জার্মানিতে কাজের চুক্তি বিক্রির একটি বিজ্ঞাপন
জার্মানিতে কাজের চুক্তি বিক্রির একটি বিজ্ঞাপন

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দালালের মাধ্যমে কর্মচুক্তি কেনা মরক্কোতে কোনও ব্যাপার নয়৷ আর এই কাজ করতে গিয়ে অনেক তরুণ মরোক্কান প্রতারণার শিকার হয়েছেন৷ এরকম কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে ইনফোমাইগ্রেন্টস৷

মরক্কোর সোশ্যাল মিডিয়া সাইটে এইচ.জে একজন দালাল হিসাবে পরিচিত৷ জার্মানিতে বসবাস এবং কাজ করার স্বপ্ন দেখেন এমন ব্যক্তিদের জন্য কর্মসংস্থান চুক্তির ব্যবস্থা করেন তিনি৷

অনেকেই প্রচুর অর্থ দেন জার্মানিতে আসার স্বপ্নপূরণ করতে৷ এই অর্থের পরিমাণ দেড় হাজার থেকে নয় হাজার ইউরো৷ এইচ.জে-এর এই ব্যবসায়িক মডেলের ফাঁদে পড়েছেন অনেকেই৷

বর্তমানে এইচ.জে মরক্কোর কেনিত্রার একটি হাজতে রয়েছেন৷ চাকরির চুক্তি জাল করে তিনি সেগুলি মরক্কোতে বিক্রি করেছেন, একথা জানতে পেরে মরোক্কান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল৷ এরপর তাকে পাকড়াও করে জার্মানি থেকে মরক্কোতে নিয়ে যাওয়া হয়৷ 

আয়েশার কথা

আয়েশা (ছদ্মনাম) ইনফোমাইগ্রান্টসকে জানান তিনি দুই বার জার্মানিতে আসতে চেয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন৷ আয়েশা একজন স্নাতক৷ শুধু তাই নয়, জার্মান ভাষার মাঝামাঝি কোর্স বি ওয়ান পাস করেছিলেন তিনি৷ জার্মানিতে কাজের সুযোগ তার দেশ মরক্কো থেকে অনেক বেশি৷ তাই জার্মানিতে আসতে চেয়েছিলেন তিনি৷

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্তর্ভুক্ত দেশের বাইরের কেউ ইইউ-তে কাজ করতে চাইলে কর্মচুক্তির প্রয়োজন হয়৷ ভিসার আবেদনের আগে এই কর্মচুক্তি হাতে পাওয়া বাধ্যতামূলক৷ কিন্তু আয়েশা তা পাননি৷ তিনি একজন দালালের সাহায্য নিয়েছিলেন৷ প্রথমজন মরক্কোর একটি ভাষাশিক্ষার স্কুলের মালিক–ধরা যাক তার নাম এ৷ তিনি আয়েশার কাছে প্রথমে দেড় হাজার ইউরো চান৷ কর্মচুক্তি পেয়ে গেলে, ভিসা পেয়ে গেলে আরও চার হাজার ইউরো দিতে হবে–এমনটাই বলা হয়েছিল আয়েশাকে৷ তার মানে জার্মানিতে আসার স্বপ্নপূরণের দাম ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার ইউরো৷

বেশ কয়েক মাস অপেক্ষা করার পর নথিপত্র দাখিল করে আয়েশাকে দূতাবাসে আবেদন করতে বলেছিলেন ‘এ’৷ সব কিছু ঠিক করা আছে, কোনও সমস্যা হবে না, এমনটাই বলা হয়েছিল তাকে৷ কয়েকদিন পর সেই দালাল আয়েশাকে বলেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে দিতে৷

‘এ’ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন তাকে, এমনটাই সন্দেহ হয়েছিল আয়েশার৷ তিনি কেনিত্রাতে বেশ কয়েকজনকে খুঁজে পেয়েছিলেন, আগে যারা ‘এ’-এর সঙ্গে ব্যবসা করেছিলেন৷ ‘এ’-এর একজন ‘ক্লায়েন্ট’ আয়েশাকে জানিয়েছিলেন, তিনি জার্মান দূতবাসের কালো তালিকার অন্তর্ভুক্ত৷ কারণ ‘এ’-এর দেওয়া চুক্তিপত্রটি তো ভুয়া৷ 

ওই দালালের অফিসে গিয়েছিলেন আয়েশা৷ টাকা ফেরত চান তিনি৷ ঝামেলা এড়াতে তাকে সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল৷

বিদেশে জার্মান দূতাবাসের চিহ্ন | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স
বিদেশে জার্মান দূতাবাসের চিহ্ন | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স

দ্বিতীয় চেষ্টা

২০২১ সালে এইচ.জে নামে আরেকজনের কথা জানতে পারেন আয়েশা৷ দেড় হাজার ইউরো দেন তিনি চুক্তিপত্র পেতে৷ তার দুই বন্ধুও চুক্তিপত্র পেতে একই পরিমাণ অর্থ দিয়েছিলেন এইচ জে-কে৷ এছাড়াও সর্বশেষ চুক্তির জন্য আরো চার হাজার ইউরো দিয়েছিলেন আয়েশার দুই বন্ধু৷ তার আরেক বন্ধু, যিনি তুরস্কে ছিলেন, নয় হাজার ইউরো দিয়েছিলেন৷

আয়েশার তুরস্কের ওই বন্ধু একটি ভুয়া চুক্তিপত্র পেয়েছিলেন৷ তাতে ওই ব্যক্তির নাম লেখা ছিল না৷ ছিল অন্য ব্যক্তির নাম৷ এইচ.জে তাদের সঙ্গে সেই সময় যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ আইনজীবীর সাহায্যে আয়েশাসহ ওই চার জন সেই সময় বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন৷ এইভাবে মোট ১২৭ জন প্রতারিত হয়েছিলেন সেই সময়৷

বিভিন্ন ধরনের দালাল

জার্মানির শ্রম মন্ত্রণালয়ের একজন পরামর্শদাতা হাসান মোহাফিদ৷ তিনি জানান, জার্মানিতে দালালদের কাজ বৈধ৷ জার্মান সংস্থায় চাকরির পদের জন্য দক্ষ লোকদের সন্ধান করেন তারা৷ এমন সংস্থা দালালদের টাকাও দেন দক্ষ শ্রমিক খুঁজে পেতে৷ মোহাফিদ দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে কেউ কেউ মরক্কোতে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অত্যধিক পরিমাণ অর্থ চেয়েছেন৷ জার্মানিতে কাজের চুক্তি পেতে নিজের সম্পত্তি বিক্রি করতে বা ধার নিতে বাধ্য হয়েছেন কেউ কেউ৷

হাসান মোহাফিদ জানান, বেশিরভাগ সময় মরক্কো বা জার্মানিতে থাকেন ওই মধ্যস্থতাকারী বা দালালেরা৷ জার্মানিতে যারা কাজ করতে, পড়াশোনা করতে বা প্রশিক্ষণ নিতে চান তাদের দ্রুত চুক্তি পেতে সাহায্য করবেন বলে দাবি করেন সেই সব দালালরা৷ জার্মানি এবং মরক্কোতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং দূতাবাসের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রয়েছে, এ সব মিথ্যা দাবিও করেন৷ এরা জাল চুক্তি মরক্কোতে বিক্রি করেন৷ সুরক্ষিত করার বিষয়ে মিথ্যা বলে চুক্তি অর্জনের চেষ্টাও করেন এই সব দালালেরা৷ অনেক সময় তারা জার্মান ভাষাশিক্ষার স্কুলও খোলেন৷

হাসানের বক্তব্য, এই সব ভাষাশিক্ষার স্কুলের মালিকেরা গ্যারান্টি দেন, জার্মান ভাষা শিখে যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন, তারা চুক্তির শর্তও পূরণ করবেন৷ উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি মিলবে, এমন সব ‘গ্যারান্টি’ দেওয়া হয়৷ ‘রেসিডেন্স কার্ড’ পাওয়ার জন্য থাকার ব্যবস্থা করা হবে এমন দাবিও করেন ওই দালালরা৷

ভুয়া চুক্তির শিকার

আলিয়া (ছদ্মনাম) বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী একজন মরক্কান নারী৷ তিনি স্বাস্থ্যসেবায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং জার্মান ভাষায় বি ওয়ান পাস করেছেন৷ জার্মানিতে কাজের চুক্তি পেতে একাধিক বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি৷ কয়েক বছর পর তিনি নিশ্চিত হন, অর্থের বিনিময়েই চুক্তি কিনতে হবে তাকে৷

সেই দালাল ‘এ’-এর সঙ্গে দেখা করেন আলিয়া৷ আয়েশাও ‘এ’-র ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন৷ বেশ কয়েকজন তরুণ মরোক্কান জাল নথির মাধ্যমে জার্মানিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন, আলিয়া তাদের মধ্যে একজন৷ এজন্য পাঁচ হাজার ইউরো খরচ করেছিলেন তিনি৷ 

মরক্কো কর্তৃপক্ষ এবং জার্মান সংস্থাগুলো দালালের চুক্তি জাল করার কথা না জানা পর্যন্ত আলিয়া বোঝেননি তিনি পেশাদার প্রতারণার শিকার৷ 

ভিসার আবেদনপত্রে প্রতারণামূলক চুক্তির কারণে আলিয়ার অনেক বন্ধুকে জার্মান কর্তৃপক্ষ কালো তালিকাভুক্ত করেছে৷ জার্মানিতে পৌঁছানোর জন্য তারা যে অর্থ বিনিয়োগ করেছিল তা নষ্ট হয়েছিল৷ চুক্তিপত্রগুলি যে জাল, শুধু তা খুঁজে বের করার জন্য আলিয়ার কয়েকজন বন্ধুকে ভিসা দেওয়া হয়েছিল৷

জার্মানির সুবিধা

আলিয়া জানতে পেরেছিলেন যে তার চুক্তি জাল৷ কর্তৃপক্ষ তা খুঁজে পায়নি৷ আলিয়ার বসবাসের অস্থায়ী অনুমতি প্রত্যাহার করা হয়নি, তবে তিনি থাকার জন্য বাড়ি পাননি কারণ তার তো কোনও চাকরি নেই৷ বাকি টাকায় ভাষাশিক্ষার বি২ কোর্স করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি৷

বি২ পাসের পর তিনি স্বাস্থ্যসেবা খাতে চাকরির জন্য অনুসন্ধান শুরু করেন৷ তার বসবাস এবং তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল এ কথা তার প্রথম সংস্থাও জানতো৷ নিজের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং ভাষার ভাল দক্ষতার কারণে অনেক চেষ্টা করে চাকরি খুঁজে পেতে সক্ষম হন আলিয়া৷ তার অবস্থা অন্যদের তুলনায় অনেকটা ভাল ছিল৷

প্রতারণার একাধিক মুখ

হাসান জানান, তার একটি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে৷ সেখানে বৈধ উপায়ে জার্মানিতে আসার উপায়গুলি বলা রয়েছে৷ জার্মানির নতুন একটি সংস্থার মালিক অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এটি আইনবিরোধী৷

বিপুল সংখ্যক লোক এই প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন৷ ভিসার আবেদন খারিজ করা হয়েছে দেখে তারা অবাক হয়েছিলেন৷ এখনও অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা৷

হাসান অন্য কিছু সংস্থার কথা বলেছেন যারা প্রকৃত কাজের চুক্তি দেয় তবে অন্যায্য শর্ত আরোপ করে৷ কর্মীদের শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সংখ্যক বছর কাজ করার জন্য বাধ্য করে এবং প্রায়শই ন্যূনতম মজুরির কম অর্থ দেয় তারা৷

জার্মান ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সিও চাকুরি পেতে সহায়তা করে | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স
জার্মান ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সিও চাকুরি পেতে সহায়তা করে | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স



প্রতারকদের কাছ থেকে দূরে থাকার উপায়

যারা জার্মানিতে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ বা কাজ করতে আসতে ইচ্ছুক তাদের প্রথমে জার্মান ভাষা শেখার পরামর্শ দিয়েছেন হাসান৷ অন্তত বি ওয়ান বা বি টু স্তর পর্যন্ত শিখে কাজের সন্ধান করা উচিত বলে জানান তিনি৷ বিদেশ থেকে দক্ষ মানুষজনকে কাজে উৎসাহিত করতে জার্মান সরকার একাধিক প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য সন্ধানের ব্যবস্থা করেছে৷ 

‘মেক ইট ইন জার্মানি’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলি চাকরির সুযোগ তালিকাভুক্ত করেছে৷আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যও রয়েছে সেখানে৷

জার্মান ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, ‘আগেনট্যুয়োর ফ্যুর আরবাইট’-এর একটি বিশেষ বিভাগ রয়েছে যেটি আবেদনকারীদের কাজ খুঁজতে এবং উপযুক্ত পদে নিয়োগ পেতে সাহায্য করে৷ সংস্থাটি আবেদনের নথি তৈরিতে সহায়তা করে এবং সমস্যায় পড়লে জার্মানিতে পৌঁছাতে সক্ষম ব্যক্তিদের সহায়তা প্রদান করে৷ যারা জার্মানিতে কাজ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্যও জেডএভি-ও একটি বিশেষ অফিস৷

এই ধরনের প্রতারণা শুধুমাত্র মরক্কোতে নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অন্যান্য দেশেও রয়েছে৷ সোশ্যাল মিডিয়ার পেজ এবং গ্রুপগুলিতে জার্মানিতে কাজ করার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিসহ পোস্ট রয়েছে৷ ইউরোপের অন্য দেশে বসবাসকারী অনিয়মিত অভিবাসীদের ‘টার্গেট’ করে তারা৷

আরকেসি/এআই

 

অন্যান্য প্রতিবেদন