২০২১ সালের অক্টোবর থেকে হাজারো অভিবাসী ত্রিপোলির ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। ছবি: টুইটার  Kaka Fur
২০২১ সালের অক্টোবর থেকে হাজারো অভিবাসী ত্রিপোলির ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। ছবি: টুইটার Kaka Fur

ত্রিপোলিতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) কার্যালয় সামনে তিন মাস ধরে অস্থায়ী ক্যাম্প করে আন্দোলন করে আসছিলেন প্রায় এক হাজার অভিবাসী৷ রোববার সন্ধ্যায় সেখান থেকে অভিবাসীদের জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে লিবিয়া কর্তৃপক্ষ৷

ত্রিপোলিতে অবস্থিত ইউএনএইচসিআর এর ডে সেন্টার কার্যক্রম বন্ধের কয়েক দিনের মাথায়ই সংস্থাটির কার্যালয়ের সামনে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শিবিরগুলো জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেছে লিবিয়া কর্তৃপক্ষ৷ অভিযানের পর সেখানে থাকা বহু অভিবাসীকে অন্যায়ভাবে ত্রিপোলির অদূরে অবস্থিত আইন জারা নামক কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ 

২০২১ সালের অক্টোবর মাস থেকে প্রায় এক হাজার অভিবাসী ইউএনএইচসিআর এর কমিউনিটি ডে সেন্টার বা সিডিসি কার্যালয়ের সামনে অস্থায়ী শিবির তৈরী করে অবস্থান করছিলেন৷ তারা লিবিয়ায় তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সেখান থেকে নিরাপদ তৃতীয় দেশে সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন৷ 


ত্রিপোলিতে অভিবাসীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত গার্গরেশ এলাকায় গত অক্টোবরে লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়৷ সেখানে বসবাসরত অভিবাসীদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়৷ নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে সাত অভিবাসী নিহত এবং প্রায় চার হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে শহরের বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো হয়৷ 

 এই অভিযানের পর পুনরায় গ্রেপ্তার আতংকে অভিবাসীদের একটি অংশ অক্টোবর মাসে থেকে ইউএনএইচসিআর দপ্তরের সামনে জড়ো হয়ে তাদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেন৷ অস্থায়ী শিবির তৈরী করে সেখানে তারা অবস্থান কর্মসূচী চালিয়ে যান৷ 

‘বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি’

ইউএনএইচসিআর কার্যালয়ের সামনের জায়গা দখল করে চলা টানা এই আন্দোলনের সোমবার সমাপ্তি ঘটেছে৷ ত্রিপোলিতে বসবাসকারী দক্ষিণ সুদান থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থী ইয়াম্বিও ডেভিড অলিভার রিফিউজিস ইন লিবিয়া নামক একটি টুইটার একাউন্টে জানান, ‘‘সিডিসি কার্যালয়ের সামনে সামরিক ও পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে৷’’

লিবিয়ায় নিযুক্ত ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লাক ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, ‘‘কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের কার্যালয়ের সামনে থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অন্যথায় তাদেরকে আটক কেন্দ্রে পাঠানো হবে৷’’

এই অভিযানের সময়, অভিবাসীদের তাঁবু গুঁড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং তাদের সাথে থাকা সবকিছু নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ 

ইয়াম্বিও ডেভিড অলিভার রোববার সন্ধ্যায় তার টুইটার একাউন্টে জানান, “ভারি গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে, পরিস্থিতি গণহত্যার মতো পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে৷ সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে৷’’

ইয়াম্বিও ডেভিড অলিভার ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “নারীসহ বেশ কয়েকজনকে মারধর করা হয়েছে৷ ঘটনাস্থল থেকে যারা পালাতে চেষ্টা করেছেন পুলিশ সেসব অভিবাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে৷ একজন অভিবাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন৷’’

এর আগে গত ডিসেম্বরে ত্রিপোলির সররাজ জেলায় ইউএনএইচসিআর নিবন্ধন কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া প্রায় ১০০ অভিবাসীদের সঙ্গেও একই আচরণ করা হয়েছিল৷ 

কারাগারে প্রেরণ

কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত বেশিরভাগ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে ত্রিপোলির আইন জারা নামক কারাগারে পাঠানো হয়৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, শত শত মানুষকে একটি খাঁচায় আটকে রাখা হয়েছে৷ 

ইয়াম্বিও ডেভিড অলিভারসহ কয়েকজন পুলিশের এই অভিযান থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়া সুদানের কয়েকজন নাগরিক ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, ‘‘আমাদের সঙ্গে থাকা অন্তত ৯৫ শতাংশ অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷ সেখান থেকে কোথায় যেতে হবে তা না জেনেই আমরা লিবিয়ার রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছি৷’’


ইউএনএইচসিআর কেন্দ্রের চারপাশের এলাকাগুলো এখন লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত৷ কোনো অভিবাসীর পক্ষে আর সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়৷ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত আশেপাশের ব্যবসায়ীরা সোমবার সকালে এলাকাটি পরিষ্কার করে আবারো তাদের দোকান খুলতে শুরু করেন৷ অভিবাসীদের আন্দোলনের শুরু থেকে এসব দোকানপাট বন্ধ ছিল৷ 

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, “স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক দিন ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবন এবং স্থানীয় অর্থনীতির ব্যাঘাতের অভিযোগে প্রাঙ্গণটি খালি করার জন্য অনুরোধ করে আসছিল৷’’

সংস্থাটি অবশ্য অভিযান চলাকালে সৃষ্ট সহিংসতার নিন্দা প্রকাশের পাশাপাশি সবাইকে শান্ত থাকা ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে৷ ক্যারোলিন গ্লাক লিবিয়ার কর্তৃপক্ষকে আশ্রয়প্রার্থী এবং শরণার্থীদের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা এবং নির্বিচারে আটককৃতদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।



এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন