ভূমধ্যসাগরে ও ইংলিশ চ্যানেলে নৌকাডুবি, আফগানিস্তান থেকে হাজার হাজার মানুষের দেশত্যাগ এবং পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে মানবেতর পরিস্থিতিসহ নানা ঘটনায় বিদায়ী ২০২১ সালটি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি দুঃসময়ের বছর৷ চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বিদায়ী বছরের এমন কিছু ঘটনা৷

১- আশ্রয়ের আশায় হাজার হাজার আফগান

গত ১৫ আগস্ট অনেকটা আকস্মিকভাবেই আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে তালেবান৷ ঘটনার আকস্মিকাতায় ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি যেমন দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তেমনি হাজার হাজার সাধারণ নাগরিকের জীবনেও নেমে আসে দুর্দশ৷ ঘটনার প্রথম কয়েক সপ্তাহে দেশ ত্যাগ করতে চাওয়া হাজার হাজার আফগানকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট, জার্মানিসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ৷ আর তাদেরকে আশ্রয় দিতেও এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু দেশ৷ ইউরোপিয়ান কমিশনার ইলভা ইয়োহানসন জানান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ ৪০ হাজার আফগানকে আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৫হাজার আফগানকে, আশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবছে জার্মান সরকার৷   

২- পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে হাজার হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী

চলতি বছরের শরণার্থী সংকটের উল্লেখযোগ্য আরেকটি ঘটনা হলো পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে আটকে পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিষয়টি৷  

এশিয়ার ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বেলারুশ হয়ে ইউরোপে প্রবেশের সংখ্যা বাড়ছে৷ ইউরোপিয়ান কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বেলারুশ হয়ে ইউরোপে মোট ৮ হাজার আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন৷ এ সময়ে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মোট ১৪জন৷ আর তীব্র শীতে সীমান্তে আটকে আছেন হাজারো আশ্রয়প্রার্থী৷ 

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ ঠেকাতে লিথুয়ানিয়া ওবং পোল্যান্ড সরকার তাদের বেলারুশ সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করছে৷ সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার কনা হয়েছে৷ 

এই পরিস্থিতির জন্য অবশ্য বেলারুশের প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার লোকাশেঙ্কোকে দায়ি করেছ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন৷ 

৩- মৃত্যফাঁদ ইংলিশ চ্যানেল

ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছার চেষ্টার বিষয়টি নতুন নয়৷ কিন্তু এ পথ দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা ২০২১ সালে গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল৷ 

বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে চলতি বছর ৩৪ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী যুক্তরাজ্যে পৌঁছার চেষ্টা করেছে, যদিও তাদের সবাই সফল হননি৷ ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার৷ 

বিপদজনক এই যাত্রায় নৌকাডুবিতে নিহতের ঘটনাও কম নয়৷ গত ২৪ নভেম্বর চ্যানেলটিতে এক নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ২৭জন নিহত হয়েছেন৷ ২০২১ সালে এই পথে দুর্ঘটনায় মোট ৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে৷

ভূমধ্যসাগর থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা সি-ওয়াচ৷ ফাইল ছবি৷ পিকচার-অ্যালায়েন্স/এপি৷ ভালেরিয়া মোংগেলি
ভূমধ্যসাগর থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা সি-ওয়াচ৷ ফাইল ছবি৷ পিকচার-অ্যালায়েন্স/এপি৷ ভালেরিয়া মোংগেলি


৪- সমাধিস্থল হয়ে উঠেছে ভূমধ্যসাগর 

আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে থাকে৷ কিন্তু চলতি বছর এ পথে নৌকাডুবিতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন৷ সাগরে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৬শ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা আইওএম৷ সে হিসেবে, প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩০জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন৷ জাতিসংঘের তথ্য মতে, চলতি বছর এই পথে কমপক্ষে ৮০ হাজার মানুষ ইউরোপে পৌঁছার চেষ্টা করেছেন৷   

এদিকে আইওম বলছে, স্পেনের ক্যানারি দ্বীপে পৌছাতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৯৩৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত হয়েছেন৷ 

৫- গ্রিসে ‘আবদ্ধ’ শরণার্থীরা

গ্রিসের শরণার্থীদের জন্য বেদনাদায়ক সময়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ২০২১ সাল৷ গ্রিস সরকার দেশটির রাজধানী এথেন্সসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত শিবিরে বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করেছে৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখতেই এমন চেষ্টা সরকারের৷ তবে গ্রিস সরকারের এমন কাজের নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন আস্তর্জাতিক সংস্থা৷ তাদের দাবি, শিবিরগুলোকে বেড়া দিয়ে আবদ্ধ করে রাখার ফলে ‘মারাত্মক মানসিক চাপে’ পড়বে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷  

এদিকে তুরস্ক ও লিবিয়াসহ নানা দেশে অবস্থানরত শরণার্থীদের জন্য ২০২১ সালটি নানা কারণেই বেদনাদায়ক৷ গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, তুরস্কের হাজার হাজার শরণার্থী মারাত্মক অর্থকষ্টে দিন যাপন করছেন৷ জীবন বাঁচানোর তাগিদে কেউ কেউ ভাগাড় থেকে খাবার সংগ্রহ করছেন, এমন চিত্রও দেখা গেছে৷ 

এদিকে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত লিবিয়াতেও আটকে পড়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মানবেতর জীবন যাপনের খবর পাওয়া গেছে৷ নারীদের যৌন নির্যাতন কিংবা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রেখে টাকা আদায়সহ নানা ঘটনাও জানা গেছে৷  

লেজলি কারেটেরো /আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন