প্যারিসের উত্তরে্র একটি রিং রোড়ের নিচে অবস্থিত টানেলে অনিয়মিত বিদেশি কিশোরেরা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
প্যারিসের উত্তরে্র একটি রিং রোড়ের নিচে অবস্থিত টানেলে অনিয়মিত বিদেশি কিশোরেরা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

আমাদু, আদামা বা আলাসান সহ এরকম শত বিদেশি অভিভাবকহীন নাবালক উন্নত জীবনের আশায় ফ্রান্সে এসেছেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক আবেদন খারিজ করায় তারা সরকার থেকে আর কোনো সাহায্য পায়নি। দুই মাস বা তারও বেশি সময় ধরে তারা প্যারিসের একটি রিং রোডের নিচে অবস্থিত টানেলে অসহনীয় অবস্থায় বসবাস করছে। শুনুন তাদের দুর্দশার গল্প।

প্রচন্ড ঠান্ডায় বারবার নিজের জায়গা পরিবর্তন করে যাচ্ছেন আমাদু। ঠাণ্ডায় যেন শরীর অসাড় হয়ে না যায় সে কারণে বারবার নড়াচড়া করার কথা জানান তিনি। তাঁবু থেকে কয়েক মিটার দূরে একটি চেয়ারে নিয়ে বসে থাকা ১৬ বছর বয়েসি আমাদুর একটিই ইচ্ছা: নাবালক হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া।

ইনফোমাইগ্রেন্টসের সাথে সাক্ষাৎকারের শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, "আমি আইভোরিয়ান, আমি ২৭ জানুয়ারি ২০০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছি। তিনি যোগ করেন, "ফরাসি রাষ্ট্র মনে করে আমি মিথ্যা বলছি। আমি জানি না তারা এটা কেন ভাবছে... তারা আমাকে বিশ্বাস করতে চায় না। আমার বয়স আসলেই ১৬ বছর, আমি শপথ করে বলছি।"

প্যারিসের রিং রোডের নিচের "টানেলে" অস্থায়ী শিবিরে বসবাসকারী শতাধিক যুবকের মতো আমাদুও অপ্রাপ্তবয়স্ক মর্যাদা পেতে সফল হননি। তার আবেদন ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারপর থেকেই তিনি টানেলের অস্থায়ী শিবিরে তার তাঁবু, মোবাইল ফোন, পানি ও তার ছয়টি কম্বল নিয়ে বসবাস করছেন "যাতে ঠাণ্ডায় তার মৃত্যু না হয়"। তিনি বর্তমানে আপিল আবেদন করে কিশোর আদালতের বিচারকের সাথে সাক্ষাতের অপেক্ষা করছেন।



অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে কাজ করা ইতুপিয়া৫৬ সংস্থার তথ্য অনুসারে, এই টানেল বা সুড়ঙ্গে এখন ১২০ থেকে ১৩০ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্করা বাস করছে। এই অস্থায়ী শিবিরের চারপাশে বিভিন্ন কাপড়ে আচ্ছাদিত দুটি দেয়াল এবং আড়াই মিটার উঁচু একটি ছাদ রয়েছে। অবশ্য সেখানে নাবালকদের সাথে মুষ্টিমেয় কিছু প্রাপ্তবয়স্ক সঙ্গিহীন পুরুষও বাস করেন।

"আমি আমার মা, বাবার সাথে মিথ্যা বলি"

আমাদুর পাশেই একের পর এক সিগারেট ফুকেঁ যাচ্ছেন আদামা, আরেক আইভোরিয়ান নাবালক,তিনিও প্রথম পর্যায়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিচারকের সাথে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন।

আদামা জানান, "আমি আসলে সবকিছু বুঝতে পারি না। আমি আমার কাগজপত্র ঠিকঠাক উপস্থাপন করেছি, কিন্তু তারা বলেছে, 'আপনার আবেদন বিচারক দেখবেন'। আসলে কবে এই শুনানি হবে সেটিও জানিনা।"


টানেলের ভেতর তীব্র শীতের কষ্ট কঠিন দিন পার করছেন আইভোরিয়ান কিশোর 'আমাদু'। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
টানেলের ভেতর তীব্র শীতের কষ্ট কঠিন দিন পার করছেন আইভোরিয়ান কিশোর 'আমাদু'। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


এসব কিশোরদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতাগুলি কখনও কখনও একে অপর থেকে বেশ আলাদা হয়ে থাকে। তবে, নির্বাসিত জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা এসব কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এছাড়া, ফ্রান্সের প্রশাসনিক কাজগুলোর পদ্ধতি বেশ জটিল।

যখন একজন যুবক নাবালকের মর্যাদা পায় না, তখন তার কাছে কিশোর আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ এবং তরুণরা বেশ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাদের শুনানির অপেক্ষায় থাকে। এই সময়ে সরকার থেকে তাদেরকে কোনো আবাসন দেয়া হয় না।

আমাদু, আদামা এবং আরও অনেকের জন্য জীবনযাত্রার অবস্থা কল্পনার চেয়েও অনেক কঠিন। তারা ভেবেছিল তারা ফ্রান্সে আসা মাত্র সুরক্ষা এবং আরামদায়ক জীবন পাবে। তাদের সাথে থাকা অন্য একজন কিশোর বলেন, "আমি কল্পনাও করিনি যে আমার জীবন এখানেই শেষ হবে। আমি ভেবেছিলাম আমি ভালভাবে বাঁচব। আমি তাঁবুতে ফিরে প্রতিদিন আমার বাবা-মায়ের সাথে মিথ্যা কথা বলি।

অন্য একজন তরুণ জানান, "আমি আমার মাকে বলি আমি ভালো আছি এবং আমি একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকি।"



এখানে সুড়ঙ্গের মধ্যে কোনো শৌচালয় নেই, এক ফোঁটা পানির ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা নিয়ম করে আমাদের খাবার দিয়ে যান। আদামা বলেন, "এখানকার বাসিন্দারা অনেক ভালো এবং অমায়িক"।

তিনি আরও যোগ করেন, "দেখুন, একটু আগে এক প্যাকেট খাবার দিয়ে গেছেন একজন।" এরকম বলেই স্থানীয় একজন লোকের রেখে যাওয়া বাগেট (বিশেষ ফরাসি রুটি ) ভর্তি একটি ব্যাগ দেখালেন।

"আমরা এখান থেকে কবে যাচ্ছি?"

অভিবাসীদের সহায়তা সংস্থাগুলির মধ্যে একটি হলো ইতুপিয়া৫৬, যারা প্রতিদিন এই তরুণদের কম্বল এবং বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করে, কারণ সুড়ঙ্গের পরিস্থিতি খুব খারাপ ও অবাসযোগ্য।

ইতুপিয়া৫৬ সংস্থার নাবালক বিষয়ক সমন্বয়ক কেরিল থেওরিয়া টানেলে থাকা তরুণদের বিষয়ে বলেন, "এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারণ তারা শিশু, অথচ তাদের কোনো অধিকার নেই, বাসস্থান নেই, আর্থিক সাহায্য নেই।" 

এর মধ্যে একজন এসে কেরিলকে বলেন, "আমি অসুস্থ। মনে হয় আমার ঠাণ্ডা লেগেছে। আমার ভালো লাগছে না।" তারপর একটি মোটা কাপড় এবং টুপিতে নাক ও মুখ ঢেকে রাখা আরেকজন ইতুপিয়ার এক স্বেচ্ছাসেবককে জিজ্ঞেস করেন, "আমরা এখান থেকে কবে যাচ্ছি?" 

কেরিল থেওরিয়ার কাছে সবসময় এসব প্রশ্নের উত্তর থাকে না, তবে তিনি তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি তাদের জানান যে তারা প্রতিদিন সরকারের কাছে আশ্রয়ের আবেদন চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তরুণরা এসব আশ্বাসে বিভ্রান্ত। আমাদু বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে আছি।"

"এটি একটি কেলেঙ্কারিও, কারণ প্যারিসের প্রেফেকচুর এবং নগর কর্তৃপক্ষকে এই পরিস্থিতির ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে এক প্রকার দৈনিক সতর্কতা দেওয়া হয় কিন্তু কিছুই ঘটছে না", জানান কেরিল থেওরিয়া। তিনি যোগ করেন, "তারা নাবালক, বেদনাদায়কভাবে নির্বাসিত এবং তারা এখন যেখানে আছে সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারা উপায় না পেয়ে রাস্তায় ঘুমাতে বাধ্য হয়েছে।"

তবে এভাবে আর কতদিন? অন্তত হীমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা নেমে আসার সাথে সাথে হলেও এসব কিশোরদের জন্য সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা হবে বলে আশা করছে অভিবাসন সংস্থাগুলো। 


এমএইউ/এসএস




 

অন্যান্য প্রতিবেদন