ইংলিশ চ্যানেল থেকে উদ্ধার করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি দলকে গত ২০ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের ডানজিনেস উপকূলে নিয়ে আসেন ব্রিটিশ রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোটের সদস্যরা৷  ছবি: পিএ ওয়্যার
ইংলিশ চ্যানেল থেকে উদ্ধার করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের একটি দলকে গত ২০ নভেম্বর যুক্তরাজ্যের ডানজিনেস উপকূলে নিয়ে আসেন ব্রিটিশ রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোটের সদস্যরা৷ ছবি: পিএ ওয়্যার

ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে গত বছর ২৮ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন, যা এ যাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ৷ এদিকে ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসী সংকট মোকাবিলায় ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাজ্য৷

২০২১ সালে ইংলিশ চ্যানেলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল নামে৷ পাচারকারীদের বড় অংকের অর্থ দিয়ে, ছোট ছোট নৌকায় চেপে ফ্রান্সের উপকূল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন বিপুল অভিবাসী৷ তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ৩৯৫ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন৷ এই সংখ্যা ২০২০ সালের চেয়ে তিনগুণ বেশি ও আগের যেকোন সময়ের হিসাবে সর্বোচ্চ৷ সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে বার্তা সংস্থা পিএ এই তথ্য জানিয়েছে৷

২০২১ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী পাড়ি দিয়েছেন নভেম্বর মাসে৷ অনুকূল আবহাওয়া কারণে অন্তত ছয় হাজার ৮৬৯ জন এই সময়ে যুক্তরাজ্যের উপকূলে পা রাখতে সক্ষম হন৷ নভেম্বরের ১১ তারিখ একদিনে সর্বোচ্চ এক হাজার ১৮৫ অভিবাসনপ্রত্যাশী ১৩ টি নৌকায় দেশটিতে পৌঁছান৷ 

সমুদ্রে স্বপ্নের সমাধি

নভেম্বরে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অপেক্ষাকৃত বড় নৌকা ব্যবহার করেছেন৷ এমন এক একটি নৌকায় ২৮ থেকে ৫০ জন ছিলেন৷ তবে ফ্রান্স উপকূল থেকে রওনা হয়ে সবাই যে যুক্তরাজ্যে পৌঁছাতে পেরেছেন তা নয়৷ অনেকের গন্তব্য মর্মান্তিকভাবে সমুদ্রেই শেষ হয়েছে৷

২৪ নভেম্বর এক নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ২৭ অভিবাসী মারা যান৷ তারা যে নৌকাটিতে ছিলেন ফরাসি কর্তৃপক্ষ সেটিকে পুলে ব্যবহারের জন্য তৈরি শিশুদের বাতাস-নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন৷ 

এই ২৭ জনের মধ্যে সাতজন নারী ছাড়াও ১৬ ও সাত বছরের অপ্রাপ্তবয়স্কও ছিল৷ মৃতদের বেশিরভাগই ছিলেন ইরাকি কুর্দি৷ এর বাইরে একজন ইরানি কুর্দি, আফগান, ইথিওপিয়ান, সোমালি ও মিশরীয়ও ছিলেন৷ 

পড়ুন: ফিরে দেখা ২০২১: অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দুঃসময়ের বছর

যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স দ্বন্দ্ব

ইউরোপের মূল ভূখণ্ড পেরিয়ে যুক্তরাজ্যে এত সংখ্যক অভিবাসী পৌঁছানোর ঘটনা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য বড় মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এই ইস্যু যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে৷ এ নিয়ে দুই পক্ষই একে অপরের দিকে অভিযোগ ছুঁড়েছে৷ তবে ইংলিশ চ্যানেলে মানবপাচারের জাল ছিঁড়তে তৎপর দুই সরকারই৷ 

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্য দেশটির সংসদে নতুন আইন পেশ করেছে৷ এটি পাস হলে পাচারকারী ও অভিবাসী উভয়পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারবে দেশটির সরকার৷ বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থীদের ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশে’ পাঠিয়ে দেয়ার একটি বিধান রাখা হয়েছে আইনটিতে, যা অভিবাসী অধিকারকর্মীদের মধ্যে সামলোচনার জন্ম দিয়েছে৷ 

আশ্রয়প্রার্থীদের সুযোগ দেয়ার আহ্বান

ফরাসী উপকূল থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত ইংলিশ চ্যানেলে সবচেয়ে সরু অংশের দূরত্ব ৩২ কিলোমিটার৷ ছোট ছোট নৌকায় বিপদজনক ঢেউ পেরিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এই পথ অতিক্রমের চেষ্টা করেন৷ দুই দেশের সরকারের নানা তৎপরতার পরও তা ঠেকানো যাচ্ছে না৷ তবে কড়াকড়ি আরোপ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন৷ 

এমন ছোট ডিঙ্গি নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের চেষ্টা করেন৷ এই ছবিটি গত ১৬ ডিসেম্বর ফ্রান্সের কালের কাছে উইমেহু উপকূলের৷ ছবি: রয়টার্স৷
এমন ছোট ডিঙ্গি নৌকায় অভিবাসনপ্রত্যাশীরা ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের চেষ্টা করেন৷ এই ছবিটি গত ১৬ ডিসেম্বর ফ্রান্সের কালের কাছে উইমেহু উপকূলের৷ ছবি: রয়টার্স৷


রিফিউজি অ্যাকশন নামের একটি সংস্থার প্রধান নির্বাহী টিম নাওর হিলটন মনে করন যুক্তরাজ্যের সরকারের নীতি উপকূলে আরো মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে৷ তিনি বলেন, ‘‘মানুষের ডিঙি নৌকায় চ্যানেল পড়ি দেয়া সামনেও অব্যাহত থাকবে এবং এর থেকে পাচারকারীরাও মুনাফা লাভ করে যাবে, যতদিন না মন্ত্রীরা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রার্থনার জন্য অন্য দুয়ারগুলো না খুলবেন৷’’ 

একই মত ফরাসি সংস্থা কেয়ার ফর কেলাইসের প্রতিষ্ঠাতা ক্লেয়ার মোসেলেরও৷ তিনিও মনে করেন আশ্রয়াপ্রার্থীদের জন্য অন্য সুযোগগুলো বৃদ্ধি করা উচিত যাতে তাদের সমুদ্র পাড়ি দেয়ার প্রয়োজন না পড়ে৷ ‘‘যদি পাচারকারীদের ঠেকাতে সরকার সত্যি আন্তরিক হয় তাহলে তাদের উচিত আশ্রয়প্রার্থনার নিরাপদ উপায় সৃষ্টি করা, যার মাধ্যমে পাচারকারীরা চিরতরে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে,’’ বলেন তিনি৷ 

ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তির পরিকল্পনা

এদিকে ইংলিশ চ্যানেলের অভিবাসী সংকট দূর করতে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে ব্রিটিশ সরকার৷ এজন্য ফরাসি সরকারের সাথে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়৷ তবে চলতি বছরের এপ্রিলে ফ্রান্সের নির্বাচনের আগে সেটি সম্ভব নয় বলে মনে করছে তারা৷ দ্য সানডে টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্বাচন পরবর্তী নতুন ফরাসি সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা জনসন প্রশাসনের৷

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে ‘নির্বাচনী উত্তাপ শেষ হওয়ার পর’ বিজয়ী সরকার ইংলিশ চ্যানেলের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় ‘বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা’ নিয়ে এগুতে চাইবে বলেই মনে করেন তারা৷ 

এফএস/কেএম (এএফপি, এপি, রয়টার্স)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন