ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছানো এক অভিবাসী৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছানো এক অভিবাসী৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স

ইংলিশ চ্যানেলে থামছে না লাশের বহর৷ শুক্রবার উদ্ধার হয়েছে আরো একটি মরদেহ৷ চ্যানেল পাড়ি দেয়া অভিবাসীদের সাথে আচরণে সমালোচিত ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ দুই কর্তৃপক্ষই৷

১০ ডিসেম্বর ইংলিশ চ্যানেলের ফ্রেঞ্চ উপকূলে জেলেদের জালে আরো একটি মরদেহ উঠে আসে৷ সেটি কোনো অভিবাসীর কীনা তা অবশ্য এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি কর্তৃপক্ষ৷ রাষ্ট্রের উপ তদন্তকারী কর্মকর্তা ফিলিপ সাবাতিয়ার বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছেন, মরদেহের শরীরে কোন নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে কীনা এবং মৃত্যুর কারণ ময়না তদন্তের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করছেন তারা৷ পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে৷

এর আগে ২৪ নভেম্বর ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসীদের বহনকারী একটি নৌকাডুবির ঘটনায় ২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে৷ এদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ, সাতজন নারী ও একটি শিশু ছিল৷ এই ঘটনার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ বলেছেন, তিনি চ্যানেলকে ‘সমাধিতে পরিণত’ হতে দিবেন না৷

অভিযোগ দুই পক্ষের বিরুদ্ধে

চ্যানেলে একের পর এক অভিবাসীদের মৃত্যু নিয়ে মাক্রোঁ সরকারেরও কড়া সমালোচনা করেছেন অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি কিছু সংস্থা৷ ক্যাম্প উচ্ছেদসহ অভিবাসীদের প্রতি সরকারের যে বিরূপ নীতি তার কারণেই এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছে ইউটোপিয়া ৫৬ নামের একটি এনজিও৷ 

সংস্থাটির একজন সমন্বয়ক আনা রিচেল ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ফ্র্যাঞ্চ সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণেই অভিবাসীরা চ্যানেল পাড়ি দেয়ার ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং প্রাণ হারাচ্ছেন৷

ইংলিশ চ্যানেলে মৃত্যু নিয়ে শুধু ফরাসি কর্তৃপক্ষই নয়, সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছে ব্রিটিশ সরকারও৷ বিশেষ করে ২৪ নভেম্বরের দুর্ঘটনার জন্য দেশটির কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন অনেকে৷ এই ঘটনায় বেঁচে যাওয়াদের একজন ২১ বছর বয়সি মোহাম্মদ শেকাহ আহমান কুর্দিশ অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, বিপদে পড়ার পর নৌকায় থাকা অভিবাসীরা ব্রিটিশ ও ফরাসি দুই কর্তৃপক্ষের কাছেই সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন৷ কিন্তু তাদেরকে সমূদ্র থেকে দ্রুত উদ্ধার না করে দুই পক্ষই একে অন্যের দিকে দায় ঠেলেছে৷ 

শুধু এই ঘটনায় নয়, ইংলিশ চ্যানেলে বিপদে পড়া অভিবাসীদের সঙ্গে এমন আচরণের আরো অভিযোগ রয়েছে৷ গত মাসে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অন্য অভিবাসীরাও এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন৷ একটি দল জানিয়েছে, তাদের ধারণা অনুযায়ী ইংলিশ জলসীমানায় থাকার পরও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদেরকে বলেছে ফরাসিদের কাছে সহায়তা চাইতে৷ অভিবাসীদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে ফরাসিরা তাদের উদ্ধার করেছে৷ 

২০ নভেম্বর ইংলিশ চ্যানেল বিপদে পড়ার পর একটি অভিবাসী দল ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য চায়৷ গার্ডিয়ানকে এই তাদের একজন বলেন, ‘‘আমাদের জিপিএস অবস্থান জানতে না চেয়েই ইংলিশরা বলল ফরাসিদের ফোন করতে৷ আমরা ফরাসিদের ফোন করি, তারা আমাদের জিপিএস জানতে চায় এবং জানায় আমরা যুক্তরাজ্যের জলসীমায়৷ আমাদেরকে উদ্ধার করতে আসেনি কেউ- না ইংরেজরা, না ফরাসিরা৷ এরমধ্যে আমরা ফরাসি সংস্থা ইউটোপিয়া ৫৬-কে ফোন করি৷ তারা ফরাসি জরুরি সেবায় ফোন করলে আমাদেরকে উদ্ধার করে কালেতে ফিরিয়ে নেয়া হয়৷’’

সীমানা কোথায়?

অভিবাসীদের একটি দলের বিপদে পড়ে ২০ নভেম্বর বার্তা পাঠিয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছে ইউটোপিয়া ৫৬৷ তবে ব্রিটেনের সমুদ্র ও উপকূলরক্ষা এজেন্সি তাদের বিরুদ্ধে করা অভিবাসীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন৷ গার্ডিয়ানকে তাদের একজন মুখপাত্র বলেন, প্রতিদিন ইংলিশ চ্যানেল থেকে তারা ৯০টিরও বেশি সতর্কবার্তা পান৷ এর প্রত্যেকটিরই জবাব দেয়া হয় ও যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়৷ কোন ক্ষেত্রেই তারা ফরাসি কর্তৃপক্ষকে ফোন করতে বলেন না বলে দাবি করেন তিনি৷

কিন্তু ব্রিটিশ আর ফরাসি জলসীমানা কোথায় সেটি খুঁজে পাওয়া দুরূহ একটি ব্যাপার৷ মানচিত্রেও তা দেখানো নেই৷ তবে মোবাইলের সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে গেলে যেকেউ নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি ভিন্ন দেশের জলসীমানায় প্রবেশ করেছেন৷ 

শুধু ইংলিশ চ্যানেলে নয় যুক্তরাজ্যে পৌঁছার পর অভিবাসীদের সঙ্গে যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ যে আচরণ করছে তার সমালোচনাও হচ্ছে৷ বিরোধী দল লেবার পার্টির সংসদ সদস্য পিটার কাইল এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সরব৷ সম্প্রতি দেশটির সরকারের কাছে গর্ভবতী এক অভিবাসীর চিকিৎসা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি দিয়েছেন৷ ব্রাইটন ও হোভেতে এই সংসদের নির্বাচিত এলাকাতে একটি হোটেলে তাকে রাখা হয়েছিল৷ এর আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের প্রতি সরকারের মনোভাব, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের থাকার ব্যবস্থা নিয়েও তিনি একাধিক চিঠি লিখেছেন সরকারের কাছে৷ 

এফএস/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন