করতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিবারের সদস্যরা হিমশিম খায়, ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপরে ইউরোপে পৌঁছে অর্থ উপার্জনের চাপ আরো বাড়তে থাকে। একই সাথে, বাড়তে থাকে যে কোনো প্রকারে ইউরোপে পৌঁছাতে পারার জেদ।

হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব, কৈশোর

মেলিশার বলেন, "আমাদের কাছে থাকা কিশোররা বলেছে যে এই পথে আসতে গিয়ে বহু বন্ধু হারিয়েছে তারা, জারণ লিবিয়ায় মানুষের গুম হওয়া বা মারা যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোনো সাধারণ মানুষের জন্য এই সব অত্যাচার অসহনীয় হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে কোনো শিশু কীভাবে এসব সামলাতে পারবে?"

যদিও সাগর থেকে উদ্ধার হবার পর যখন এইসব অভিবাসনপ্রত্যাশীরা উদ্ধারকারী জাহাজের নিরাপদ ঘেরাটোপে পা রাখেন, চারদিক ফেটে পড়ে তাদের উল্লাসে, হাততালিতে, গানে। কিন্তু তবুও মুছে যায় না মনের ভেতরে থাকা নানা ক্ষত, যা এই বিপজ্জনক যাত্রায় তাদের সঙ্গী হয়েছিল এতদিন।

মেলিশারের মতে, "এই কিশোরেরা এখন এখানে খেলছে, হাসছে, নতুন বন্ধু বানাচ্ছে, একদম আর পাঁচটা বাচ্চা ছেলেদের মতোই। কিন্তু তাদের শৈশব বা কৈশোর আর অবশিষ্ট নেই। তাদের অভিজ্ঞতা তাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে।"

জুলিয়া মেলিশার একটি ভিডিওতে ব্যাখ্যা করছিলেন নিজের অনুভূতির কথা, যা তিনি এই শিশু-কিশোরদের সাথে থাকলে অনুভব করেন। মুখে মাস্ক, মাথায় টুপি পরে থাকার কারণে চট করে এদের বয়েস বোঝা কঠিন হলেও কথা বলতে গেলেই বোঝা যায় আসলেই কতটা অল্পবয়েসি এই সব অভিবাসনপ্রত্যাশীরা, বলেন মেলিশার।

তিনি বলেন, "হঠাৎ বুঝতে পারি যে এটা তো একদম বাচ্চা! বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিবাসনের পথ পার করে এই জাহাজে বসে আছে একটা শিশু! বাবা, মা কোনো পরিবারের সদস্য ছাড়াই সে এখানে এসেছে। যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাত্রা করে এসেছে এই কিশোর, তার ভেতরের ক্ষত আসলে কতটা গভীর তা চট করে বোঝা যায় না। নিজে থেকে এইসব ক্ষত সেরেও উঠবে না।"

আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এমএসএফ ইতিমধ্যে আবেদন জানিয়েছে শিশুদের 'বিশেষ নিরাপত্তা' দিতে, যাতে করে তাদের থাকার জায়গার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা দেওয়া যায়। এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে একসাথে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স।

এমা ওয়ালিস/এসএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন