ইটালির ক্যালাব্রিয়া উপকূলে আগত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: পিকচার এলায়েন্স
ইটালির ক্যালাব্রিয়া উপকূলে আগত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: পিকচার এলায়েন্স

চলতি বছরের শুরু থেকে প্রায় ৯,৭০০ অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালির ক্যালাব্রিয়ায় এসেছে৷ ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৫০০ জন। বর্তমানে, সমুদ্রপথে ইটালিতে পৌঁছানো ছয়জনের মধ্যে একজন ক্যালাব্রিয়া রুট হয়ে আসেন।

লিবিয়া বা টিউনিসিয়া থেকে যাত্রা করে মধ্য-ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইটালীয় দ্বীপ ল্যাম্পেদুসা, সিসিলি অথবা মালাটাসহ ইউরোপীয় উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন অভিবাসীরা৷ অনেক অভিভাসী তুর্কি উপকূল থেকেও যাত্রা শুরু করেন৷ এজিয়ান সাগর অতিক্রম করে তার গ্রিক দ্বীপগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। 

বর্তমানে অভিবাসীদের কাছে কম পরিচিত কিছু অভিবাসন রুট রয়েছে যেগুলি পাচারকারীরা কাজে লাগাতে চায়। ইটালির ‘ক্যালাব্রিয়ান রুট’ এর মধ্যে একটি। নতুন করে আলোচনায় আসা বিপদসংকুল এই পথে তুরস্ক থেকে অভিবাসীদের সরাসরি ইটালি উপকূলে নিয়ে আসে পাচারকারীরা।  


সংবাদ সংস্থা এপি নিউজের দেয়া তথ্য অনুসারে, ২০২১ সালে ক্যালাব্রিয়া হয়ে অভিবাসীদের আগমন চারগুণ বেড়েছে৷ সমুদ্রপথে ইটালিতে আসাদের মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ এই রুট হয়ে আসেন।  

নরকের উদ্দেশ্যে প্রথম শ্রেণীর ভ্রমণ

এই পথটি অনেক অভিবাসীর কাছে ফাস্ট ক্লাস বা ‘প্রথম শ্রেণীর’ ভ্রমণ হিসাবে পরিচিত। কারণ সমুদ্র পাড়ি দিতে ব্যবহৃত বেশিরভাগ নৌকাই পালতোলা৷ মানব পাচারকারীরা এজন্য প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় দশ হাজার ডলার এবং শিশুদের জন্য জনপ্রতি সাড়ে চার হাজার ডলার দাবি করে, যা বেশিরভাগ অভিবাসীদের পক্ষেই দেয়া কঠিন। বাস্তবে, এই ভ্রমন শেষ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর থাকে না।

১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে  ক্যালাব্রিয়া উপকূল থেকে উদ্ধারকৃত অভিবাসীরা। ছবি: পিকচার এলায়েন্স
১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে ক্যালাব্রিয়া উপকূল থেকে উদ্ধারকৃত অভিবাসীরা। ছবি: পিকচার এলায়েন্স


বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১০০ জনকে বেশ কয়েকদিন ধরে একটি নৌকার ডেকের নীচে আটকে রেখে লুকিয়ে রাখা হয়৷ সেখানে পানি শূন্যতার কারণে যাত্রীরা চিনি মেশানো সমুদ্রের জল পান করতে বাধ্য হন। 

আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা এক অভিবাসী বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, সমুদ্র পাড়ি দেয়া ছিল ‘‘তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা৷”

পাচারকারীদের কৌশল

এই নতুন রুটটি আফগানদের পাশাপাশি ইরাকি, ইরানি এবং কুর্দিরাও ব্যবহার করছে৷ তদন্তকারীরা মনে করেন, পালতোলা নৌকা শনাক্ত করা কর্তৃপক্ষের পক্ষে আরও কঠিন৷ কারণ সেগুলো সাধারণত চোরাকারবারীরা নিজেরাই চালিয়ে থাকে৷ সবশেষ শনাক্ত করা পাচারকারীদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ব্যক্তিদের অনেকে ইউক্রেনের নাগরিক। সাধারণত অভিবাসী বোঝাই পালতোলা নৌকা ইটালীয় উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে পাচারকারী ব্যক্তি নৌকাটি ফেলে দিয়ে দ্রুত জেট-স্কির সাহায্যে পালিয়ে যায়৷ এভাবে তারা উপকূলরক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়া থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে। 

ইটালীয় পুলিশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ইউক্রেনীয়কে গ্রেফতার করেছে৷ ক্যালাব্রিয়ার অঞ্চলের প্রসিকিউটর জিওভান্নি বোম্বারডিয়েরি বলেন, ‘‘এই রুটে অভিবাসী আগমন বৃদ্ধির মূল কারণ খুঁজতে আমাদেরকে পাচারকারীদের গ্রেফতারে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও গভীরে যেতে হবে৷’’

জিওভান্নি বোম্বারডিয়েরি জানান, “মানব পাচারকারীরা তাদের লাভের অংশ তুর্কিতে থাকা মাফিয়া এবং ইটালির ক্যালাব্রিয়ান অঞ্চলের মাফিয়া সংগঠন এনড্রাংঘেটার সাথে ভাগ করে নেয়।”

তুরস্ক হয়ে ইটালির  ক্যালাব্রিয়া পৌঁছানোর রাস্তা। ছবি:গুগল ম্যাপ
তুরস্ক হয়ে ইটালির ক্যালাব্রিয়া পৌঁছানোর রাস্তা। ছবি:গুগল ম্যাপ


জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) বলছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে৷ তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি ইটালিতে সমুদ্রপথে অভিবাসীদের আগমনের মোট সংখ্যা ৫৯,০০০ ছাড়িয়েছে৷ যেটি গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩২,০০০ জন৷

ইটালিতে নিযুক্ত ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি চিয়ারা কার্ডোলেটি বলেন, “বরাবরের ন্যায় আগত অভিবাসীদের মধ্যে পুরুষরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ পাশাপাশি বর্তমানে সব অভিবাসন রুটে আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার দেখতে পাচ্ছি, ক্যালাব্রিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়৷’’

২০২১ সালের শুরু থেকে প্রায় ৯,৭০০ জন ক্যালাব্রিয়ায় এসেছেন, যা গত বছর ছিল প্রায় ২,৫০০ জন৷ ক্যালাব্রিয়ান উপকূলের সর্বত্রই এখন চোরাকারবারীদের ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত নৌকা দেখতে পাওয়া যায়৷ 



এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন