সারা বিশ্বে অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের উপর তাদের নিজ দেশের পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। ছবিঃ ফ্লিকার সিসি
সারা বিশ্বে অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের উপর তাদের নিজ দেশের পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ নির্ভরশীল। ছবিঃ ফ্লিকার সিসি

করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চলতি বছর সারাবিশ্বে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে। প্রবাসীরা ২০২১ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত ৫৮৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ তাদের দেশে পাঠিয়েছেন৷

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ নিজ দেশে থাকা পরিবারের খরচ বহন করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করেছে৷

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সময়ে প্রবাসীরা নিজ নিজ দেশে যে পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন তা গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের তুলনায় ৭.৩% বেশি। 

প্রতিবেদনে অনুমান করা বলা হয়, "টানা দ্বিতীয় বছরের মতো চীন ব্যতীত বিশ্বের অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ সেই দেশগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং অফিসিয়াল উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) প্রদানের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যাবে৷"

রেমিট্যান্সের পরিমাণ বৃদ্ধিতে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে – সংকটের সময়ে অভিবাসীরা নিজেদের পরিবারের পাশে থাকার তীব্র সংকল্প৷ 

তাছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনার সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য দেওয়া সহায়তা কার্যক্রম, বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রণোদনা এবং কর্মসংস্থান সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রদানকৃত অর্থ সহায়তার ফলে এসকল দেশে থাকা প্রবাসীদের জন্য নিজ দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো সহজতর ছিল৷ 

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে মন্দায় নানা খাতে অর্থনৈতিক প্রবাহ কমে এসেছিল৷ কিছুটা কমলেও এ খাতে অর্থাৎ রেমিট্যান্স খাতের প্রবাহ মাত্র ১.৭% নিচে নেমে এসেছিল। 

মূলত "উন্নত দেশগুলিতে মহামারির সময়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তা পরিকল্পনার কারণে অভিবাসীরা নিজ দেশে অর্থ প্রেরণ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।"

মাগরেব অঞ্চলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে শতকরা ১৫ ভাগ 

রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিতে পৃথিবীর প্রায় সবগুলো অঞ্চল কম বেশি প্রভাবিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ এক লাফে ৯.৭% বেড়ে ৬২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।  

ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ফ্রান্স এবং স্পেনেের অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরে আসায় এই বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। 

অর্থ প্রেরণের এই ঊর্ধ্বগতি আফ্রিকার দেশ মিশরে বেড়েছে ১২.৬% বা ৩৩ বিলিয়ন ডলার৷ তাছাড়া উত্তর আফ্রিকার আরেক দেশ মরক্কোতে ২৫% বা ৯.৩ বিলিয়ন ডলার জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে। 

অবশ্য অভিবাসীদের জন্য মরোক্কো একটি গুরুত্বপূর্ন ট্রানজিট জোন হওয়ার কারণে দেশটিতে অর্থ আসা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।  

সার্বিকভাবে ইউরো জোনে অর্থনীতি প্রাণ ফিরে পাওয়ায় সমগ্র মাগরেব অঞ্চলে অর্থাৎ আলজেরিয়া, মরক্কো এবং টিউনিসিয়া রেমিট্যান্স প্রেরণের হার গতবছরের তুলনায় ১৫.২% বেড়েছে।

সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতে ২০২১ সালে রেমিট্যান্স প্রেরণ আবারো পুরনো রুপে ফিরে এসেছে। এসব দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৬.২% বেড়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছছে। 

এই মহাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশ নাইজেরিয়া, যেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার পাঠানো হয়েছে। আর এ সময়ের মধ্যে ৪.৫ বিলিয়ন এবং ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের প্রবৃদ্ধি নিয়ে পরের অবস্থানে আছে যথাক্রমে ঘানা এবং কেনিয়া। ২.৬ বিলিয়ন ডলার নিয়ে ঠিক পরের অবস্থানেই আছে সেনেগাল ।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অর্থনীতির একটি বড় অংশই আসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে৷ 


 করোনা মহামারী জনিত লকডাউন চলাকালে অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্টানগুলোতে ছিল না তেমন ভিড়। ছবি: পিকচার এলায়েন্স
করোনা মহামারী জনিত লকডাউন চলাকালে অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্টানগুলোতে ছিল না তেমন ভিড়। ছবি: পিকচার এলায়েন্স


এ রেমিট্যান্স সরাসরি দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে। এই বছর, জিডিপির শতাংশ হিসাবে সর্বাধিক পরিমাণ রেমিট্যান্স আসা দেশগুলি হল গাম্বিয়া (৩৩.৮%), লেসোথো (২৩.৫%), কেপ ভার্দে (১৫.৬%), কমোরোস (১২.৩%), লাইবেরিয়া (১০%) এবং সেনেগাল (৯.৫%)।

এসব দেশে অভিবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ কখনও কখনও বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়।  

আফ্রিকান ইনস্টিটিউট অফ রেমিট্যান্স-এর (এআইআর) তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ৬৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি আফ্রিকান দেশগুলোতে দাতাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উন্নয়ন সহায়তার দ্বিগুণেরও বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ায় বেড়েছে শতকরা ৮ ভাগ

অন্যান্য মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো দক্ষিণ এশিয়াও সবসময় অভিবাসীদের প্রেরিত অর্থের বড় একটি অঞ্চল। 

২০২০ সালের এ অঞ্চলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার ছিল ৫.২%৷ চলতি বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮%।

একক দেশ হিসেবে বিশ্বে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ ভারত। জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কোভিড ১৯ মহামারির কারণে প্রভাবের কারণে দেশটিতে প্রবাসীরা ব্যাপক অর্থ প্রেরণ করেছেন বলে ব্যাখা করা হয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে। 

২০২১ সালে ভারতে প্রবাসীদের অর্থ আসার পরিমাণ ৮৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণ করা হয়েছে৷ 

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ে ভারেতের পরে ৩৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে দ্বিতীয় পাকিস্তান এবং ২৩ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। 

অবশ্য জিডিপিতে শতাংশ হিসেবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসা দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের অবস্থান শীর্ষে। দেশটির জিডিপির ২৫% আসে রেমিট্যান্স থেকে। 



আরআর/এমএইউ


 

অন্যান্য প্রতিবেদন