কালে উপকূলে নৌকাডুবিতে নিহতেদের মধ্যে পরিচয় মেলা প্রথম ব্যক্তি ২৪ বছর বয়সী ইরাকি তরুণী মরিয়ম। ছবি: ফ্রান্স২৪
কালে উপকূলে নৌকাডুবিতে নিহতেদের মধ্যে পরিচয় মেলা প্রথম ব্যক্তি ২৪ বছর বয়সী ইরাকি তরুণী মরিয়ম। ছবি: ফ্রান্স২৪

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকাডুবিতে নিহত ২৭জনের মধ্যে পরিচয় পাওয়া গেছে একজনের। তিনি উত্তর ইরাকের ২৪ বছর-বয়েসি কুর্দি নারী মরিয়ম। চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে থাকা তার হবু স্বামীর কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করছিলেন মরিয়ম।

নিহত তরুণীর পুরো নাম মরিয়ম নূরী মোহাম্মদ আমিন। হবু স্বামীর কাছে পৌঁছে নতুন জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন এই ইরাকি তরুণী। তিনি মূলত যুক্তরাজ্যে বসবাসরত তার হবু স্বামীর কাছে যেতে উত্তর ইরাক ছেড়েছিলেন। ইরাক থেকে দীর্ঘ দিন দূরে থাকা এই দুই প্রেমিক-প্রেমিকা আবারো এক হওয়ার প্রতিশ্রুতি বদ্ধ ছিলেন।

২৪ নভেম্বর কালে উপকূলে নৌকাডুবির পরে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ মিডিয়া নিহত কুর্দি তরুণীর আত্মীয়দের সাথে দেখা করেছেন। নিহতের স্বজনেরা ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে মরিয়মের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এই ইরাকি তরুণী নিহত অভিবাসীর মধ্যে শনাক্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি যেখানে তার সাথে আরও ১৭জন পুরুষ, ছয়জন নারী, একজন গর্ভবতী নারী ও তিন কিশোর এই দুর্ঘটনায় মারা যায়।

'হবু স্বামীর কাছে যাবার ভিসা ছিল না'

হবু স্বামীর কাছে যুক্তরাজ্যে যেতে ব্রিটিশ দূতাবাসে একাধিক আবেদন সত্ত্বেও ভিসা না পাওয়ায় আর কোনো উপায় না দেখে মরিয়ম যুক্তরাজ্যে যেতে এই পথ বেছে নেয় বলে জানায় তার আত্মীয়রা। 

বিকল্প পথ হিসেবে তিনি প্রথমে তুরস্ক হয়ে একটি ইটালিয়ান ভিসা নিয়ে ইটালি, তারপর জার্মানি এবং সবশেষে ফ্রান্সে আসেন। ফ্রান্সের উত্তরের ইংলিশ চ্যানেলের সীমান্তবর্তী উপকূল থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শেষ মুহূর্তে নৌকায় ওঠার আগে তার হবু স্বামীকে মোবাইল ফোন মারফৎ তা জানান।

অর্ধেক পথে বন্ধ হয়ে যায় জিপিএস

নৌকাযোগে চ্যানেল পাড়ি দেয়ার আগে মরিয়ম তার হবু স্বামীর কাছে ইন্টারনেটের সাহায্যে তার ফোনের জিপিএস বা সার্বক্ষনিক অবস্থান সংকেত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এতে করে তার হবু স্বামী পুরো যাত্রার অগ্রগতির উপর নজর রাখতে পারেন। 

ভ্রমণের এক পর্যায়ে ভালো মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া গেলে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্ন্যাপচ্যাটে বেশ কিছু বার্তা আদান-প্রদান করেছিলেন। তার স্বামী এক প্রকার সরাসরি মরিয়মের মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছিলেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, যখন নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে মরিয়ম সাথে সাথে সেটি তাকে বার্তায় জানিয়েছিলেন।

মরিয়ম তাকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, নৌকায় থাকা যাত্রীরা ভেতরে জমা পানি বের করার চেষ্টা করছে। মরিয়ম তার হবু স্বামীকে এই বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন যে, তাদেরকে শীঘ্রই উদ্ধার করা হবে, কর্তৃপক্ষের নৌকা আসছে। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে কালে উপকূল এবং যুক্তরাজ্যের কেন্ট উপকূলের অর্ধেক পথে মরিয়মের ফোনের জিপিএস বার্তা দেয়া বন্ধ করে দেয়।


ইরাকের ইরবিলে ২৮ নভেম্বর আয়োজিত একটি পারিবারিক শোক সভায় শোকে বিহ্বল নিহত মরিয়মের মা। ছবি: রয়টার্স
ইরাকের ইরবিলে ২৮ নভেম্বর আয়োজিত একটি পারিবারিক শোক সভায় শোকে বিহ্বল নিহত মরিয়মের মা। ছবি: রয়টার্স


মরিয়মের চাচাতো ভাই ক্রমাঞ্জ ইজ্জাত দারগালি স্কাই নিউজকে বলেন, "তার মা এবং বাবা সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত।" তার পরিবার এখন চায় তার দেহাবশেষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইরাকে প্রত্যাবর্তন করা হোক। ফরাসি টিভি বিএফএম জানায়, “ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষও অবশ্য মরদেহ পরিবারকে তুলে দিতে চায়।” এছাড়া বিএফএম ইরাকে নিহতের একজন চাচা এবং চাচাতো ভাইয়ের সাথেও কথা বলে, যেখানে তার পরিবার থাকে।

যুক্তরাজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করে মারা যাওয়া অভিবাসীদের মৃতদেহ তাদের পরিবারের কাছে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রশাসনিক এবং আর্থিক সহায়তার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে দাবি করে আসছে কালেতে থাকা অভিবাসীদের সহায়তার সমিতিগুলি। বৃহস্পতিবার নৌকাডুবিতে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছিল শতাধিক অধিবাসী। 

অভিবাসন সংস্থা সিকুর ক্যাথলিকের স্থানীয় সদস্য নাথানেল কালিও ফ্রান্স২৪ কে বলেন, "বেশিরভাগ সময়ই মরদেহ পাঠানোর কার্যক্রম বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনুদান জোগাড় করে করা হয়।”

তবে মরিয়মের ক্ষেত্রে ঘটনাটি একটু ভিন্ন, কারণ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার পরিবার দ্রুত বুঝতে পেরেছিল যে সে নৌকাডুবিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল। ঘটনায় ডুবে যাওয়া অন্যদের জন্য শনাক্তকরণ বেশ কঠিন। ময়নাতদন্ত এবং শনাক্তকরণের জন্য ডুবে যাওয়া ২৭ অভিবাসীর মৃতদেহ ইতিমধ্যে উত্তর ফ্রান্সের লিল শহরের ফরেনসিক ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরিত করা হয়েছে, ।


এমএইউ/এসএস






 

অন্যান্য প্রতিবেদন