আফগানিস্তানত্যাগে আগ্রহীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে | ছবি: রয়টার্স
আফগানিস্তানত্যাগে আগ্রহীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে | ছবি: রয়টার্স

আফগানিস্তানের জারেঞ্জের মতো সীমান্ত শহরগুলোতে মানবপাচারকারীদের এখন রমরমা অবস্থা৷ আফগানরা দেশত্যাগ করতে তাদের সহায়তা নেয়ার হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে৷ ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, দেশত্যাগে আগ্রহীদের অনেকে সরকারি বা অন্যান্য মধ্যবিত্ত চাকুরি করতেন৷

আগস্টের শুরুতে তালেবানের হাতে পতন ঘটা প্রথম আফগান প্রাদেশিক রাজধানী হচ্ছে জারেঞ্জ৷ নিমরোজ প্রদেশের এই রাজধানী ইরানের সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়৷ এটির অবস্থান ঐতিহাসিক সিল্ক রুটে যা কান্দোহার এবং হেরাতের সঙ্গে যুক্ত৷ ফলে অঞ্চলটি সবসময়ই ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ৷ 

তবে শহরটি শুধু পণ্য বেচাবিক্রিরই কেন্দ্র নয়৷ ইরান ও পাকিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় মানবপাচারকারীদের কাছেও জনপ্রিয়৷ 

বিবিসি টুডের অনুষ্ঠানে ৯ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৪ এবং ২০১৫ সাল থেকেই মানবপাচারকারী এবং দেশত্যাগে আগ্রহীদের মিলনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত শহরটি৷ আর এখন সেখান থেকে মানবপাচার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে৷ 

‘‘আমরা এই রুটের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করছি৷ সেখানে যা দেখছি তাহচ্ছে প্রত্যেক গন্তব্যে তাদের যাত্রায় সহায়তা দিতে অবকাঠামো বেড়েছে,’’ বলেন সমাজ-অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যানসফিল্ড৷ 

পাচারকারীদের ফিও বেড়েছে

গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার জানিয়েছিল যে জারেঞ্জের মতো শহরগুলো থেকে আফগানদের ইরান বা তুরস্ক হয়ে ইউরোপে পাচারের ফি বাড়িয়েছে মানবপাচারকারীরা৷ 

আফগানিস্তান থেকে একজনকে তুরস্কে পৌঁছে দিতে গত বছর গড়ে এক হাজার ৭১০ মার্কিন ডলার করে নিয়েছে মানবপাচারকারীরা, যা আগের তুলনায় বেশি৷ 

বিভিন্ন সীমান্তে নিরাপত্তারক্ষী বেড়ে যাওয়ায় মানবপাচারকারীরা ক্রমশ আরো বিপজ্জনক পথে শরণার্থীদের পাচার করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়৷ 

ইরানে পৌঁছানো একদল আফগান শরণার্থী | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
ইরানে পৌঁছানো একদল আফগান শরণার্থী | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স


সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাদক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন নিয়ে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছেন ম্যানসফিল্ড৷ তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, যদিও এখন অবধি মানবপাচারকারীরা ২০১৪ এবং ২০১৫ সালকে ইউরোপে মানব পাচার সংখ্যার বিবেচনায় নিজেদের ‘শুভ সময়’ মনে করেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কোনো রকম কাগজপত্র ছাড়া সীমান্ত অতিক্রমের সংখ্যা আগের তুলনায় কোথাও কোথাও দ্বিগুণ হয়েছে৷   

২০১৪ এবং ২০১৫ সালের দিকে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ট্রাক শরণার্থীদের নিয়ে জারেঞ্জ শহর ছাড়তো৷ সমাজ-অর্থনীতিবিদ ম্যানসফিল্ডের হিসাবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে৷ 

‘‘আমি বলতে পারি যে এই শীতকালটি অনেক কঠিন হবে৷ অনেক মানুষ দেশত্যাগ করছেন৷ আর আমরা যদি ইতোমধ্যে যারা আফগানিস্তান ছেড়েছেন তাদেরকে হিসেব করি, তাহলে বলা যায় বেশ বড় সংখ্যক মানুষ এখন ইউরোপের পথে রয়েছেন,’’ বলেন এই বিশেষজ্ঞ৷   

‘এক ঘণ্টায় শহর ছেড়েছে পঞ্চাশটিরও বেশি ট্রাক’

বিবিসি সাংবাদিক সেকান্দার কারমানি এক ঘণ্টায় পঞ্চাশটির বেশি শরণার্থীভর্তি ট্রাক শহরটি ছাড়তে দেখেছেন৷ প্রতিটি ট্রাকে ১৮ থেকে ২০ জন শরণার্থী ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি৷  

বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এক আফগান নারী প্রশ্ন করেছেন, ‘‘আমরা আর কী করতে পারি?’’ কাবুলের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন তিনি৷ কিন্তু আফগান সরকার গত তিনমাস ধরে তাদের বেতন দিচ্ছেন না৷ 

‘‘আমাদের দেশত্যাগ ছাড়া আর কোনো কিছু করার নেই৷ আমার বাচ্চারা কী খাবে?’’ বলেন তিনি৷

বিবিসির প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ট্রাকগুলোতে থাকা মানুষদের অধিকাংশ পুরুষ হলেও কিছু নারী এবং শিশুকেও দেখা গেছে৷ আর শিক্ষিত মানুষরাও এভাবে দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে৷ 

এআই/এফএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন