দুই মানবাধিকার কর্মীকে ২০১৮ সালে আটকের ঘটনার প্রতিবাদে এথেন্সে মিছিল  | ছবি: ইপিএ
দুই মানবাধিকার কর্মীকে ২০১৮ সালে আটকের ঘটনার প্রতিবাদে এথেন্সে মিছিল | ছবি: ইপিএ

তিন বছর আগে অভিবাসীদের গ্রিসে পৌঁছাতে সহায়তা করায় একদল মানবাধিকার কর্মীর বিরুদ্ধে করা ফৌজদারী মামলার বিচার শুরু হচ্ছে৷ তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি এবং অপরাধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা রয়েছে৷ বৃহস্পতিবার লিসবসে শুরু হওয়া তাদের বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সমাজ৷

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)’ জানিয়েছে যে মানবাধিকার কর্মীরা ‘অভিবাসী ও শরণার্থীদের জীবনরক্ষায়’ সহায়তা করেছিলেন৷ সংগঠনটি মনে করে, গ্রিক কর্তৃপক্ষ বিপদে পড়া মানুষদের উদ্ধার করাকে ‘অপরাধ হিসেবে’ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে৷ 

মামলার আসামীদের দুজন, সিরিয়ান শরণার্থী সারাহ মারদিনি এবং জার্মান নাগরিক শোন বাইন্ডার, ইতোমধ্যে তিনমাস পুলিশ হেফাজতে কাটিয়েছেন৷ অভিবাসী উদ্ধারের ঘটনায় এই দুই মানবাধিকার কর্মীর পাঁচ বছর জেল খাটার শাস্তি হতে পারে বলে জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী হারিস পেটসিকাস৷ 

এই জুটি অবশ্য ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শর্তসাপেক্ষে পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্তিলাভের পরপরই গ্রিসত্যাগ করেন৷ তাদের বিরুদ্ধে আরো একটি মামলার আলাদাভাবে তদন্ত চলছে৷  

সবমিলিয়ে ২৪ জন মানবাধিকার কর্মী লেসবস এবং গ্রিক সমুদ্রসীমায় ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল অবধি কাজ করা অলাভজনক খোঁজা ও উদ্ধারকারী গোষ্ঠী ‘এমার্জেন্সি রেসপন্স সেন্টার ইন্টারন্যাশনাল (ইআরসিআই)’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন৷  

মারদিনি বর্তমানে বার্লিনে বসবাস করছেন৷ গ্রিস যাওয়ারক্ষেত্রে তার উপরে সাত বছরের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে৷ তিনি বৃহস্পতিবারের শুনানিতে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন৷ বাইন্ডার অবশ্য সেখানে উপস্থিত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন৷ 

এইচআরডাব্লিউকে মারদিনি জানিয়েছেন যে আবারো স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা নিয়ে ভয় ঢুকে গেছে তার মনে৷ 

‘‘আমরা এখন অন্তত বন্দি নেই৷ আমরা চাই এটা শেষ হয়ে যাক৷ এধরনের ঘটনা আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলে৷ গত তিনবছর অনেক কঠিন ছিল,’’ বলেন তিনি৷ 

মারদিনি নিজেও ২০১৫ সালে শরণার্থী হিসেবে তুরস্ক থেকে নৌকায় করে গ্রিস পৌঁছেছিলেন৷  

সেসময় নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে মারদিনি এবং তার ছোট বোন ইয়াসরা, যিনি ২০১৬ এবং ২০২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে শরণার্থী দলের সদস্য হিসেবে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করছেন, নৌকাটিকে ভাসমান রেখে সেটিকে নিয়ে সাঁতরে লিসবস পৌঁছান৷     

মারদিনি পরে বার্ড কলেজ বার্লিনে ভর্তি হন এবং এক সেমিস্টারের বিরতি নিয়ে ইআরসিআই-এর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে লেসবস যান৷

সেখান থেকে ২০১৮ সালের আগস্টে ফেরার দিন তাকে গ্রেপ্তার করে গ্রিক কর্তৃপক্ষ৷ বাইন্ডারকেও একই দিনে গ্রেপ্তার করা হয়৷  

ইউরোপীয় সংসদের এক প্রতিবেদনে এই বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘‘ইউরোপে সংহতিকে অপরাধীকরণের সবচেয়ে বড় মামলা’’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে৷  

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের শিশু অধিকার বিষয়ক পরিচালক বিল ফন এশফেল্ট এই বিষয়ে বলেন, ‘‘মামলাটি সম্ভবত ভবিষ্যতের উদ্ধার তৎপরতাগুলোকে ব্যহত করতে সাজানো হয়েছে যা আরো অনেক জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে৷’’

মামলার প্রসিকিউশন ইআরসিআই-এর খোঁজা এবং উদ্ধার অভিযানকে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এবং সংগঠনটি কার্যক্রম চালাতে যে অর্থসংগ্রহ করতো তারসঙ্গে অর্থপাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা তা তদন্ত করছে৷ 

মারদিনি এবং বাইন্ডারসহ মামলার সব আসামীর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনারক্ষেত্রে পুলিশের প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে যেখানে উল্লেখ রয়েছে যে মানবাধিকার কর্মীরা বিপদে পড়া অভিবাসীদের খোঁজ পেতে গ্রিক উপকূলরক্ষী ও ফ্রন্টেক্সের রেডিও চ্যানেল এবং নৌযান পর্যবেক্ষণ করতো৷ 

ইউরোপের প্রবেশের চেষ্টাকালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে চলতি বছর এখন অবধি অন্তত ২৪ জন অভিবাসী ডুবে মারা গেছেন৷ তাদের মধ্যে চার শিশু এবং এক নারী রয়েছেন যারা ২৬ অক্টোবর নৌকা ডুবে মারা যান৷ সেই ঘটনায় দুজন এখনো নিঁখোজ রয়েছেন৷ 

এআই/কেএম (এএফপি, আনসা)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন