লিবিয়া থেকে বের করে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি জানিয়ে অভিবাসীদের বিক্ষোভ৷ ছবি: আনসা
লিবিয়া থেকে বের করে নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি জানিয়ে অভিবাসীদের বিক্ষোভ৷ ছবি: আনসা

২০২১ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে উপকূলরক্ষী বাহিনীর হাতে আটক হয়ে লিবিয়ায় ফিরে আসা ২০ হাজার মানুষের কোনো খোঁজ নেই৷ যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা অক্সফাম এক বিবৃতিতে এমন তথ্য জানিয়েছে৷ ইটালিতে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি অপ্রাপ্তবয়স্কের লিবিয়ায় নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাও তারা এতে তুলে ধরেছে৷

‘‘তারা আমাদেরকে একটি কক্ষে উলঙ্গ অবস্থায় আটকে রাখত, প্লাস্টিক টিউব দিয়ে পেটাতো’’, অক্সফামের কাছে লিবিয়ায় নির্যাতনের কথা এভাবেই তুলে ধরে বাংলাদেশের সাইদ (ছদ্মনাম)৷  

লিবিয়ায় আসা ও সেখান থেকে ইটালি পৌঁছানোর জন্য সাইদকে দুই বছর অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে৷ এর মধ্যে অকথ্য নির্যাতন, বারবার অপহরণ শিকার হয়েছে সে৷ পরিবার থেকে একাধিকবার মুক্তিপণ এনে আটককারীদের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছে৷

লিবিয়ায় শুরুর দিকককার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাইদ অক্সফামকে বলে, ‘‘আমাকে একটি ঘরের গ্যারেজে আরো কয়েক ডজন অভিবাসীর সঙ্গে আটক রাখা হয়৷ তারপর পানি বা কোনো খাবার ছাড়া একটি গাড়ির পেছনে ৩৭ ঘণ্টা যাত্রার পর নিয়ে আসা হয় ত্রিপলিতে৷’’

এরপর সাইদের পাসপোর্ট নিয়ে যায় তারা৷ বলা হয়, পরিবারের কাছ থেকে টাকা আনলে সেটি ফেরত দেয়া হবে৷ দুই সপ্তাহ পর তাকে আরেকটি সশস্ত্র দল অপহরণ করে৷ তারাও তার কাছে মুক্তিপণ দাবি করে৷ ‘‘আমাকে পরিবারের কাছে ফোন করতে বাধ্য করা হতো৷ কারো সঙ্গে কথা বলতে না পারলে মারধর করত৷’’

অনেক কাঠখড় পেরিয়ে সাইদের পরিবার মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে সক্ষম হয়৷ এরপর ইটালির পথে দুইবার যাত্রা করে ব্যর্থ হয় সাইদ৷ আবারো অপহরণকারীদের খপ্পরে পড়ে, আবারো পরিবারের কাছে ফোন করে টাকা দিতে বাধ্য হয়৷ 

সমুদ্র থেকে দ্বিতীয়বার ফেরত আসার বর্ণনা দিয়ে সাইদ বলে, ‘‘আমাদের রাবারের ডিঙিটি যাত্রা শুরুর ১৪ ঘণ্টা পর আটক করে লিবিয়া কর্তৃপক্ষ৷ তারা আমাদেরকে একটি জেলখানায় নিয়ে যায়৷ সেখানে একটি কক্ষে মোট ৫৮ জন একসঙ্গে ছিল৷ সপ্তাহে মাত্র দুইদিন তারা আমাদেরকে খাবার দিত৷ একটি কক্ষে তারা আমাকে আটক করে, আমার অবশিষ্ট মূল্যবান যে জিনিসপত্র ছিল সেগুলোও ছিনিয়ে নেয়৷ আমাকে থাপ্পড় আর প্লাস্টিকের টিউব দিয়ে মারতে থাকে৷’’

লিবিয়ায় অভিবাসীদের উপর নির্যাতনের এমন চিত্র এখন কারো অজানা নয়৷ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এর আগেও সেখানকার অমানবিক পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে৷ উত্তর আফ্রিকার দেশটির আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকার অভিজ্ঞতা ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে বর্ণনা করেছেন অনেক অভিবাসীও৷ 

পড়ুন: ‘আমাকে প্রতিরাতে ধর্ষণ করা হতো’

২০ হাজার নিখোঁজ

গত পাঁচ বছরে লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনী সাইদের মতো ৮০ হাজার অভিবাসীকে ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপ পৌঁছানোর চেষ্টায় বাধা দিয়েছে৷ এর মধ্যে ২০২১ সালে লিবিয়ায় ফেরত আনা ২০ হাজার জন এখন নিখোঁজ বলে উল্লেখ করেছে মানবিক সহায়তা সংস্থা অক্সফাম৷ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বাধা দিতে ইটালি-লিবিয়ার মধ্যকার চুক্তির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে দেয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে তারা৷ 

অক্সফাম বলছে, ফেরত আনা হাজার হাজার অভিবাসীকে বিভিন্ন গোপন আটক কেন্দ্রগুলোতে রাখা হয় এবং সেখানে করুন পরিণতি ভোগ করে তারা৷ স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করে আসছে, যারা সেখানে ‘অপহরণের মাধ্যমে জীবন ধারণের ব্যবসা গড়ে তুলেছে’৷ সমুদ্র থেকে লিবিয়ার ভূখণ্ডে ফেরত আনা এসব অভিবাসীরা কোথায় আছেন, তাদের পরিণতি কী তাও ঠিকভাবে জানা যায় না৷ ২০২১ সালে ২০ হাজার জনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে জানাচ্ছে অক্সফাম৷

এমন পরিস্থিতির জন্য ইটালি-লিবিয়ার মধ্যকার ২০১৭ সালের চুক্তিকে দায়ী করেছে সংস্থাটি৷ এই চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থে লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অর্থ ও সরঞ্জাম দেয়া হয়৷ এর বিনিময়ে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সমুদ্র পেরুতে বাধা দিয়ে দেশটিতে আটকে রাখে তারা৷

চুক্তির পরে আট হাজার মৃত্যু 

২০১৭ সালের চুক্তির কড়া সমালোচনা করে তা বাতিল এবং মধ্য ভূমধ্যসাগরে বিপদে পড়া অভিবাসীদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার প্রক্রিয়া চালু করতে ইটালির প্রতি দাবি জানিয়েছে অক্সফাম৷ সংস্থাটি বলছে, ‘‘ ইটালির জনগণের প্রায় ১০০ কোটি ইউরো করের অর্থ খরচ করে এমন এক চুক্তি করা হয়েছে যা সমুদ্রে ট্র্যাজেডির অবসান ঘটাতে পারেনি, বরং ২০১৭ সাল থেকে এখন অবধি আট হাজারের বেশি মানুষ মধ্য ভূমধ্যসাগর রুটে প্রাণ হারিয়েছেন৷’’

এজন্য অক্সফাম ইটালির প্রতি দাবি জানিয়েছে যাতে তারা এই চুক্তি থেকে সরে আসে৷ তবে তাদের এই দাবি মেনে নেয়া হবে এমন সম্ভাবনা নেই বলা চলে৷ গত সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক নথির ভিত্তিতে করা প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, অভিবাসীদের বাধাদান ও লিবিয়ায় ফিরিয়ে নিতে দেশটির কর্তৃপক্ষকে সহায়তা দান অব্যাহত রাখতে চায় ইইউ৷ যদিও শুধু অক্সফাম নয়, সেখানে অভিবাসীদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণসহ অমানবিক পরিবেশ এবং বাহিনীগুলো ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও৷

এফএস/কেএম (আনসা)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন