(ফাইল ছবি)  এক হাজারেরও বেশি অভিবাসী মাল্টার সাফি এবং মার্সা নামক দুই আটক কেন্দ্রে বন্দী রয়েছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
(ফাইল ছবি) এক হাজারেরও বেশি অভিবাসী মাল্টার সাফি এবং মার্সা নামক দুই আটক কেন্দ্রে বন্দী রয়েছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

মাল্টায় অভিবাসীদের পদ্ধতিগত আটকের বিষয়ে একটি যৌথ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা জিসতি ও মিগ্রইউরোপ। এই দুই সংস্থার মতে, দ্বীপে আগত অভিবাসীদের নির্বিচারে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে আটকে রাখা আন্তর্জাতিক এবং ইউরোপীয় আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী দলের অন্যতম সদস্য এবং অভিবাসন সংস্থা লা সিমাদের আইনি পরামর্শক জোয়ে দুতো’র ইনফোমাইগ্রেন্টস বলেন, ‘‘তিনি জিসতি ও মিগ্রইউরোপ পরিচালিত তদন্ত প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত মাল্টায় অবস্থিত বিভিন্ন আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।’’  

তিনি তার পর্যবেক্ষণে দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে মত দেন। তার মতে, এর দায় সম্পূর্ণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর বর্তায়।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আপনি যখন ২০২০ সালে মাল্টিজ ডিটেনশন সেন্টার পরিদর্শনের সময় আপনি কী ধরনের অমানবিক এবং অপমানজনক আচরণ দেখেছিলেন?

জোয়ে দুতো: ‘‘মাল্টায় আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নির্বিচারে আটক করা হয় । কখনো কখনো মূল ভূমিতে পোঁছানোর আগেও গ্রেফতার করা হয়৷ যেমন, ২০২০ সালের বসন্তে সাগরে অভিবাসীদের আটকে রাখতে বিভিন্ন জাহাজ ব্যবহার করা হয়েছিল।

আটককেন্দ্রগুলির শর্তগুলো বেশ ভয়ংকর। তার উপর রয়েছে, স্বাস্থ্যবিধির অভাব, অতিরিক্ত ভিড়, প্রায়ই ডাক্তারের অনুপস্থিতি।  

উদাহরণস্বরূপ, সাফি নামক আটককেন্দ্রে আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে পেয়েছিলাম যিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে কিডনিতে পাথরের সমস্যায় ভুগছিরেন৷ আমরা তার এই সমস্যা তুলে ধরা সত্ত্বেও কোন ডাক্তারকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এছাড়া সেখানে খাঁচার মতো বক্সে অভিবাসীদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা এসব দুর্বল এবং আক্রান্ত লোকদের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষিত নয়।

এই ডিটেনশন সেন্টারে স্বাস্থ্যসেবা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারের সুবিধা হ্রাস করা মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দ্বীপরাষ্ট্রটিতে অভিবাসীদের যতটা সম্ভব মূল শহর থেকে দূরে রাখার প্রবণতা দৃশ্যমান। যেসব স্থানে আটক কেন্দ্রগুলি অবস্থিত সেখানে খুব কম সংখ্যক স্থানীয় অধিবাসী রয়েছে৷’’

ইনফোমাইগ্রেন্টস: কোভিড -১৯ কি প্রশাসনকে এই আটককেন্দ্রগুলিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা উন্নত করতে বাধ্য করেছে?

জোয়ে দুতো: কোভিড ১৯ সম্পর্কিত পদক্ষেপগুলো শুধুমাত্র মাল্টার নাগরিকদের প্রতিরক্ষার জন্য নেয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ নামমাত্র বলেছিল, ‘‘তাদের দ্বীপে আসা অভিবাসীদের রক্ষা করতে হবে।’’ কিন্তু আটককেন্দ্রগুলিতে দেখা গেছে নিরাপত্তারক্ষীরা কেউ মাস্ক পরেন না। সেই মুহুর্তে কোভিডের সংক্রমণ ছিল ব্যাপক। যার ফলে শোচনীয় স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

কিছু নতুন পদক্ষেপ অভিবাসীদের আরও বেশি ক্ষতি করেছে৷ উদাহরণস্বরূপ, উন্মুক্ত কেন্দ্রগুলিতে এজেন্সি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অফ এসাইলাম সিকারসের মাধ্যমে সাহায্যের সময়কাল সংক্ষিপ্ত করা। সাধারনত লোকেরা সেখানে বিভিন্ন সহায়তার জন্য এক বছর যেতে পারত। কিন্তু কোভিড সংকটের সময় এটি ছয় মাসে কমিয়ে আনা হয়েছিল। এ অবস্থায় অনেক লোককে মহামারির মধ্যে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হতে হয়েছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: এই পদ্ধতিগত আটক রাখার মডেলটি কি ইউরোপীয় দেশগুলির সাথে স্বাক্ষরিত স্থানান্তর চুক্তির উপর নির্ভর করে? ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি ব্ল্যাকমেইলের শিকার বা সক্রিয়ভাবে জড়িত?

জোয়ে দুতো: আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, মাল্টায় আটক সংক্রান্ত আইনগুলো মূলত এসএআর (সমুদ্র অনুসন্ধান এবং রেসকিউ) জোনের ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত। তবে এ বিষয়টি ২০২০ সাল থেকে আরও তীব্র হয়েছে। মাল্টা তাদের ভূখন্ডে অভিবাসীদের আসার বিপরীতে ইইউকে একটি শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। যদি অভিবাসীদের অন্য কোন ইউরোপীয় দেশে স্থানান্তরের কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া না হয়, সেক্ষেত্রে অভিবাসীদের সমুদ্র থেকে উদ্ধারে মাল্টা কর্তৃপক্ষ কোনো সহায়তা প্রদান করবে না। 

মূলত মাল্টা এইভাবে তার দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এজন্য সমুদ্রআইন এবং ডাবলিন বিধিমালা দায়ী।

মাল্টা কর্তৃপক্ষের মূল আতঙ্কের কারণ হচ্ছে, দেশটি অভিবাসী আগমনের 'হটস্পট' হয়ে উঠে কিনা। সম্ভাব্য এই সমস্যা থেকে বাঁচতে, দ্বীপটি লিবিয়ার মতো একটি 'বাস স্টপ' অর্থাৎ ট্রানজিট দেশ হতে চাইছে। তাদের যুক্তি, অভিবাপ্রত্যাশীরা মাল্টায় থাকতে চান না। প্রকৃতপক্ষে অন্য দেশে স্থানান্তর প্রক্রিয়া তরান্বিত করতেই এই কৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়। আসলে মাল্টায় আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীতদের জন্য কোন কাঠামো নেই। এখানে প্রায়শই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। অভিবাসীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কোন প্রকার প্রশাসনিক মর্যাদা ছাড়াই দিনের পর দিন আটকে থাকে।

আরও পড়ুন>>মালটা সরকারের বিরুদ্ধে আশ্রয় প্রার্থীদের মামলা

তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, বহিঃসীমান্ত তালাবদ্ধ করা প্রকৃতপক্ষে একটি ইউরোপীয় কৌশল। আমরা গ্রিক দ্বীপ বা ইটালিতেও একই পদ্ধতি দেখতে পাই।

সংক্ষেপে, ইইউ মাল্টাকে বর্ডার গার্ডের অবস্থানে রেখেছে এবং মাল্টাও এই অবস্থান মানিয়ে নিচ্ছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: সেখানে এনজিও, আইনজীবী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের অবস্থান কেমন?

জোয়ে দুতো: সমস্যাটি হল মাল্টায় আশ্রয় ও অভিবাসন আইনজীবীদের কাজ অত্যন্ত সীমিত৷ ২০২০ সালে পুরো দ্বীপে মাত্র চার বা পাঁচজন আইনজীবী এই বিষয়গুলিতে বিভিন্ন সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন৷ যদিও সেখানে প্রতি বছর দুই থেকে তিন হাজার লোক আসত। 

এনজিও ও আইনজীবীরা কৌশলে মানুষকে আটক অবস্থা থেকে বের করার চেষ্টা করছে। একটি সার্বিক কৌশল নির্ধারণ করা আসলে খুবই কঠিন। ২০২০ সালের বসন্তে সমুদ্রে ৪০০ জনেরও বেশি লোককে নির্বিচারে আটক করার পরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে মাল্টার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল৷ কিন্তু এরকম বড় মামলা পরিচালনা করা কঠিন। কারণ আইনজীবী এবং সংস্থাগুলোর জনবল এবং আর্থিক সংকট রয়েছে। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: নতুন ইউরোপীয় আশ্রয় ও অভিবাসন প্যাক্টের কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে?

জোয়ে দুতো: "ব্যক্তিগতভাবে, আমি কোন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। সীমান্তে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এতটাই বিপর্যয়কর যে, ইইউকে সেখানে নির্বিচারে বন্দিত্বকে স্বাভাবিক করতে বাধ্য করছে। এটি এমন একটি মডেল যা ইইউ অন্যান্য দেশেও প্রসারিত করতে চায়।

মাল্টায় বাংলাদেশ, টিউনিসিয়া, লিবিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসিভাষী দেশসমূহ থেকে আসা অনেক মানুষ রয়েছে। কিন্তু দ্বীপরাষ্ট্রটির কূটনৈতিক তৎপরতা খুব সীমিত। যার ফলে এসব তৃতীয় দেশগুলিতে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো তাদের জন্য বেশ কঠিন। সে কারণে মাল্টা সরকার ইউরোপীয় কাঠামো থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আগ্রহী। 



এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন