জার্মানিতে যেসব পেশায় কর্মী ঘাটতি রয়েছে তার মধ্যে  নার্স ও সেবা খাত অন্যতম৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ
জার্মানিতে যেসব পেশায় কর্মী ঘাটতি রয়েছে তার মধ্যে নার্স ও সেবা খাত অন্যতম৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স/ডিপিএ

অভিবাসী বা শরণার্থী না থাকলে জার্মানির কিছু শ্রমখাত স্থবির হয়ে যেত৷ বিশেষ করে যেসব খাতে কর্মী সংকট রয়েছে সেগুলো অনেকটা টিকিয়ে রেখেছেন বিদেশিরাই৷ এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ বিভিন্ন খাতে কর্মী ঘাটতি পূরণে গবেষকেরা অভিবাসীদের জন্য নিয়ম কানুন আরো সহজ করার পরামর্শ দিয়েছেন৷

জার্মানির শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে অভিবাসী ও শরণার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছেন৷ তারা যে শুধু শিক্ষানবিশি কাজ করছেন তা নয়, বরং ঘাটতি আছে এমন অনেক পেশায় কর্মী চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছেন৷ গত নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, কর্মী ঘাটতি আছে এমন পেশাগুলোতে ২০১৩ সালে অভিবাসীদের ১৯ দশমিক তিন শতাংশ এবং শরণার্থীদের ১৪ দশমিক নয় শতাংশ নিয়োজিত ছিলেন৷ যেখানে ২০১৯ সালে অভিবাসীদের প্রায় ৫০ ভাগই এই ধরনের পেশায় নিয়োজিত হন৷ শরণার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ শতাংশ৷ 

গবেষণাপত্রটির রচয়িতাদের একজন সারাহ পিয়েরেনক্যাম্পার৷ তিনি বলেন, ‘‘যেসব পেশা সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং যেখানে কর্মী ঘাটতি আছে, সেসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দক্ষ কর্মী ছাড়া আমরা কঠিন সমস্যায় পড়তাম৷’’

কারিগরি প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে যারা চাকরিতে নিযুক্ত হন তাদের ক্ষেত্রে কর্মী সংকট থাকা পেশাগুলোতে শরণার্থী ও অভিবাসী নিয়োগের হার আরো বেশি৷ ৬৬ শতাংশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শরণার্থী এই ধরনের পেশাগুলো বেছে নেন৷ এই হার জার্মানদের মধ্যে প্রায় ৫৮ ভাগ৷ 


জার্মানিতে ৯০ লাখ প্রাপ্ত বয়স্ক অভিবাসী

গবেষণাটি করিয়েছে ফ্রিডরিশ এবার্ট ফাইন্ডেশন৷ জার্মানির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের প্রধান অংশীদার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এসপিডির সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থাটি৷ গবেষণাটি পরিচালনা করেছে কলোন ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চ এর অধীন কমপিটেন্স সেন্টার ফর সিকিউরিং স্কিলড পার্সোনেল৷ 

গবেষণা অনুযায়ী, জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী রয়েছেন যাদের জার্মান নাগরিকত্ব নেই৷ অর্থাৎ অভিবাসী হিসেবে আসার পর যারা জার্মান নাগরিকত্ব পেয়েছেন এমন মানুষরা এই সংখ্যায় নেই৷ 

গবেষণায় শরণার্থী হিসেবে মূলত আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া, ইরাক, ইরান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সোমালিয়া ও সিরিয়া, এই শীর্ষ আট দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের বিবেচনায় নেয়া হয়েছে৷ 

পড়ুন: কর্মী চাহিদা মেটাতে বিপুল অভিবাসী প্রয়োজন ফিনল্যান্ডের

৭৫ শতাংশ বেড়েছ

নাগরিকদের বাইরে জার্মানিতে কর্মসংস্থানে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা চল্লিশ লাখ৷ ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেড়েছে৷ তাদের অর্ধেকই এমন সব পেশায় নিযুক্ত যেগুলোতে কাজ করতে দুই-তিন বছরের কারিগরি প্রশিক্ষণের দরকার পড়ে৷ 

গবেষণা অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ বেশি এমন খাতগুলোর মধ্যে গ্যাস্ট্রনোমি, পেশাদার গাড়ি চালক, ওয়্যারহাউজ বা পণ্যের গুদাম ব্যবস্থাপনা অন্যতম৷ যেমন, গত বছর গোটা জার্মানিতে সমস্ত পরিবহণ খাতে এক লাখ ৩২ হাজার বিদেশি চালক নিয়োজিত ছিলেন, যা মোট কর্মীর ২৩ শতাংশ৷ 

গ্যাস্ট্রোনোমি খাতে এই হার আরো বেশি৷ প্রতি দশজন শেফ, খাবার সরবরাহকারী কর্মীর তিনজন বিদেশি নাগরিক, যাদের জার্মান পাসপোর্ট নেই৷ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবায় এই অনুপাত প্রতি দশজনে একজন৷ 

অবশ্য রাজ্যভেদে বিভিন্ন পেশায় বিদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের হারের ভিন্নতা রয়েছে৷ বাডেন-ভুয়ের্টেমব্যার্গ রাজ্যে পেশাদার গাড়ি চালকের ৩৫ শতাংশ বিদেশি৷ অন্যদিকে লোয়ার স্যাক্সনিতে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে কাজ করা কর্মীদের ৬০ শতাংশই জার্মান নাগরিক নন৷ 

জার্মানির কোলন শহরে রেল লাইনের কাজে নিয়োজিত কর্মীরা৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স৷
জার্মানির কোলন শহরে রেল লাইনের কাজে নিয়োজিত কর্মীরা৷ ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স৷


শ্রমবাজারে মানিয়ে নিচ্ছেন শরণার্থীরা 

মহামারিতে বিশেষায়িত পেশাগুলোতে অভিবাসী ও শরণার্থীদের অংশহগ্রহণ কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল৷ বিশেষ করে তারা যেসব খাতে কাজ করে করোনার লকডাউনে সেসব খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ তবে ইতিবাচক দিক হলো ২০০০ সালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বছরেও কর্মী সংকট থাকা বিভিন্ন পেশায় শরণার্থীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে৷

পাশাপাশি করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠায় এখন বিভিন্ন খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে৷ হোটেল, রেস্টুরেন্টের মতো সেবাভিত্তিক খাতগুলোতে আবারো কর্মী সংকট দেখা দিচ্ছে৷ দেশটির ইনস্টিটিউট ফর এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের হিসাবে, জার্মানিতে কর্মী চাহিদা পূরণে প্রতি বছর নতুন করে চার লাখ অভিবাসী প্রয়োজন৷ 

পড়ুন: জার্মানিতে অবৈধ উপায়ে কাজের বিপদ

পরামর্শ

জার্মানিতে একদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী৷ কিছু কিছু খাতে যারা চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছেন তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার মতো যথেষ্ট কর্মীও দেশটিতে নেই৷ গবেষণায় বলা হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে কোন একটি খাত পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা করতে পারেন অভিবাসীরা৷

এজন্য জার্মানির শ্রমবাজারে প্রবেশে বিদেশি কর্মীদের জন্য যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিবেদনটির রচয়িতারা৷ তাদের মতে এর একটি উপায় হতে পারে, অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিদেশে অর্জিত পেশাদারি দক্ষতা জার্মানিতে অনুমোদন করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে তা আরো দ্রুত ও সহজ করে তোলা৷ যাতে তারা সেই দক্ষতা দেখিয়ে সহজে্বি জার্মানির শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন৷ 

এছাড়া যেসব পেশায় কর্মীর অভাব রয়েছে সেখানে শিক্ষনবিশ শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য বাসস্থান ও জীবনযাত্রার খরচ বহনে সরকারকে ভর্তুকি দেয়ার পরামর্শও দেয়া হয়ে গবেষণাপত্রে৷ 

পড়ুন: ইউরোপের কোন অঞ্চলে অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের হার কেমন

 

অন্যান্য প্রতিবেদন