১৮ নভেম্বর বেলারুশ-পোলিশ সীমান্তে ধরে হেঁটে যাচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি দল৷ ছবি:বেল্ট হ্যান্ডআউট
১৮ নভেম্বর বেলারুশ-পোলিশ সীমান্তে ধরে হেঁটে যাচ্ছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি দল৷ ছবি:বেল্ট হ্যান্ডআউট

বেলারুশ সীমান্তে আটকে পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশই ইরাকের কুর্দি জনগোষ্ঠী৷ যে কোনো উপায়ে তারা পৌঁছাতে চান ইউরোপে৷ এমনকি ব্যর্থ হয়ে যারা ফিরে গেছেন বা ইরাকে ক্যাম্পে বসবাস করছেন, তারাও সুযোগ পেলে ঝুঁকিপূর্ণ এই পথ পাড়ি দিতে চান৷

জঙ্গলের হিম ঠাণ্ডায় পুরো তিন সপ্তাহ স্ত্রী ও মাকে নিয়ে বেলারুশ-পোল্যান্ড সীমান্তে কাটিয়েছেন হোসেন খদর৷ শেষ পর্যন্ত উপায়ন্তর না পেয়ে ফিরে গেছেন পুরনো আবাসে, উচ্ছেদ হওয়া ইয়াজিদিদের জন্য তৈরি ইরাকি ক্যাম্প স্কয়ার ওয়ানে৷

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ক্ষুধার যন্ত্রণা আর বিপদজনক ও নিষ্ফল যাত্রার পরও খদর দমে যাচ্ছেন না৷ পরিবার নিয়ে আবারও স্বপ্ন পূরণের পথে যাত্রা করতে চান এই ভাগ্যাহত ইরাকি৷

খদরের মতো ৪০০ ইরাকি পরিবার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর শুক্রবার একটি ফ্লাইটে বেলারুশ থেকে ফেরত এসেছেন নিজ দেশে৷ তাদের বেশিরভাগই কুর্দি৷ এত কষ্টের এই যাত্রায় তাদের খরচ কিন্তু কম হয়নি৷ ভিসা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যয়ে খদরের গেছে ১০ হাজার ডলার যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে আট লাখ টাকার বেশি৷ ‘‘পোল্যান্ড সীমান্তে আমরা কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রমের চেষ্টা করি৷ সেখানে সেন্সর লাগানো ছিল যা পোলিশ পুলিশের কাছে সংকেত পাঠিয়ে দেয়৷ এরমধ্যে তারা চলে আসে এবং আমাদের সীমান্ত অতিক্রমে বাধা দেয়,’’ ইরাকি কুর্দিস্তানের ক্যাম্পে বসে কষ্টকর এই যাত্রার কথা বলছিলেন খদর৷

খদর ও তার পরিবার সীমান্তবর্তী জঙ্গলে মোট ২০ দিন ছিলেন৷ অনাহারে, খাবার পানির সংকটে আর ঠাণ্ডায় কেটেছে তাদের দিনরাত্রি৷ ৩৬ বছর বয়সি খদর জানান, তাদের সঙ্গে থাকা সাতজন ইয়াজিদি জার্মানি পৌঁছে গেছেন৷ কিন্তু বাতের সমস্যায় ভোগা মা প্রয়োজনীয় পথ পড়ি দিতে না পারায় সীমান্ত পেরুতে পারেননি তারা৷ ‘‘আমরা বিলাসী কিছু চাই না, আমরা কেবল আমাদের কষ্টকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছি,’’ বলেন ৫৭ বছর বয়সি খদরের মা ইনাম৷

গ্রীষ্মের খরতাপ আর শীতের বৃষ্টিতে গত সাত বছর ধরে তারা বাস করে যাচ্ছেন একটি তাঁবুতে৷ খদর যে কাজ পেয়েছেন বেঁচে থাকার জন্য তা-ই করেছেন৷ মানুষের নষ্ট ফোন ঠিক করে কিছু টাকা রোজগার করেছিলেন৷ ইরাক ছাড়তে গিয়ে এখন হয়েছেন ঋণগ্রস্থ, এমনকি স্ত্রী ও মায়ের স্বর্ণও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে৷ তবে এই দফা ব্যর্থ হলেও ঠিক দমে যাচ্ছেন না খদর৷

তাঁবুতে ফোমের গদিতে বসে নিজের ও ইরাকের সংখ্যালঘু ইয়াজিদিদের জীবনে ঘটে যাওয়া বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণ করছিলেন তিনি৷ ধর্মবিরোধী অ্যাখ্যা দিয়ে তাদের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালিয়েছে ইসলামিক স্টেট৷ মাত্র ২০ বছর বয়সে ইরাক-ইরান যুদ্ধে স্বামী হারিয়ে বিধবা হন ইনাম৷ একাই সন্তানকে বড় করেন৷ ২০০৫ ও ২০০৭ সালে অলৌকিকভাবে দুইটি হামলা থেকে বেঁচে যান৷ ২০১৪ সালে সিনজারে আইএসরা প্রবেশের পর পালিয়ে বেড়ানো কিংবা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আবার ফিরে আসা, এসব এখনও জ্বলজ্বলে তার স্মৃতিতে৷ জানালেন, ‘‘টাকা জোগাড় করতে পারলেই আবার বেরিয়ে পড়ব৷ অভিবাসনের ভাবনা আমি ত্যাগ করব না৷’’

কিন্তু পরেরবার খদর এই পথে আর যেতে চান না৷ কারণ হিসেবে বললেন, ‘‘আগামী পাঁচ বছর বেলারুশ প্রবেশে আমাদের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে৷’’

বেলারুশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অভিবাসীদের ইউরোপে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া সীমান্তে ছেড়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করছে ইইউ৷ এই অভিযোগ অস্বীকার করে অভিবাসীদের না নেওয়ায় উল্টো ইউরোপের সমালোচনা করছে লুকাশেঙ্কো সরকার৷ ইইউ-বেলারুশের এই টানাপোড়েনে গত গ্রীষ্ম থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তে ১১ অভিবাসী মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পোলিশ গণাধ্যমম৷ এখনও হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে আছেন, যাদের বেশিরভাগ ইরাকি কুর্দি৷ এরপরও আধা স্বায়ত্ত্বশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী আরবিলের মানুষ ইউরোপ যেতে মরিয়া৷ ‘‘আমি যদি সুযোগ পাই কালকের জন্য বসে থাকব না, আজকেই রওনা দিব,’’ মুচির কাজ করা ২৫ বছর বয়সি রামাদান হামাদ অকপটে বললেন তার মনের কথা৷ এছাড়া যে তাদের আর উপায়ও নেই! ‘‘আমাদের কোন ভবিষ্যত নেই এখানে৷ আর অর্থনৈতিক পরিস্থিত আরো কঠিন হয়ে উঠছে৷ আমি জানি অবৈধ উপায়ে অভিবাসনে মৃত্যু আশঙ্কা ৯০ শতাংশ৷ কিন্তু আমি যদি অন্তত পৌঁছাতে পারি তাহলে এমন এক সমাজে বাস করব যেখানে প্রত্যেককে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়৷’’

এই অভিবাসী সংকট কুর্দিস্তানের বাস্তব পরিস্থিতিকে সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন ফ্রেঞ্চ সেন্টার ফর রিসার্চ অন ইরাকের পরিচালক আদেল বাকওয়ান৷ অর্থনীতির পাশাপাশি তাদের এই অবস্থার জন্য ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তৈরি হওয়া ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জিহাদীদের পুনরুত্থানের ভয় এবং কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে তুরস্কের সংঘাতকে দায়ী বলে মনে করেন তিনি৷

ইরাকের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেও কুর্দিস্তানকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে৷ সেখানে পাঁচ তারকা হোটেল, বেসরকারি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে৷ বাকওয়ান বলেন এর সুবিধা পাবে কেবল সমাজের একটি শ্রেণী৷ ‘‘একজন তরুণ কুর্দি অবকাশে যেতে পারবে না, বাড়ি কিনতে পারবে না, ইংরেজিতে তার পড়াশোনা সম্পন্ন করতে বেসরকারি স্কুলে যেতে পারবে না। এমনকি সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের মতো চাকরিও খুঁজে পাবে না৷’’ বাকওয়ানের এই কথাতেই বোঝা যায় কেন ইরাকের কুর্দিরা নিজেদের জন্মভূমি ছাড়তে এখন এতটা মরিয়া৷

এফএস/এসএস (এএফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন