গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্প | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এপি
গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্প | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ/এপি

গ্রিসের চিওস দ্বিপের কারাগারে আটকদের মধ্যে অনেকেই অভিবাসনপ্রত্যাশী। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। কিন্তু এই কারাগারটিতে আটক তিন অভিবাসনপ্রত্যাশীর সাজার বিষয়টি অনেকটাই বিস্ময়কর।

এদের মধ্যে সোমালিয়া থেকে আসা মোহাম্মদের সাজার মেয়াদ ১৪২ বছর। তার সাথে আছেন আফগানিস্তান থেকে আসা আরো দুই অভিবাসনপ্রত্যাশী আমির যহেরি এবং আকিফ রাউসুলি। তাদের প্রত্যেককে ৫০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, কী অপরাধে সোমালিয়ার মোহাম্মদ প্রায় দেড়শ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে কারাগারে দিনযাপন করছেন। কিংবা আফগানিস্তান থেকে আসা দুজন অর্ধশত বছরের দণ্ড। 

মামলার নথিপত্র বলছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই যে, তারা ডিঙি নৌকায় করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গ্রিসে নিয়ে এসেছিলেন। জানা গেছে, মানবপাচারকারীরা তাদেরকে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যবর্তী এজিয়ান সাগরে ফেলে চলে গেলে তারা নৌকার দায়িত্ব নেয় তারা। আর নৌকায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবন বাঁচাতে গ্রিসেের চিওস দ্বীপে পৌঁছান।

"আমার মনে হয় না মানুষকে বাঁচানো কোনো অপরাধ," নৌকাটি নিয়ে আসার বিষয়ে এভাবেই বললেন সোমালিয়ার হামাদ আবদি মোহাম্মদ।

 গত সপ্তাহে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের একদল প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা এই তিন অভিবাসনপ্রত্যাশীর সাথে কারাগারে দেখা করেন। মোহাম্মদ জানান, এজিয়ান সাগরে সেসময়ে নৌকাটি নিয়ে গ্রিসে আসা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। তার ভাষ্য, মানবপাচারকারীরা তাকে নৌকাটির দায়িত্ব নিতে বাধ্য করে। এসময় তারা তাকে বন্দুক দিয়ে ভয় দেখায় এবং আঘাত করে।

''নৌকায় থাকা মানুষগুলোর জীবন ঝুঁকিতে ছিল। মানুষের জীবন বাঁচানো সুযোগ পেলে এমন কাজ আমি আবারো করবো," বলেন মোহাম্মদ।      

এমন ঘটনায় সমালোচকরা বলেছেন, অবৈধ পথের অভিবাসন ঠেকাতে গ্রিস সরকার এমন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। 

এই তিন দণ্ডপ্রাপ্ত অভিবাসনপ্রত্যাশীর আইনজীবী আলেকজান্দ্রোস গেওরগোলিস বলেন, "এটা সর্ম্পূণ অসম্ভব বিষয় যে আশ্রয় চাইতে আসা ব্যক্তির যে কিনা চাপের মুখে ঝুঁকির্পূণ নৌকার দায়িত্ব নেওয়ার দায়ে এমন জেল হতে পারে। পাচার হওয়া ব্যক্তিকে পাচারকারী হিসেবে দেখাচ্ছে গ্রিস সরকার।"  

মোহাম্মদের নৌকাটিতে প্রায় তিন ডজন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। মোহাম্মদ জানান, সেসময় তারা বার বার তুরস্কের সমুদ্ররক্ষীদের সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু সাহায্যের বদলে তুরস্কের সমুদ্ররক্ষীরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নৌকার চারপাশে চক্রাকারে ঘুরছিল আর প্রচণ্ড বেগে ঢেউয়ের ধাক্কা দিচ্ছিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় দুলতে তাকা নৌকা থেকে দুইজন নারী সমুদ্রে পানিতে পড়ে ডুবে যায়। তুরস্কের সীমান্তরক্ষীরা তাদেরকে গ্রিসের দিকে ধাওয়া করে বলে জানান মোহাম্মদ।

চিওস দ্বীপের একটি শরণার্থী শিবিরের বাইরে প্রতিবাদি ব্যানার। ছবিঃ Jannis Papadimitriou
চিওস দ্বীপের একটি শরণার্থী শিবিরের বাইরে প্রতিবাদি ব্যানার। ছবিঃ Jannis Papadimitriou


এরপর গ্রিসের উপকূলে দেশটির কোস্টর্গাড তাদেরকে উদ্ধার করে। মোহাম্মদ স্বীকার করে যে, সে নৌকাটি চালিয়ে নিয়ে এসেছে। আর একারণে তাকে পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে শত বছরের জেল দেয়। একই ঘটনা ঘটে দুই আফগান অভিবাসনপ্রত্যাশীর বেলায়ও।  

শরণার্থীদের সাহায্য করে বিপদে পড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৮ সালে সিরিয়ান মানবাধিকারকর্মী সারাহ মারদিনি ও স্বেচ্ছাসেবী সিয়ান বিন্ডার শরণার্থীদের সাহায্য করতে গিয়ে আটক হয়ে জেল খাটে। 

আর এমন ঘটনা যে শুধু গ্রিসেই ঘটছে তা কিন্তু নয়। জার্মানি, ইটালি, মালটা, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও গ্রিসে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এমন ৫৮ ঘটনার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে।  

সিয়ান বিন্ডার বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ''আমার মনে হয় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সমাধানের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া উচিত। তা না হলে পাচারকারী বা গোয়েন্দা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকতে হবে।"

বিন্ডার-এর আইনজীবি দিমিত্রিস চোলিস বলেন, "মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে থামানোর পথ হলো উদ্ধার কাজকে অপরাধ হিসেবে ফুটিয়ে তোলা। বেসরকারি সংস্থাগুলোকে জেল-জরিমানার সব হুমকি-ধামকির মাধ্যমে অবৈধ প্রত্যাবাসনসহ না অনিয়ম ঢেকে রাখতে চায় প্রশাসন। 

তবে অবৈধ প্রত্যাবাসনের বিষয় অস্বীকার করে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী ক্যারিয়াকিস মিটসোতাকিস বলেন, তার সরকার অভিবাসন বিষয়ে 'কঠোর কিন্তু ন্যায্য নীতি' অনুসরণ করে।

তুরস্ক থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের ঘটনা নতুন কিছু নয়। পরিস্থিতি সামলাতে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে গ্রিস সরকার। মানবপাচার ঠেকাতে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের বিধান রেখে আইনও বলবৎ আছে। 

তবে পরিস্থিতি অনুযায়ীই নিজেদের নিরাপদ রাখতে মরিয়া পাচারকারীরা। নিজেরা নৌকা করে নিয়ে আসার পরিবর্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীদেরই জোরপূর্বক নৌকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর এর ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশী নিজেই তখন সমুদ্ররক্ষীদের চোখে পাচারকারী হয়ে উঠে।   

আইনজীবী দিমিত্রিস চোলিস বলেন, ''আমাদের এখানে জেলখানাগুলো অনেকঅভিবাসনপ্রত্যাশী আটকে আছেন। তারা মূলত নৌকা চালক হিসেবে কাজ করছিল।  

ভাগ্যের সুতায় আটকে আছেন আফগানিস্তানের আমির যহেরি এবং আকিফ রাউসুলি। দুবছর আগে তারা নৌকায় করে গ্রিসে এসেছিল। কিন্তু নৌকা চালানোর কারণে তাদের পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ৫০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

মানবাধিকার সংস্থাগুলি তাদের ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছে। আগামি মার্চ মাসে যাহেরি ও রাউসোলির মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ রয়েছে। তবে শুনানির তারিখ এখনো পাননি মোহাম্মদ। 

আরআর/এসএস (এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন