পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে কয়েক মাস ধরে আটকে আছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ ছবি: লেওনিড শেগলোভ/রয়টার্স
পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে কয়েক মাস ধরে আটকে আছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ ছবি: লেওনিড শেগলোভ/রয়টার্স

সিরিয়ার আনাস কানান ও তার বন্ধু মোইন আল-হাদি বেলারুশ সীমান্তে আটকে আছেন৷ ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশে তারা বেলারুশ সীমান্তে এসেছিলেন৷ এসেছিলেন হয়তো বলা যাবে না কারণ তাদেরকে নিয়ে এসেছিল মানবপাচারকারীরা৷ বলা হয়েছিল, বেলারুশ থেকে পোল্যান্ড হয়ে তারা খুব সহজেই জার্মানিতে পৌঁছাতে পারবেন৷

তুরস্ক থেকে একটি ট্রাকে করে তাদেরকে বেলারুশ সীমান্তে নিয়ে আসা হয়৷ দালালরা তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি তিন হাজার ইউরো অর্থাৎ প্রায় তিন লাখ করে টাকা নেয়৷ বেলারুশ সীমান্তে এসে তারা দেখতে পায় যে, সীমান্ত বন্ধ৷

প্রচণ্ড শীতে সীমান্তের পাশে তাবুতে দিন পার করতে থাকে দুজন৷ তাদের আশা সীমান্তে পেরিয়ে তারা পোল্যান্ড হয়ে জার্মানিতে প্রবেশ করতে পারবেন৷

এক সপ্তাহ পর পাচারকারীরা তাদেরকে পোল্যান্ডের একটি গ্রামে নিয়ে আসে৷ আর সেখানে তারা পুলিশের হাতে আটক হয়ে পুনরায় বেলারুশ ফেরত আসেন৷    

শুধু কানান আর হাদিই নন৷ দালালদের মিথ্যা আশ্বাস পেয়ে এমন অনেকেই বেলারুশ সীমান্তে আটকে আছে৷ প্রথমে তারা জানত না যে দালাররা তাদের মিথ্যা বলছে। কিন্তু সীমান্তে আসার পর দেখা গেলো যে তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতিই মিথ্যা। 

 কানান আর আল-হাদি এখনো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পোল্যান্ডে পৌঁছাবার চেষ্টা করছেন৷ পোলান্ডের ওরলা শহরে তাদের সাথে দেখা হয় রয়টার্সের এই প্রতিবেদকের৷ কোনোক্রমে সীমান্ত পাড়ি দিতে সক্ষম হলেও হাঁটতে পারছেন না আল-হাদি৷ কারণ প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তার পা ফুলে গেছে৷ ‘‘টাকাগুলো হাওয়ায় উড়ে গেল’’, রয়টার্সের প্রতিবেদককে বলেন তিনি৷

এদিকে তার ছোটবেলার বন্ধু কানান বলেন, ‘‘সবই মিথ্যা৷ আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলা দেওয়া হবে৷ এর এরপর তারা বলবে, ‘মারা যাও কিংবা আর যাই হোক, তোমাদের দায়িত্ব আমাদের নয়৷’ তাদের শুধু টাকা দরকার৷’’

পোল্যান্ডে প্রবেশের একটু পরেই তারা আবারো সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়ল৷ জানা গেছে, তাদেরকে আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে৷

পরিস্থিতি সম্বন্ধে পোল্যান্ডের একটি দাতব্য সংস্থার কর্মী মারিসিয়া লোনকিভিক বলেন, ‘‘অনেকেই বুঝতে পারছেন যে তাদের সাথে প্রতারণা হচ্ছে৷ তাদের ফাঁদে ঠেলে দেওয়া হয়েছে৷’’

সীমান্ত পাড়ি দেওয়া কঠিন

ইউরোপে প্রবেশের উদ্দেশে সিরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানের হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী বেলারুশ সীমান্তে জড়ো হয়েছেন৷ সেখানে কয়েক মাস ধরে অবস্থান করছেন তারা৷

কীসের আশায় এই সীমান্তে প্রচণ্ড শীতে তারা কষ্ট করছেন? প্রতিবেশী পোল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সীমান্ত পাড়ি দিতে উৎসাহিত করছে৷ বেলারুশের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রতিশোধ নিতেই এমনটা করছেন লুকাশেঙ্কো, দাবি ইউরোপীয় ইউনিয়নের৷   

পরিস্থিতি ঠেকাতে বিশ হাজার সীমান্তরক্ষী মোতায়েন করেছে পোল্যান্ড৷ আর সেখানে অবস্থানরত অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে বেলারুশ তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্দেশে দেশটির রাজধানী মিনস্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷  

সীমান্তরক্ষীদের তৎপরতা বাড়ার ফলে পোল্যান্ডে প্রবেশ অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে৷ আর এই সুযোগে পাচারকারীরা সীমান্তে পাড়ি দেওয়ার খরচও বাড়িয়ে দিয়েছে৷ প্রতি জনের কাছ থেকে তারা এখন প্রায় সাত লাখ টাকা নিচ্ছে বলে জানা গেছে৷

এদিকে পাচারকারীদের আটক করতে তৎপর হয়ে উঠেছে পোল্যান্ড পুলিশ৷ গত আগস্ট মাস থেকে এখন পর্যন্ত জার্মানি, সুইডেন, ইউক্রেন এবং জর্জিয়ার প্রায় ৩১৪জন পাচারকারীকে আটক করেছে তারা৷  

ফেরার সুযোগ নেই

সিরিয়া থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশী খালেদ জেইন আল দ্বীন বলেন, ‘‘সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে৷ নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে৷ প্রতিদিনই সীমান্তে রক্ষীদের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে৷’’

খালেদ জানান, তিনি এবং তার পরিবার ইতিমধ্যে দালালদেরকে প্রায় আঠারো লাখ টাকা দিয়েছেন৷ শর্ত ছিল, তাদেরকে একটি নিরাপদ বাসস্থানে নিয়ে আসা হবে৷ সেসময় যেন পুলিশের হাতে ধরা না পড়ে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে৷ কিন্তু তার সবই ছিল মিথ্যা৷ দালালরা পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে৷  

পোল্যান্ডের এক সেনাসদস্য জানান, নিরাপত্তা বাড়ানোর ফলে সীমান্ত অতিক্রম কঠিন হয়ে পড়েছে৷

দাতব্য সংস্থার কর্মী মারিসিয়া লোনকিভিক বলেন, প্রচণ্ড শীত এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি স্বত্বেও অভিবাসনপ্রত্যাশীরা সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা থামাতে চায় না৷ তাদের অনেকেই বাসাবাড়ি বিক্রি করে দালালদের টাকা দিয়েছে এবং ঋণের জালে আটকে গেছে৷ তাই আর ফেরার উপায় নেই৷

আরআর/এসএএস (রয়টার্স)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন