গত এপ্রিলে ক্যানারি দ্বীপের কাছে এই নৌকাটি পাওয়া যায় যেটির সবযাত্রী মৃত্যুবরণ করেছিলেন | ছবি: এএফপি
গত এপ্রিলে ক্যানারি দ্বীপের কাছে এই নৌকাটি পাওয়া যায় যেটির সবযাত্রী মৃত্যুবরণ করেছিলেন | ছবি: এএফপি

অনিশ্চিত ভবিষ্যত আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে করোনা মহামারি৷ তাই হাজার হাজার আফ্রিকান ঝুঁকিপূর্ণ পথে সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে চাচ্ছেন স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে৷ ইউরোপে প্রবেশের এমন চেষ্টা করতে গিয়ে ঠিক কতজন মারা গেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি৷

চলতি মাসের শুরুতে সাগরে একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার আগে সেটিতে থাকা ৮২ অভিবাসীকে উদ্ধারে সক্ষম হয়েছিল সেনেগালের সেনা বাহিনী৷ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে এমন সুখবর সবসময় আসে না৷  

সেই নৌকাটি গাম্বিয়া থেকে সম্ভববত ক্যানারির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল৷ এই যাত্রার পরিণতি প্রায়শই মর্মান্তিক হয়৷ স্পেনের দ্বীপটিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতি সপ্তাহেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে৷ 

স্পেন ‘মেরিটাইম রেসকিউ’-র চেয়ারম্যান ইসমাইল ফ্যুরিও সম্প্রতি জানিয়েছেন যে সমুদ্রে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে আরো জনশক্তি প্রয়োজন৷ ‘ক্রনিকাস দ্য লান্টারোতে’ পত্রিকাতে তিনি বলেন, ‘‘এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয় যে আমাদের পক্ষে সবাইকে সাগরে পাঠানো সম্ভব হয় না, এবং মানুষ ডুবে যায়৷’’    

প্রাণঘাতী আটলান্টিক 

জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএম-এর পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, আগের তুলনায় ২০২০ এবং ২০২১ সালে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর চেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা কাঠের নৌকায় এই যাত্রা শুরু করেন, যেগুলো উত্তাল সমুদ্রে ব্যবহারের উপযুক্ত নয়৷ 

আটলান্টিকে ডুবে মরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি | ছবি: এএফপি
আটলান্টিকে ডুবে মরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি | ছবি: এএফপি

২০২০ সালে ২৩ হাজার মানুষ ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছেন৷ আর এবছর এখন অবধি সংখ্যাটি ১৯ হাজার৷ আইওএম জানাচ্ছে, ২০২০ সালে সাগর পাড়ি দিয়ে দ্বীপটিতে পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৮৪৯জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন৷ চলতি বছর সংখ্যাটি অন্তত ৯০৯ জন৷ 

স্পেনে কর্মরত আইওএম কর্মকর্তা ওসামা আল বারুদি ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, অনেক ঘটনার তথ্যপ্রমাণ না থাকায় সেগুলো পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা যায়নি৷ 

‘‘যেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা হচ্ছে এটি সর্বনিম্ন সংখ্যা৷ অর্থাৎ আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে যেগুলোর কোনো তথ্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের কাছে না থাকায় উল্লেখ করা যায়নি,’’ বলেন তিনি৷ 

অভিবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা মানবাধিকার সংগঠন ‘কামিনানদো ফ্রন্টেরাস’ যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে তাতে প্রাণহানির সংখ্যা আইওএম এর দ্বিগুণ৷ ঠিক কতজন মানুষ এভাবে সাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছেন তা অবশ্য কেউই নিশ্চিত করতে পারেনি৷ 

‘‘এরকম যাত্রা একেবারেই নিরাপদ নয়, বরং খুবই বিপজ্জনক — সেটা যেখানেই হোক না কেন,’’ ডয়চে ভেলেকে বলেন সমুদ্র বিষয়ক গবেষক ইওহানেস কার্স্টেনসেন৷

 ‘‘ছোট নৌকায় করে সাগর পাড়ি দেয়ার বিপদগুলো হচ্ছে বাতাস, স্রোত এবং আঞ্চলিকভাবে গড়ে ওঠা ঢেউ৷ এগুলো পুরো যাত্রাকে ভয়াবহ করে তোলে৷ মোটের উপর এসব নৌকা অতিরিক্তি বোঝাই করা হয়৷ ফলে ভূমধ্যসাগর হোক কিংবা আটলান্টিক, এধরনের যাত্রায় সব সময় বিপর্যয় ঘটে,’’ বলেন তিনি৷ 

তবুও চেষ্টা থেমে নেই  

 বিপজ্জনক এই পথ পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া মানুষদের একজন মোবাই বাবাকার৷ ২০০৩ সালে ১৩ বছর বয়সে আরো ১৩৮ জনের সঙ্গে একটি নৌকায় করে সেনেগালত্যাগ করেছিলেন তিনি৷ সেটা ছিল ক্যানারি দ্বীপের দিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রার শুরুর দিকের কথা৷

ইনফোমাইগ্রেন্টসের পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘‘যাত্রার শুরুর আগে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না যে আমরা নিজেদের কোন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে যাচ্ছি৷ দশদিন বিস্তৃত আমাদের সেই যাত্রার অষ্টম দিনে আমরা অন্য একটি নৌকায় কিছু মানুষের মরদেহ দেখতে পাই৷ তারা আমাদের এক সপ্তাহ আগে যাত্রা শুরু করেছিল৷’’

আফ্রিকা মহাদেশকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে আলাদা করে রেখেছে একশো কিলোমিটারের বেশি চওড়া সমুদ্র৷ মরক্কো উপকূল থেকে দ্বীপটির দূরত্ব সবচেয়ে কম৷ 

‘‘আফ্রিকার মরক্কো থেকে ইউরোপের ক্যানারি অবধি যাত্রা অবশ্যই বিপজ্জনক৷ তবে প্রতিবেশি সেনেগাল, গাম্বিয়া কিংবা মৌরিটানিয়া থেকে সেটা কম ঝুঁকিপূর্ণ,’’ বলেন আল বারুদি৷ 

তার কাছে উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে, আটলান্টিকে নিহতদের মধ্যে নারী এবং শিশুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, যা এই ইঙ্গিত দেয় যে অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিবার ভিটেমাটি ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছে৷ অতীতে শুধু পুরুষরা এধরনের ঝুঁকি বেশি নিতেন৷ 

জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণের পাশাপাশি করোনা লকডাউনে স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির ও ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ইউরোপমুখী স্রোত বাড়ছে বলে মনে করে এই কর্মকর্তা৷

প্রতিবেদন: ফিলিপ সান্ডনার/এআই

 

অন্যান্য প্রতিবেদন