(ফাইল ছবি)চ্যানেলে ২৭ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি:রয়টার্স
(ফাইল ছবি)চ্যানেলে ২৭ অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবি:রয়টার্স

বুধবার কালে উপকূলে ২৭ অভিবাসীর সাগরে সলিল সমাধির পর ইউরোপজুড়ে অভিবাসন ইস্যুতে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। ফরাসি ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই মর্মান্তিক ঘটনার পিছনে মানব পাচারকারীদের দায়ী করেছে। অভিবাসন ও অধিকার সংস্থাগুলো উপকূল অঞ্চলকে সামরিকীকরণের দায়ে সরকারগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছে।

২৪ নভেম্বর বুধবার চ্যানেলে নৌকাডুবিতে নারী ও শিশুসহ ২৭ জন অভিবাসীর মৃত্যুতে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য উভয় দেশের অভিবাসী, সংস্থা ও গনমাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে শোকের আবহ। কিন্তু এ ঘটনায় দায় কার? সেটি নিয়ে চলছে দুই দেশের সরকার ও অভিবাসন সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া। 

ইউরোপীয় মন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠকে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল মাক্রঁ জোর দিয়ে বলেছেন, "ফ্রান্স কখনো চ্যানেলকে কবরস্থানে পরিণত হতে দেবে না।" এ ঘটনাকে ট্র্যাজেডি হিসাবে বর্ণনা করে এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ীদের যেকোন মূল্যে খুঁজে বের করতে সবকিছু করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি"।

বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে পাচারকারী সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

"মর্মাহত এবং গভীরভাবে দুঃখিত": বরিস জনসন 

বুধবার সন্ধ্যায় কালেতে জরুরি সফর করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরা দারমানা এ ঘটনার জন্য পাচারকারীরা দায়ী করে বলেন, তারা মাত্র কয়েক হাজার বিনিময়ে মানুষের জীবন বিপন্ন করে দেয়।



বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ফরাসি রেডিও আরটিএলকে বলেন, পাচারকারীরা ভয়ংকর অপরাধী। এছাড়া তিনি উক্ত ভয়ংকর ট্র্যাজেডি মোকাবেলা করা সকল পুলিশ, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্মীদের কাজের প্রশংসা করেছেন। 

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জঁ কাস্টেক্স বৃহস্পতিবার সকালে নৌকা ডুবে যাওয়ার পরবর্তী চ্যানেলে অভিবাসী পারাপার বিষয়ক নিয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেন। 

চ্যানেলের অপর প্রান্তে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তিনি "মর্মাহত এবং গভীরভাবে দুঃখিত"। বরিস জনসন স্কাই নিউজকে আশ্বস্ত করেছেন, অবৈধ পারাপারকে নিরুৎসাহিত করতে তিনি ফ্রান্সের সাথে আরও পদক্ষেপ নিবেন। চান। ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্রের মতে, একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে, ব্রিটিশ সরকার প্রধান এবং এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ "এই মারাত্মক পারাপারগুলি প্রতিরোধে যৌথ প্রচেষ্টা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন"।

মৃতদেহ পরিবহনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কালে 

অভিবাসন সমিতি ও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কর্তৃপক্ষের দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের বহুল পরিচিত সংস্থা ইতুপিয়া৫৬ এর মতে, "চ্যানেলে মৃত্যুর জন প্রথম দায়ী পাচারকারী নয়। বরং এর জন্য দায়ী ফ্রান্স ও ইউরোপে আশ্রয় অভ্যর্থনা ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ করা রাজনৈতিক নেতারা। যদি পারাপারের জন্য নিরাপদ ও মুক্ত পথ থাকত আজকে অভিবাসীরা এরকম বিপদজনক পথ বেছে নিত না এবং এসব পাচারকারীদের নেটওয়ার্কও থাকত না"।

চিকিৎসা সেবা দানকারী এনজিও ‘মেদসাঁ দু মোন্দ’ টুইটারে জানিয়েছে, "যুক্তরাজ্যে পৌছতেঁ নিরাপদ এবং আইনি পথের অনুপস্থিতি এবং অভিবাসীদের প্রতিরোধের ব্যর্থ নীতি চ্যানেল পারাপারকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পাচাকারীরা শক্তিশালী হচ্ছে। চ্যানেলের উভয় দিকে সরকারগুলোর এসব নীতি বিধ্বংসী।"



আরেক অভিবাসন সংস্থা ‘সেকুর ক্যাথলিক’ তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, "কোনও ট্র্যাজেডি হওয়ার সাথে সাথেই, রাজনীতিবিদরা তাদের নীতির পরিণতি ও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলা বন্ধ করতে সোজা পাচারকারীদের অভিযুক্ত করেন।"

বুধবার সন্ধ্যায় নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারানোদের প্রতি সমবেদনা জানাতে কালে বন্দরের কাছে মোমবাতি নিয়ে প্রায় পঞ্চাশজন লোক জড়ো হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত অধিকার কর্মীরা জানান, "কালেতে অভিবাসীদের সাথে অমানবিক এবং অবমাননাকর আচরণ করা হয়। কালেতে মানবাধিকার ভঙুর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিহত অভিবাসীদের স্মরণে কালে, ডানকের্ক, প্যারিস এবং লন্ডনে বেশ কয়েকটি স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অভিবাসন ও অধিকার সংস্থাগুলো। 

 অভিবাসন প্রত্যাশীদের অস্থায়ী বসবাসের স্থান ধ্বংস, প্রায় প্রতিদিন উচ্ছেদ অভিযান, পুলিশি হয়রানি, পানি এবং খাবার পেতে অসুবিধা সহ নান কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কালে শহরের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। 

সর্বশেষ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শহর কর্তৃপক্ষের আচরণকে "অপমানজনক অনুশীলন" হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

"ছেড়া তাঁবু? এটাও কি পাচারকারীদের দোষ?"


অনেক ফরাসি রাজনীতিবিদও বুধবার সন্ধ্যায় ও বৃহস্পতিবার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মারিন লো পেন বলেছেন, "অভিবাসন বিষয়ে শিথিলতা ক্রমাগত এসব ট্র্যাজেডির দিকে নিয়ে যায়"। তিনি বলেন, "পাচারকারীদের নেটওয়ার্কগুলো ধ্বংসের ব্যাপারে আমাদের দুর্বলতা মানুষকে এসব ট্র্যাজেডির দিকে নিয়ে যায়"।

অন্যদিকে ফ্রান্সের বাম রাজনীতিবিদেরা ফ্রান্সে শরণার্থীদের আরও ভালোভাবে অভ্যর্থনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। লা ফ্রন্সঁ আনসুমিস দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি এবং উত্তর ফ্রান্স থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আদ্রিয়া কাতেন, 'অভিবাসন নিয়ে বিতর্কে যুক্ত না হয়ে সবার আগে মানবতাকে স্থান দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একই দলের আরেক সংসদ সদস্য এরিক কোকরেল বলেন, শরণার্থীদের জন্য সঠিক অভ্যর্থনা করার মতো ভালো মানের অভ্যর্থনা কেন্দ্র খুলতে অনুরোধ করেছেন। তিনি যোগ করেন, অনেক অভিবাসী আসলে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে এরকম ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে আমাদেরকে লড়াই করতে হবে, এটি অবাস্তব"।

ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সেক্রেটারি ফাবিয়া রাসেল বলেছেন, "আমরা আর কতদিন মেনে নেব যে আমাদের চোখের সামনে পুরুষ, নারী ও শিশুরা মারা যাবে? ফ্রান্স আর নিজের অস্তিত্বে থাকে যখন এটি ভ্রাতৃত্ব এবং মানবিক প্রতিক্রিয়ার জন্য কাজ করে না।"



সবুজ দলের অন্যতম প্রধান নেতা জুলিয়া বাইও বলেন, "ট্র্যাজেডি থামাতে একটি উপযুক্ত অভ্যর্থনা নীতির প্রয়োজন ছিল।"



উত্তর ফ্রান্সের সবুজ দলের সংসদ সদস্য করিমা দেলি এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, "ভোরবেলা ৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শরণার্থীদের তাঁবুগুলিকে ছুরি দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয়, প্রতি দুই দিন পর পর শরণার্থী ও আশ্রয় প্রার্থীদের বহিষ্কার, তাদের জিনিসপত্রের ক্ষতি করা হয়। এসব ও কি পাচারকারীদের দোষ?"


এমএইউ/এসএস








 

অন্যান্য প্রতিবেদন