চ্যানেলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় টোকে চুক্তি। ছবি: মেহেদী শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস
চ্যানেলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০০৩ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় টোকে চুক্তি। ছবি: মেহেদী শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস

ফ্রান্সের কালে উপকূলে গত বুধবার ২৭ অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনার পর ইংলিশ চ্যানেলে অবৈধ অভিবাসন ও ‘টোকে চুক্তি’ নিয়ে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ২০০৩ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করতে করা হলেও এই চুক্তির ফলে ব্রিটিশ সীমান্তের চাপ কালেতে সরে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে ফরাসি রাজনীতিবিদদের।

গত ২৪ নভেম্বর ইংলিশ চ্যানেলে নৌকাডুবির ফলে ২৭ জন অভিবাসীর মৃত্যুর পর থেকেই ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।

ইংলিশ চ্যানেলে কেন নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ নেই? কেন অভিবাসীরা উত্তর ফ্রান্সের কালেতে বারবার আটকা পড়ছে? কেন এসব ঘটনা বারবার ইংরেজ উপকূলের বন্দর শহর ডোভারে না ঘটে চ্যানেলের ফরাসি উপকূলে ঘটছে? আলোচনায় উঠে আসছে এসব প্রশ্ন। টোকে চুক্তি নিয়ে ভেতর বাহির তুলে ধরা হলো ইনফোমাইগ্রেন্টসের পাঠকদের জন্য। 

ডোভার থেকে সীমান্ত সরে কালেতে

২০০২ সালের শেষ দিকে উত্তর ফ্রান্সের সাঙ্গাতে ফরাসি আশ্রয় কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার পরপরই ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে লো টোকে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যাতে করে অনিয়মিত বিদেশিদের চ্যানেল অতিক্রম করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধা দেওয়া যায়।

২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ২৫ তম ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ সম্মেলনের সময় এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছিল। এই চুক্তির ফলে চ্যানেলে অভিবাসন সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় উত্তর ফ্রান্সের কালে শহর। যেটি ইতিপূর্বে ছিল ইংরেজ উপকূলের বন্দর শহর ডোভার। চুক্তির কারণে "ব্রিটিশ সীমান্ত সরিয়ে" কালেতে নিয়ে আসা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বহু ফরাসি রাজনীতিবিদ।

ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ফ্রান্স সীমান্তে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসাররা যাচাই করেন এবং একইভাবে যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে যেতে ইচ্ছুক ভ্রমণকারীদের ব্রিটিশ মাটিতেই যাচাই করে ফরাসি পুলিশ। যেমন প্যারিসের গার-দু-নর্দ ট্রেন স্টেশনে রয়েছে ব্রিটিশ পুলিশের দল এবং লন্ডনের সেন্ট-প্যানক্রাস স্টেশনে আছে ফরাসি পুলিশের বিশেষ শাখা যারা উভয় দেশে প্রবেশকারীদের যাচাই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে৷

এছাড়া চ্যানেল এবং উত্তর সাগরের বন্দরগুলিতে "জুক্সটাপোজে" নামে পরিচিত যৌথ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ অফিসও স্থাপন করা হয়। ফরাসি বন্দর কালে, বুলোন-সুর-মের, ডানকের্ক এবং ইংরেজ বন্দর ডোভারে এসব কার্যালয় স্থাপন করা হয়।

টোকে চুক্তির আওতায় প্যারিস অভিবাসীদের অবৈধভাবে চ্যানেল পার হওয়ার অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেসব অভিবাসীদের ব্রিটিশ অঞ্চলে প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে তাদেরকে অবশ্যই ফ্রান্সে থাকতে হবে। তাই তাদের জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য কোনো বৈধ অভিবাসন পথ আর খোলা থাকে না।

ফ্রান্সে ব্যাপকভাবে নিন্দিত এই চুক্তি

বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২০ সালে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে টোকে চুক্তি। চুক্তির আওতায় যুক্তরাজ্য থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিপরীতে চ্যানেল টানেলের চারপাশসহ তার সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেয় ফ্রান্স। যার ফলশ্রুতিতে এই বছর উপকূলে ফরাসি পুলিশ বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির অর্থায়নের জন্য যুক্তরাজ্য ফ্রান্সকে ৬২ দশমিক সাত মিলিয়ন ইউরো (২০২১-২০২২ বছরের জন্য) প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়।

তবে, ২০১০ সাল থেকে সিরিয়া যুদ্ধ ও বিশ্বের বিভিন্ন অংশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পর থেকেই টোকে চুক্তির ব্যাপকভাবে নিন্দা করা হচ্ছে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে অনেক অভিবাসী ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর আশায় ফ্রান্সে ছুটে আসেন এবং কালে অঞ্চলে আটকা পড়েন।

এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর থেকেই অনেক ফরাসি রাজনীতিবিদ বিশ্বাস করেন যে এটি শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যকে সুবিধা দিচ্ছে। ন্যাশনাল কনসালটেটিভ কমিশন অন হিউম্যান রাইটস (সিএনসিডিএইচ) ২০১৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানায়, এটি "ফ্রান্সকে ব্রিটিশ অভিবাসন নীতির পুলিশ শাখায় পরিণত করেছে"।

ব্রেক্সিট পরবর্তী প্রভাব

৩১শে জানুয়ারী ২০২০ তারিখে -এ যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে এই চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের একটি অস্পষ্টতা শুরু হয়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরা দারমানা এ বছর অক্টোবরে বলেছিলেন, “চুক্তির ব্যাপারে লন্ডনের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন কারণ এই চুক্তিটি ফ্রান্সকে অভিবাসনের বিষয়ে একটি জায়গায় আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করে। এটি একটি বড় সমস্যা৷"

২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারাভিযানের সময় এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ঘোষণা করেছিলেন, তিনি "টোকে চুক্তিকে আবার আলোচনার টেবিলে আনতে চান, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের জন্য শর্তগুলি পুনরায় আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ"। 

১৮ বছরের কম বয়সিদেরক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের নীতি সত্যিই খুব কঠোর। জানুয়ারী ২০২১-এ, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন মন্ত্রী ক্রিস ফিলপ ডাবস সংশোধনীকে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করে দেন, যা ২০১৬ সালের মার্চে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অধিকারের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

ডেভিড ক্যামেরন সরকারের নেয়া এই নীতিটি ছিল ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে ইচ্ছুক অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এক ধরনের "অতিদ্রুত এবং সরলীকৃত" নীতি। অভিবাসীদের মধ্যে কেউ কেউ কালে থেকে, কেউ কেউ গ্রিস থেকে ডাবস সংশোধনীর আওতায় উপকৃত হতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এই সুযোগ এখন শেষ। এক বছর ধরে যুক্তরাজ্য অভিভাবকহীন নাবালকদের জন্য আইনি অভিবাসনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।


এমএইউ/এআই 


 

অন্যান্য প্রতিবেদন